আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
গাড়ি থামিয়ে জলের কল বন্ধ করা থেকে নিজের বেতন কমানো- নেহরুর অনেক অজানা দিক
- Author, রেহান ফজল
- Role, বিবিসি হিন্দি
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর জীবনীশক্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। দিনে ১৬-১৭ ঘণ্টা কাজ করতেন।
তার প্রথম ব্যক্তিগত সচিব এইচভিআর আয়েঙ্গার নিজের স্মৃতিকথায় জওহরলাল নেহেরু সম্পর্কে বেশ কিছু অজানা তথ্য তুলে ধরেছেন।
মি. আয়েঙ্গার লিখেছিলেন, “১৯৪৭ সালে পাঞ্জাবের দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করে আমরা মধ্যরাতে দিল্লি ফিরে আসি। আমাদের পরদিনের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল সকাল ৬টায়। ঘুমাতে যাওয়ার সময় সত্যিই বড্ড ক্লান্ত ছিলাম আমি।”
“পরদিন সকালে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার জন্য যখন প্রস্তুত হচ্ছিলাম, সেই সময় তার সহকারী সচিব চিঠি এবং টেলিগ্রামের একটা বান্ডিল আমার হাতে দেন। সবাই চলে যাওয়ার পর এই সমস্ত লেখার জন্য ডিক্টেশন দিয়েছিলেন নেহেরু।”
“সেদিন রাত দু’টোয় ঘুমাতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী আর ভোর সাড়ে পাঁচটায় একটা নতুন দিন শুরু করতে একেবারে প্রস্তুত ছিলেন তিনি।”
জওহরলাল নেহেরুর এমন অনেক দিক রয়েছে যা অনেকেরই অজানা। তার কিছু অভ্যেসও অন্যদের অবাক করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক এবং স্তূপাকৃতি নথির মাঝেও তার চোখ এড়িয়ে যেত না একেবারে খুঁটিনাটি বিষয়। আর কোনও ছবি বাঁকাভাবে টাঙানো থাকলে বা আগোছালো থাকলে তিনি বিচলিত বোধ করতেন। ততক্ষণ স্থির হয়ে কোনও কাজ করতে পারতেন না যতক্ষণ না সেটা কেউ ঠিক করে বা গুছিয়ে দেয়।
নিজের কাজ নিজে করার অভ্যেস
প্রবীণ কংগ্রেস নেতা এবং লেখক শশী থারুর তার ‘নেহেরু: দ্য ইনভেনশন অফ ইন্ডিয়া’ বইতে লিখেছেন, “অন্য কর্মকর্তাদের কাজও পণ্ডিতজি নিজেই করতেন।”
“একবার একজন কূটনীতিক আমাকে খুবই দুঃখের সুরে জানিয়েছিলেন যে কোনও নোট বা খসড়া সংশোধন করা এবং প্রত্যেকটা চিঠির উত্তর নিজেই দেওয়ার মধ্যে এক অদ্ভুত তৃপ্তি পেতেন (জওহরলাল নেহেরুর)।”
“দফতরে আসার আগে তিন মূর্তি ভবনের লনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করতেন তিনি।”
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়াই ভি গান্ডোভিয়া তার বই ‘আউটসাইড দ্য আর্কাইভস’-এ লিখেছেন, “নেহরু একটা স্বদেশি অ্যাম্বাসেডর গাড়িতে চেপে দফতরে আসতেন, যার বনেটে জাতীয় পতাকা থাকত।”
“তার গাড়ির ঠিক আগে আগে মোটরসাইকেলে সওয়ার একজনই নিরাপত্তারক্ষী থাকতেন। গাড়ির চালকের পাশেই বসতেন তার নিরাপত্তা কর্মকর্তা। দফতরে ঢুকেই তিনি আমাদের (কর্মকর্তাদের) ডাক পাঠাতেন।”
“আমাদের হাতে হলুদ রঙের টেলিগ্রাম থাকত, যেখানে তার নির্দেশ অনুযায়ী আমরা লিখতাম। কিছু চিঠি এবং টেলিগ্রাম তিনিও সঙ্গে নিয়ে আসতেন এবং সেগুলোর বিষয়ে আমাদের সকলের কাছ থেকে পরামর্শ চাইতেন।”
ভরপুর প্রাণশক্তির নেপথ্যে
ভারতের স্বাধীনতার সময়, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে তার ৫৮ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা, কিন্তু তখনও তার ক্ষিপ্রতা এবং স্ফূর্তি ছিল চোখে পড়ার মতো।
মি. গান্ডোভিয়া লিখেছেন, “তখনও আমরা তাকে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে যেতে দেখেছি, অথচ আমাদের কষ্ট হতো। সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি যোগাভ্যাস করতেন, সেই তালিকায় শীর্ষাসনও সামিল ছিল।”
“হয়তো এটাই তার সুস্বাস্থ্যের নেপথ্যে ছিল।”
নেহরুর নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং পরবর্তীকালে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক কে এফ রুস্তমজি তার বই ‘আই ওয়াজ নেহেরু’স শ্যাডো’-তে লিখেছেন, “আমি যখন নেহরুর সঙ্গে কাজ শুরু করি, তখন তার বয়স ছিল ৬৩ বছর, কিন্তু মনে হতো যেন ৩৩।”
“তার পরনে থাকত সাদা আচকান ও চুড়িদার পাজামা। তিনি একটা সাদা গান্ধী টুপি পরতেন, যেটা তার কেশহীন মাথা ঢেকে রাখত।”
এমন ছবি কম রয়েছে যেখানে তার টাকা মাথা দেখা গিয়েছে।
রুস্তমজি তার বইয়ে লিখেছেন, “অনেক জায়গায় তাকে ফুল ও মালা দিয়ে স্বাগত জানানো হতো। গলায় কিছু মালা পরলেও বাকি মালা কিন্তু তিনি হাতে নিতেন।”
“এর কারণ, মালা খোলার সময় তার টুপি পড়ে যেত যা তিনি মোটেও পছন্দ ছিল না।”
নেতাদের অনুকরণ করে বন্ধুদের মনোরঞ্জন
জওহরলাল নেহেরু সরকারি বাসভবনে একাধিক পোষ্য প্রাণী ছিল। এই তালিকায় ছিল কুকুর, এক জোড়া হিমালয়ান পান্ডা, হরিণ, ময়ূর, টিয়া, কাঠবিড়ালির মতো বিভিন্ন প্রাণী। শুধু তাই নয়, এই তালিকায় ছিল বাঘের তিনটে বাচ্চাও। বড় হয়ে যাওয়ার পর অবশ্য তাদের চিড়িয়াখানায় দিয়ে দেওয়া হয়।
নৈশভোজে প্রায়শই তার বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ না কেউ উপস্থিত থাকতেন। তাদের আপ্যায়ন করতেন জওহরলাল নেহেরুর। আর মেজাজে ভাল থাকলে বিভিন্ন বিশ্বনেতাদের অনুকরণ করে অতিথিদের মনোরঞ্জন করতেও দেখা যেত তাকে।
চার্লি চ্যাপলিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ
বিখ্যাত অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন নিজের আত্মজীবনীতে জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে সুইজারল্যান্ডে তার সাক্ষাতের এক চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।
চার্লি চ্যাপলিন যখন তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, সেই সময় তাদের মধ্যে কথাবার্তা এতই মধুর হয়েছিল হয়েছিল যে পরদিন মি. নেহেরুকে নিজের বাগানবাড়িতে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়ে বসেন তিনি।
চার্লি চ্যাপলিনের গাড়িতে তার পাশে বসে ওই বাগানবাড়িতে গিয়েছিলেন জওহরলাল নেহেরু। সেই গাড়ির পিছু পিছু গিয়েছিল জওহরলাল নেহেরুর গাড়ি।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জগৎ এস মেহতা তার বই ‘দ্য ট্রিস্ট বিট্রেড’ এই বৈঠকের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, “চার্লি চ্যাপলিন পণ্ডিতজিকে বলেছিলেন- আমি আপনার সমস্ত কিছুই পছন্দ করি, শুধুমাত্র একটা জিনিস ছাড়া। আপনি মদ্যপান করেন না।”
একথা শুনে মি. নেহরু হেসে বলেছিলেন, “যদি আপনার এই একটা বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে বলে মনে হয়, তাহলে আমি গ্লাস শেরি পান করতে পারি।”
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
সৌজন্যবোধ
স্বাধীনতা সংগ্রামে নেহরুর সহযোদ্ধা সৈয়দ মাহমুদ প্রথম সাক্ষাতে তার সৌজন্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
ট্রেন ভ্রমণের সময় সৈয়দ মাহমুদের হোল্ডল খুলতে এবং বাঁধতে খুব অসুবিধা হত। তাই তিনি এই কাজের জন্য সঙ্গে একজন পরিচারক নিয়ে যেতেন।
তার (সৈয়দ মাহমুদ) স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “নেহরু যখন এই বিষয়ে জানতে পারেন, তখন তিনি ট্রেন যাত্রার সময় হোল্ড খুলে বেঁধে রাখার দায়িত্ব নিজেই নিয়ে নেন।”
এরপর যখনই তারা একসঙ্গে সফর করতেন তখন জওহরলাল নেহরুই তার বিছানা পেতে দিতেন এবং পরে হোল্ডল গুছিয়ে বেঁধেও রাখতেন।
ঘানার নেতা কোয়ামে এনক্রুমাহও এমনই এক ঘটনার কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন। একবার শীতকালে ভারতে এসে ট্রেনে সফর করছিলেন তিনি।
হঠাৎই কোনও পূর্ব কর্মসূচি ছাড়াই তাকে পৌঁছাতে দিল্লি রেলস্টেশনে চলে আসেন মি. নেহেরু। একটা ওভারসাইজ ওভারকোট পরেছিলেন তিনি।
তিনি কোয়ামে এনক্রুমাকে বলেছিলেন, “এই কোটটা আমার গায়ে বড় তবে আপনার পুরোপুরি ফিট হবে। এটা আপনি পরে নিন।” কোয়ামে এনক্রুমাহ তৎক্ষণাৎ সেই কোট পরেন। কোটের মাপ তারই মতো ছিল।
ট্রেন চলতে শুরু করলে সেই কোটের পকেটে হাত ঢোকাতে গিয়ে অবাক হয়ে যান কোয়ামে এনক্রুমা। কোটের পকেটে তার জন্য মাফলার এবং একজোড়া দস্তানা রেখে দিয়েছিলেন মি. নেহেরু।
তবে তার এই সৌজন্যবোধ যে শুধুমাত্র গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জন্য ছিল, এমনটা নয়। একবার শ্রীনগরে পৌঁছানোর পর জানা যায় তার স্টেনোগ্রাফারের স্যুটকেস এসে পৌঁছায়নি। একটা সুতির শার্ট পরেছিলেন স্টেনোগ্রাফার যা শ্রীনগরের ঠান্ডার জন্য যথেষ্ট ছিল না। বিষয়টা নজরে আসতেই তৎক্ষণাৎ তার জন্য গরম কাপড়ের ব্যবস্থা করেন মি. নেহেরু।
করাচিতেও জনপ্রিয়
স্বাধীনতার পর ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো জওহরলাল নেহরুর সব মুসলিম পরিচারকদের বদলি করার পরামর্শ দেয়, বিশেষত রান্নাঘরে যারা কর্মরত ছিলেন।
আশঙ্কা করা হয়েছিল তার খাবারে বিষ মেশানো হতে পারে কারণ তার মুসলিম কর্মচারীদের অনেক আত্মীয়ই পাকিস্তানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
এম জে আকবর লিখেছেন, “যখন এই প্রস্তাব (মুসলমান কর্মচারীদের বদলির) নেহরুর কাছে যায়, তখন তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। যারা নেহরুর জন্য কাজ করতেন, তারা একপ্রকারে তাকে পুজো করতেন তবে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বলে নয়, তিনি ভাল মানুষ সেই কারণে।”
তার দর্জিদের মধ্যে একজন ছিলেন মুহাম্মদ ওমর নামে এক ব্যক্তি। দিল্লিতে তার দু’টো দোকান ছিল, একটা মুসলিম অধ্যুষিত দিল্লিতে এবং অন্যটা নয়াদিল্লিতে।
দাঙ্গার সময় নয়াদিল্লিতে তার দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই দোকান পুনর্নির্মাণে মুহাম্মদ ওমরকে অনেক সাহায্য করেছিলেন মি. নেহেরু।
মুহাম্মদ ওমর নিজের দোকানে লিখে রেখেছিলেন ‘প্রধানমন্ত্রীর দর্জি’। তার ছেলে পাকিস্তানে গেলে করাচিতে তার দোকানেও তিনি লিখিয়েছিলেন ‘প্রধানমন্ত্রীর দর্জি’।
নেহরুর ব্যক্তিগত সহকারী এম ও মাথাই তার বই ‘মাই ডেজ উইথ নেহরু’-তে লিখেছেন, “আমি একবার ওমরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে করাচিতে নেহরুর নামের জন্য ছেলের কোনও উপকার হয়েছে? এর উত্তরে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তিনি জবাব দিয়েছিলেন- পণ্ডিতজি সর্বত্রই বেস্টসেলার।”
জওহরলাল নেহরুর দর্জি হওয়ায় সৌদি আরবের বাদশাহসহ অনেক বিদেশি অতিথির জন্য কাপড় সেলাই করার সুযোগও পেয়েছিলেন মুহাম্মদ ওমর।
তার (মুহাম্মদ ওমরের) বর্ণনা করা একটা ঘটনার উল্লেখ রয়েছে মোহাম্মদ ইউনূসের লেখা ‘পারসেন্স, পেশেন্স অ্যান্ড পলিটিক্স’ বইয়ে। সেই বই থেকে জানা যায়- “একবার ওমর নেহরুকে অনুরোধ করেছিলেন তাকে একটা প্রশংসাপত্র দেওয়ার জন্য।”
মি. নেহেরু হেসে বলেছিলেন, “আমার সার্টিফিকেট দিয়ে কী হবে? বাদশাহরা তো আপনাকে সার্টিফিকেট দিয়েছেন।”
যুক্তি হিসাবে মুহাম্মদ ওমর বলেছিলেন, “কিন্তু আপনিও তো একজন বাদশাহ।”
রসিক জওহরলাল বলেন, “আমাকে বাদশাহ বানিও না। বাদশাহদের শিরশ্ছেদ করা হয়।”
মুহাম্মদ ওমর তাকে বলেছিলেন, “কিন্তু ওই বাদশাহরা সিংহাসনে বসেন। আর আপনি মানুষের হৃদয়ে রাজত্ব করেন।”
ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিন মূর্তি ভবনে বাস
নেহরু যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দেন, তখন তাকে ১৭ ইয়র্ক রোডে চার বেডরুমের একটা বাংলো দেওয়া হয়।
তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই বাংলোর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়, কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য তেমন জায়গা ছিল না সেখানে। তাই তার বাংলোর সামনে তাঁবু খাটিয়ে কাজ শুরু করেন নিরাপত্তাকর্মীরা।
লর্ড মাউন্টব্যাটেন চেয়েছিলেন নিরাপত্তার কারণে মি. নেহেরুর বাসস্থান তিন মূর্তি ভবনে স্থানান্তরিত হয়ে যাক। কিন্তু তিনি রাজি হননি। মি. নেহরুকে রাজি করাতে স্বয়ং সর্দার প্যাটেল তার কাছে যান।
এমও মাথাই তার “রেমিনিসেন্সেস অফ নেহরু’স এজ” বইয়ে লিখেছেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেল নেহরুকে বলেছিলেন যে গান্ধীকে বাঁচাতে না পারার কারণে তিনি ইতিমধ্যে অপরাধবোধে ভুগছেন।”
সর্দার প্যাটেল তাকে বলেছিলেন, “আমি আর আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে পারি না। তাই আপনি বরং তিন মূর্তি ভবনে থাকুন, যেখানে আপনি আরও বেশি সুরক্ষিত থাকতে পারবেন।”
মি. মাথাই লিখেছেন, “প্যাটেল আমাকে ডেকে বলেছিলেন, জওহরলাল আমার প্রস্তাব শুনে চুপ করে ছিলেন। তার এই নীরবতাকে আমাদের অনুমোদন হিসেবে বিবেচনা করা উচিৎ। আপনি মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে দেখা করে নেহরুর বাসস্থান বদলির ব্যবস্থা করুন।”
মি. নেহরুকে না জানিয়েই ক্যাবিনেট সেক্রেটারির কাছে এই মর্মে একটা নোট পাঠান মাউন্টব্যাটেন ।
নেহরু ইতস্ততঃ করে নতুন ঠিকানায় স্থানান্তরিত হন। তবে এই বদলের পর তাকে দেওয়া ৫০০ টাকার আতিথেয়তা ভাতা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।
প্রধানমন্ত্রীর বেতন কমানো
তার ক্যাবিনেট মন্ত্রী গোপালস্বামী আয়েঙ্গার তাকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ব্রিটেনের মতো ভারতেও প্রধানমন্ত্রীর বেতন একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর বেতনের দ্বিগুণ হওয়া উচিৎ। কিন্তু এই পরামর্শ মানতে রাজি হননি জওহরলাল নেহরু।
মি. মাথাই লিখেছেন, “প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী ও ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের বেতন মাসিক তিন হাজার টাকা রাখা হয়েছিল।”
“নেহরু এবং তার মন্ত্রীরা নিজেরাই নিজেদের বেতন কমিয়ে প্রথমে প্রতি মাসে ২,২৫০ টাকা এবং তারপরে প্রতি মাসে ২,০০০ টাকা করে দেন।”
অর্থের অপচয় অপছন্দ করতেন তিনি।
কে এফ রুস্তমজি লিখেছেন, “একবার ডিব্রুগড় ভ্রমণের সময়, যখন আমি তার ঘরে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দেখেছিলাম তার সহকারী হরি তার ছেঁড়া মোজা সেলাই করছেন।”
“তিনি (জওহরলাল নেহেরু) মাঝে মাঝে গাড়ি থামিয়ে চালককে খোলা জলের কল বন্ধ করতে বলতেন। একবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে গিয়ে দেখি তিনি নিজের হাতে তার কক্ষের আশপাশের আলো নিভিয়ে দিচ্ছেন।”
সাধারণ খাবার পছন্দ
মশলা ছাড়া সাদামাটা খাবার পছন্দ করতেন মি. নেহেরু। অনেক সময়ই রাস্তাঘাটে ময়লা গ্লাসে দেওয়া চা বা ঠান্ডা জল খেয়ে নিতেন।
রুস্তমজি লিখেছেন, “একবার যখন তিনি ভাল মেজাজে ছিলেন, আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম আপনি কী খেতে পছন্দ করেন? নেহরুর উত্তর ছিল-আমার ব্রেকফাস্ট সব সময় বাঁধা থাকে।”
“আমি তাকে টোস্ট এবং মাখন, একটা ডিম এবং খুব গরম কফি খেতে দেখেছি। কখনও মদ্যপান করতে দেখিনি। তবে হ্যাঁ, তিনি স্টেট এক্সপ্রেস ৫৫৫ ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতেন।”
“আমাকে একবার বলেছিলেন যে প্রথম দিকে দিনে ২০-২৫টা সিগারেট খেতেন। কিন্তু পরে তা কমিয়ে দিনে পাঁচটা সিগারেট খেতেন।”
মতবিরোধ সত্ত্বেও সম্মান দেখানো
জওহরলাল নেহরুর আচরণে তীব্র শালীনতাবোধের প্রতিফলন দেখা যেত। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সাধারণ সৌজন্যমূলক আচরণ করতে ভোলেননি জীবনে।
একসময় রাজাগোপালাচারীর সঙ্গে তার মতপার্থক্য দেখা গিয়েছিল। ১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে এলাহাবাদে এসেছিলেন রাজাগোপালাচারী। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রকাশ করতে কালো পতাকা নিয়ে হিন্দু মহাসভার কিছু সমর্থক স্টেশনে জড়ো হয়েছিলেন।
পিডি ট্যান্ডন তার বই ‘আনফরগেটেবল নেহরু’তে লিখেছেন, “রাজাগোপালাচারীকে নিতে রেলস্টেশনে পৌঁছেছিলেন নেহরু। রাজাজিকে কালো পতাকা দেখাতে শুরু করতেই নেহরু রেগে যান।”
তাদের হাত থেকে কালো পতাকা ছিনিয়ে নিয়ে তিনি চিৎকার করে বলেন, “এলাহাবাদে আমার অতিথিকে অপমান করার সাহস কীকরে হয় তোমাদের?”
মি. ট্যান্ডন লিখেছেন, “এর জবাবে হিন্দু মহাসভার নেতার বক্তব্য শুনে সেখানে উপস্থিত ছাত্র ও কুলিদের মনে হয়েছিল তিনি পণ্ডিতজিকে অপমান করছেন।”
“তারা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে তাকে লাঠি ও ঘুষ দিয়ে পেটাতে শুরু করেন ওই নেতাকে। এটা দেখে নেহরু খুবই বিচলিত হয়ে পড়েন। নিজের হাত দিয়ে একটা নিরাপত্তা বলয় বানিয়ে তাকে বাঁচাতে চেষ্টা করতে থাকেন। সেই সময় হাতে চোট পেয়েছিলেন নেহেরু।”