আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে নীতি নিয়েছিল খালেদা জিয়ার সরকার
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
বাংলাদেশে বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের দিক থেকে শোকবার্তা এসেছে। তার জানাজায় অংশ নিতে বুধবার ঢাকায় এসেছেন ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতিনিধিরা। তাদের মধ্যে কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও রয়েছেন।
মিসেস জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলেও দুবার তিনি তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিলেন।
ওই দু মেয়াদে তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে দেশের পররাষ্ট্রনীতির নানা দিক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রভাবশালী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশ ও তার দল বিএনপির সম্পর্ক সবসময়ই দেশের রাজনীতিতে আলোচনার বিষয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়া সরকারের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করেছিল তার সরকারের অর্থনীতি উদারীকরণ কর্মসূচি, যার ফলে প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ ও ব্যবসা বাণিজ্য বাড়তে শুরু করেছিল।
তাদের মতে, ওই দুই মেয়াদের বিভিন্ন পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ আরব দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, লুক ইস্ট পলিসির মাধ্যমে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ভারতের সাথে সাম্যতা রেখে সবার সাথে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
যদিও ভারতের সাথে বিএনপি সরকারের 'সুসম্পর্ক' কতটা ছিলো তা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
আবার নানা উদ্যোগ নিয়েও চীনের সাথে কেন সম্পর্কের ভিত শক্ত করা যায়নি তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
যেসব বিষয় তখন গুরুত্ব পেয়েছে
সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও সে সময়কার পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করলে এটি পরিষ্কার যে 'খোলা বাজার অর্থনীতি'র পথে তার সরকার যে যাত্রা শুরু করেছিল, সেটিই পররাষ্ট্রনীতিতে ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছিলো।
তিনি নিজেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ সফরে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলছেন, ''খালেদা জিয়া সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক জায়গা তিনটি- লুক ইস্ট পলিসির মাধ্যমে চীন থেকে শুরু করে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বাড়ানো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার এবং সার্ক ও বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা''।
তবে ১৯৯১-৯৫ সালের প্রথম মেয়াদে মিয়ানমার ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৩ জন শরণার্থীকে খালেদা জিয়ার উদ্যোগের কারণেই ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বলে বিএনপির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, "১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বেগম জিয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেন এবং দ্রুত তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর পদক্ষেপ নেন" ।
অন্যদিকে ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘকালীন যে সংকট ছিলো তিনবিঘা করিডর নিয়ে সেই তিনবিঘা করিডর পালাক্রমে ৬ ঘণ্টা করে দুই দেশের জন্য উন্মুক্ত হয়েছিলো ওই আমলেই ১৯৯২ সালের জুন মাসে। যদিও এ সংক্রান্ত সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছিলো জেনারেল এরশাদের শাসনের শুরুর দিকে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির ৯১-৯৫ সালে কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসে কর্মরত ছিলেন। তার মতে, খালেদা জিয়ার সরকার অর্থনীতিতে উদারীকরণ করায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন সুযোগ উন্মোচিত হয়েছিল।
"এর ফলে ব্যবসা বাণিজ্য বাড়ল। যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হলো এবং এর জেরে অর্থনীতি নতুন গতি লাভ করলো। এমনকি ইলিশ মাছ তখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম ভারতে রপ্তানি হয়েছিলো," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
আবার মিসেস জিয়ার প্রথম মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্য, আরব দেশ ও মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা ছিলো বলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ও ওআইসির সাথে তখন সম্পর্ক বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তবে অনেকের কাছে বিস্ময়ের বিষয় হলো, চীনের সাথে শাহজালাল সার কারখানাসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি প্রথম মেয়াদে করেও নিজের মেয়াদেই তা বাতিল করে দিয়েছিল খালেদা জিয়ার সরকার।
অনেকের ধারণা, চীনের সাথে বিএনপি কিংবা বিএনপি সরকারের সম্পর্কের অবনতির সূচনাও হয়েছিলো এর মধ্য দিয়ে।
আবার নদনদীর পানি বণ্টনসহ ভারতের সাথে থাকা দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর নিষ্পত্তিতে খুব একটা অগ্রগতি আসেনি সেই সময়কালে। অনেক ক্ষেত্রে তার ও বিএনপির 'ভারত-বিরোধিতার' ঐতিহাসিক রাজনীতিও দুই দেশের সম্পর্কের গতি প্রকৃতিতে ভূমিকা রেখেছে তখন।
যদিও তার দ্বিতীয় মেয়াদে, লুক ইস্ট পলিসির মাধ্যমে চীনসহ দক্ষিণ পূর্ব দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ ব্যাপক বেড়েছে বলে মনে করেন ২০০১ সালের পর সিঙ্গাপুর ও নিউইয়র্কে কূটনীতিক হিসেবে কাজ করা মুন্সি ফয়েজ আহমেদ।
এর আগে এরশাদ সরকারের সময় বাংলাদেশের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক বেড়েছিল এবং তখন বড় বড় অনেক সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে চীনা বিনিয়োগ আসা শুরু হয়েছিলো।
কিন্তু বিএনপি আমলেই আবার তাইওয়ান ইস্যুতে, বিশেষ করে ঢাকায় তাইওয়ানের অফিস খোলা নিয়ে চীনের সাথে বিএনপি সরকারের দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
হুমায়ুন কবির বলছেন, খালেদা জিয়া সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ২৪টির মতো দেশকে কালো তালিকাভুক্ত করার ঘটনা ঘটেছিলো। তখন সরকার সেই তালিকায় বাংলাদেশের নাম যেন না আসে সেজন্য সফল উদ্যোগ নিয়েছিল।
"তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে দুটি মেয়াদেই খালেদা জিয়ার সরকারকে রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে অভ্যন্তরীণভাবে," বলছিলেন মি. কবির।
প্রসঙ্গত, ৯১ সালের প্রথম মেয়াদের প্রায় অর্ধেক সময় জুড়ে বিরোধী দলগুলো নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তুমুল আন্দোলন করেছিল।
মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য, মুসলিম দেশ ও ওআইসির সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রথম মেয়াদেই পাকিস্তানের সাথেও সম্পর্ক শক্তিশালী করতে পেরেছিল খালেদা জিয়ার সরকার।
আবার দ্বিতীয় মেয়াদে চীন ছাড়াও কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর নীতিগত আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছিলো বলে মনে করেন তিনি।
"যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোর বাইরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার উঠতি অর্থনীতির দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল তখন এবং সেটাই লুক ইস্ট পলিসি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
বিশ্লেষক সাহাব এনাম খান বলছেন, খালেদা জিয়া সরকারের এই লুক ইস্ট পলিসির কারণে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য ও আত্মবিশ্বাস বেড়েছিল।
"ওই সময়টায় রোহিঙ্গা পুশ ইনও কম হয়েছে। আবার মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানি ব্যাপক বেড়েছে, ওআইসির মতো সংস্থায় বাংলাদেশ সেক্রেটারি জেনারেল পদে নির্বাচন করেছে, যা সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত দিয়েছে তখন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. খান।
তার মতে, প্রতিবেশী ভারতের সাথেও খালেদা জিয়া সরকার সাম্যতার ভিত্তিতেই এগোনোর নীতি নিয়েছিলেন।