ভূমির অনেক সেবা ডিজিটাল হলেও জালিয়াতি ঘটে কেন?

    • Author, মুন্নী আক্তার
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

“ওরা প্লট দেখিয়ে বিক্রি করে। ওরা আগে থেকে একটা সীমানা দিয়ে রাখে যে আপনার এই লোকেশনটা এতটুকু,” জমি কিনে কিভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন সেটির বর্ণনা দিতে গিয়ে একথাগুলো বলছিলেন লক্ষীপুরের রবিউল ইসলাম খান।

মি. খান জানান, তিনি ২০১৪ সালে পাঁচ শতাংশ জমি কিনেছিলেন। জমি কেনার পর দলিলপত্র, রেজিস্ট্রেশন-সবই হয়ে গেছে। কিন্তু মুশকিলটা হয়েছে যে, তিনি পাঁচ শতাংশ জমির দাম দিয়েছেন, দলিলপত্রেও পাঁচ শতাংশই উল্লেখ আছে, কিন্তু তিনি দখল করতে গিয়ে জমি পরিমাপ করার পর পেয়েছেন ৪.৫ শতাংশ করে।

অর্থাৎ এখানে আধা শতাংশ জমি কম দেয়া হয়েছে তাকে।

মি. খান জানান, প্রায় ১১ বছর পার হয়ে গেলেও এখনো এই সমস্যার সমাধান হয়নি।

তিনি বলেন, একটি হাউজিং কোম্পানির কাছ থেকে জমি কিনেছিলেন। পরে প্রায় আধা শতাংশ করে জমি কম পেয়েছেন তিনি।

“দেখা যায় যে, জমিটা দেখিয়ে দেয় পাঁচ শতাংশ করে আর দেয় সাড়ে চার শতাংশ করে।”

মি. খান জানান, তার প্লটের আশেপাশে আরো চার জনের সাথেও একই ঘটনা ঘটেছে। তারাও আধা শতাংশ করে কম জমি পেয়েছেন।

“প্রত্যেকেই আমাকে জানিয়েছে যে আমার এখানে কম আছে, আমার এখানে কম আছে।”

এ বিষয়ে জমির মালিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি পাশের আরেকটি জমি থেকে আধা শতাংশ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে আরো বেশি টাকা দাবি করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

“উনি(জমির মালিক) এখন বলতেসে যে পাশের প্লট থেকে রাস্তার জমি বের করে দিবে, এর জন্য উনাকে কিছু টাকা দিতে হবে।”

রবিউল ইসলাম খান একা নন, জমি-জমা কিনতে গিয়ে নানা ধরণের প্রতারণা বা জালিয়াতির শিকার হন এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। এমন আরেকজন সাইদুর রহমান।

তিনি ২০১৬ সালের দিকে বাগেরহাট জেলায় একখণ্ড জমি কেনার বায়না হিসেবে দখলে থাকা মালিককে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলেন।

তবে সেই জমি আর তার কেনা হয়নি। উল্টো টাকাটাও আদায় করা যাচ্ছে না।

মি. রহমান জানান, যে ব্যক্তির কাছে বায়নার টাকা দিয়েছিলেন তার বাবা মারা যাওয়ার পর ওয়ারিশরা জমির মালিকানা নিয়ে ঝামেলা শুরু করে। এতে পরে আর সেই জমি মি. রহমানকে রেজিস্ট্রেশন করে দিতে পারেননি তিনি।

পরে জানাশোনা থাকার কারণে ওই ব্যক্তির কাছে বায়নার টাকা ফেরত চাইলেও তার বড় অংশই এখনো আদায় করতে পারেননি সাইদুর রহমান।

“এরপর থেকে সে আরকি ঘুরাইতেসে, আজকে না কালকে, কালকে না পরশু, পরশু না তরশু করতে করতে প্রায় বছর দুই-তিনেক পরে সে আমাকে দুই লাখ টাকা ব্যাক করলো। তিন লাখ টাকা এখনো তার কাছে বাকি।”

মি. রহমান বলছিলেন, ওই টাকার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন তিনি।

মামলায় সমস্যা কোথায়?

বাংলাদেশে যেসব ক্ষেত্রে জালিয়াতির অভিযোগ উঠে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভূমি বেচা-কেনার বিষয়টি। বিষেশজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ভূমি সম্পর্কিত যেসব আইন রয়েছে তা অত্যন্ত জটিল হওয়ার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের পক্ষে এসব বিষয়ের যথার্থতা বোঝাটা কঠিন হয়ে পড়ে।

একই সাথে দলিলপত্র যাচাই করার প্রক্রিয়া বেশ সময় সাপেক্ষ এবং জটিল হওয়ার কারণেও অনেকেই এ বিষয়টি সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে চলে যায়।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন ছাড়াও ভূমি বেচা-কেনার ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপে আলাদা আলাদা প্রক্রিয়া থাকার কারণে এই প্রক্রিয়ায় যেসব কাগজপত্র দরকার হয় সেগুলো সাধারণ মানুষের পক্ষে চেনা সম্ভব হয় না। যার কারণে যথার্থতা ধরাও কঠিন।

আর এ কারণেই অনেকে প্রতারণার শিকার হন।

আইনজীবি মিতি সানজানা বলেন, জমি জমা নিয়ে কোন জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে সেটি আসলে শেষমেশ মামলা পর্যন্তই গড়ায়।

আর বাংলাদেশে জমি নিয়ে মামলা মানেই দীর্ঘসূতিতার বিষয়। মিজ সানজানা বলেন, একটা জমি নিয়ে সমস্যা হলে সেটি সমাধান করতে গড়ে ১৭ বছর লাগে।

“দেখা যায় যে একটা জেনারেশনে সলভ হচ্ছে না, অনেক সময় ২০,২৫,৫০ বছর হয়ে যায় সেটি সলভ হতে আদালতে।”

একারণে জমি কেনার আগেই সতর্ক থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

‘জালিয়াতি কমেছে’

বাংলাদেশ সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন এর আগে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের মতো। আর এসব মামলার ৬০ শতাংশ জমিজমা সংক্রান্ত।

তবে মি. উদ্দিন বলেন, বেশিরভাগ মামলা জমি জমা সংক্রান্ত হলেও জমি জমা নিয়ে জালিয়াতির বিষয়ে মামলা এতোটা না। বরং জমির উত্তরাধিকার সূত্রে বন্টনের নানা বিষয় নিয়ে মামলার সংখ্যাই বেশি।

এছাড়া জমি কেনা বেচায় কিছু নতুন নিয়ম যুক্ত হওয়ার কারণে জালিয়াতির মাধ্যমে জমি বিক্রির বিষয়টি আগের তুলনায় বর্তমানে কমে এসেছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, জালিয়াতি সম্ভব হয় না কারণ বর্তমানে জমি বিক্রি করতে গেলে নামজারি করতে হয়। অর্থাৎ জমির মালিক হিসেবে সরকারি খাতায় বিক্রেতার নাম থাকতে হবে।

“নামজারি করতে গেলে রেকর্ড-টেকর্ড দেখে শুনানি করে নামজারি করতে হয়, এতে সময় লাগে। এটা একদম জেনুইন না হলে হয় না, নামজারি করে না,” বলেন তিনি।

“আমার বাবার নামে জায়গা থাকলে আমি বিক্রি করতে পারবো না। এটা আমার নামে নিয়ে এসে বিক্রি করতে হবে।”

আগে নামজারির শর্ত ছিল না এবং খতিয়ানের কোন একটা নথি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা যেতো বলে এ সংক্রান্ত জালিয়াতির সংখ্যা বেশি ছিল। এমনকটি একই জমি কয়েক জনের কাছে বিক্রির মতো অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে এখন নামজারি এবং খাজনা দেয়া বাধ্যতামূলক করার কারণে এই জালিয়াতি কমে গেছে বলেও জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।

“একদম শেষ হয়ে গেছে এটা না, এখন একটু সহনীয় পর্যায়ে আসছে,” বলেন তিনি।

তবে মি. আমিন উদ্দিন বলেন, ফৌজদারি মামলার তুলনায় দেওয়ানি বা জমি জমা সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় বেশি লাগে। কারণ ফৌজদারি মামলায় একজন সাক্ষী তার সাক্ষ্য দিলেও হয়। কিন্তু জমি সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়।

জমি সংক্রান্ত মামলায় দুই পক্ষকেই সাক্ষ্য দিতে হয় এবং তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এ কারণে মামলার শুনানি করতে দেরি হয়।

“সাক্ষ্য দেয়ার সময় পুরো আর্জি বর্ণনা করতে হয় তারপর অন্য পক্ষ জেরা করবে। এতে সময়টা অনেক বেশি নষ্ট হয়।”

এক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় যে, প্রথম যে সাক্ষী দিলো তার সাক্ষ্যটা হয়তো ২০-২৫ পৃষ্ঠার হয়। এই পুরোটাই আদালতে পড়া হয়। যার কারণে সময় বেশি লাগে।

সরকার যা করছে

বাংলাদেশের সরকার নতুন একটি আইনের প্রস্তাব করেছে, যেখানে জমিজমা, ফ্ল্যাট ইত্যাদি সংক্রান্ত ২৪ ধরনের অপরাধ চিহ্নিত করে তার জন্য নানা মেয়াদের শাস্তির বিধান থাকছে।

এসব অপরাধে শাস্তি ও জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন আইনে।

'ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২১' নামের এই আইনটির খসড়া বর্তমানে মতামত গ্রহণের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেয়া হয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভূমি সংস্কার বোর্ডের সদস্য মোঃ জয়নাল আবেদীন বলেন, জমি বেচা-কেনায় জালিয়াতিসহ জমি সংক্রান্ত অপরাধ কমিয়ে আনতে এ সম্পর্কিত একটি খসড়া রয়েছে।

এই খসড়া আইনটির বিষয়ে মানুষের মতামত যাচাই এবং সে বিচারে কোন সংশোধন থাকলে সেটি করে আইনটি কার্যকরের ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এই আইন কার্যকর করা হলে ভূমি সংক্রান্ত অপরাধ কমে আসবে বলে আশা করেন তিনি।

এছাড়া জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে বিভিন্ন সেবা অনলাইন-ভিত্তিক করা হয়েছে। তিনি বলেন, অনলাইন ভিত্তিক সেবার মধ্যে রয়েছে খাজনা বা কর জমা দেয়া, জমির মর্টগেজের তথ্য যাচাই, ই-নামজারি, স্মার্ট ভূমি রেকর্ড ও নকশা ইত্যাদি।

জমির বেশ কিছু সেবা এবং তথ্য অনলাইনভিত্তিক করা হলেও, সেবাগ্রহীতাকে এখনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য ভূমি অফিসে যেতেই হয়। জমির তথ্য জালিয়াতির ক্ষেত্রে ভূমি অফিসগুলোর দুর্নীতিকেও একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের খানা জরিপেও বারবার দুর্নীতিগ্রস্ত খাতের মধ্যে অন্যতম হিসেবে এসেছে ভূমি সেবা।

এর আগে জমির খাজনা স্বশরীরে গিয়ে জমা দিতে হতো বলে অনেকেই বিষয়টি জটিলতা বুঝতে পারতেন না এবং এর কারণে মধ্যস্বত্ত্বভোগী বা দালালরা সুযোগ নিতো। এই সেবাটি অনলাইনভিত্তিক হওয়ায় এখন সেই সুযোগ আর থাকছে না বলে মন্তব্য করেন মি. আবেদীন।

যদিও অনলাইনভিত্তিক হলেও সেই রেজিস্ট্রেশন চূড়ান্ত করার জন্যও ভূমি অফিসে সরাসরিই যেতে হয় এবং এনিয়ে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।

তবে ভোগান্তি কমার সাথে সাথে এসব সেবা যেহেতু আগের তুলনায় সহজ করা হয়েছে তাই এই পদক্ষেপগুলো ভূমি সংক্রান্ত জালিয়াতির মতো অপরাধ কমাবে বলে মনে করেন তিনি।

এছাড়া জালিয়াতি ঠেকাতে নতুন একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হচ্ছে যেটি দিয়ে, সাব-রেজিস্ট্রার যখন জমি নিবন্ধন করবেন তখন সেই তথ্য এসিল্যান্ড অফিসে চলে যাবে। তখন এসিল্যান্ড সেটা একবারে মিউটেশন বা নামজারি করে দেবেন।

ভূমি সংস্কার বোর্ডের সদস্য মি. আবেদীন বলেন, “মিউটেশন সাথে সাথে হয়ে গেলে একই জমি বারবার বিক্রি করা যাবে না।”