মেঘনা পাড়ের নদী ভাঙা মানুষেরা

নদীর দিকে হাত দিয়ে দেখাচ্ছিলেন "বাড়িটি এখানেই ছিল"
ছবির ক্যাপশান, নদীর দিকে হাত দিয়ে দেখাচ্ছিলেন "বাড়িটি এখানেই ছিল"
    • Author, শায়লা রুখসানা
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

চাঁদপুর শহরের হরিসভা এলাকার দীপক দাশ। মেঘনা নদীরে তীরে দাড়িয়ে নদীর দিকে হাত দিয়ে দেখাচ্ছিলেন, একসময় তার ঘরটি কোথায় ছিল।

কিন্তু সেখানে এখন আর কিছুই নেই। সেই জায়গাটি হারিয়ে গেছে নদী ভাঙনে ।

“আমার ঘরটা এখানে ছিল। রাত্র আনুমানিক বারোটার দিকে দেখলাম ব্লক পড়তেছে। আধাঘণ্টাও সময় নেয়নাই পুরা ঘরটা নদীর মধ্যে বিলীন হইয়া গেল গা”।

নিজের ঘরের জিনিসপত্র কিছুই রাখতে পারেন নি দীপক দাশ।

* <bold><link type="page"><caption> দেখুন: ইন্টার‍্যাকটিভ ম্যাপে বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ নদী</caption><url href="http://www.bbc.com/bengali/news/2016/04/160406_amar_nodi_interactive_map" platform="highweb"/></link> </bold>

তিনি বলছেন, গেল ভাদ্র মাসে যে ভাঙন হয়েছে তেমন প্রবল ভাঙন তার চল্লিশ বছরের জীবনে আর দেখেন নি।

নিরুপায় হয়ে নদীর পাড়েই আবার ঘর উঠিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান।

সাংবাদিক এসেছে দেখে দীপকের মত নদী ভাঙনের শিকার আরও অনেকেই এগিয়ে আসেন কথা বলতে।

* <bold><link type="page"><caption> ক্লিক করুন: আমার নদী, বিবিসি বাংলার ফেসুবক পাতা</caption><url href="https://www.facebook.com/events/175701469475522/?active_tab=posts" platform="highweb"/></link> </bold>

তাদের মাঝে ছিলেন স্থানীয় হরিসভা মন্দিরের যাজনিক কেদারনাথ চক্রবর্তী। তিনি চল্লিশ বছর ধরে হরিসভার পূজারী হিসেবে রয়েছেন। তার পরিবার তিনবার ভাঙনের মুখে পড়েছে।

বর্ষা এলেই শুরু হয় নদী ভাঙন আতঙ্ক।
ছবির ক্যাপশান, বর্ষা এলেই শুরু হয় নদী ভাঙন আতঙ্ক।

এ তো গেল মেঘনা নদীতে ঘর হারানো মানুষদের কথা। নদী তীরে যাদের ঘর এখনো টিঁকে আছে তারাও দিন কাটান শঙ্কা নিয়েই।

চাঁদপুরের হরিনা ফেরিঘাট থেকে একটু সামনেই গোবিন্দা এলাকা। সেখানে নদী তীরের ভাঙনের দৃশ্য চোখে পড়ে। নদীর পাড় ভেঙে পড়া মাটির চাকাও দৃশ্যমান।

দুপুরের দিকে মেঘনা নদী থেকে কলস ভরে পানি তুলছিলেন রাহিমা বেগম। এই মেঘনার পানি রান্না এবং গেরস্থালীর অন্যান্য কাজে লাগে প্রতিদিন। আবার এ নদীই তার মত নদী পাড়ের মানুষগুলোর চিন্তারও কারণ।

তাদের বাড়ি নদীর পাড় থেকে কতদূরে জানতে চাইলে রাহিমা বলেন, “নদীর থাইকা আগে তো অনেক দূরেই ছিল। এখন তো অ্যাক্কেরে লগে আইসা পড়ছে। এই বর্ষাটাও টিঁকবো কি-না জানি। এমন তো অনেকের ঘরবাড়ি গেছে”।

নদীর তীরে ঘর যাদের তাদেরও স্বস্তি নেই। গৃহস্থালীর সঙ্গী নদী। আর গৃহের কাছে এলেই ভয়।
ছবির ক্যাপশান, নদীর তীরে ঘর যাদের তাদেরও স্বস্তি নেই। গৃহস্থালীর সঙ্গী নদী। আর গৃহের কাছে এলেই ভয়।

বাংলাদেশ অন্যতম প্রধান নদী মেঘনা মূলত সুরমা, ধলেশ্বরী, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও গঙ্গার মিলিত স্রোতধারা। মেঘনার তীরবর্তী জেলাগুলোর মধ্যে নরসিংদী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ভোলা ও বরিশালের কিছু কিছু এলাকা মেঘনার ভাঙনের মধ্যে রয়েছে।

চাঁদপুরের ওপর দিয়ে দেশের ৯০ ভাগ নদ-নদীর পানি বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হয়। ফলে মেঘনা মোহনা বর্ষার সময় হয়ে ওঠে ভয়ংকর।

মেঘনার ভাঙনের কারণে এই শহরটির বেশ কিছু এলাকা এরি মধ্যে নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে বসতঘর, গাছপালা এবং ফসলি জমি ।

চাঁদপুর জেলায় বড় স্টেশন মোলহেড এলাকার কাছে মেঘনা, পদ্মা ও ডাকাতিয়া নদীর সংযোগ ঘটেছে। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্যে এই মোহনা বেশ বিপদজনক বলে পরিচিত।

কারণ এখানেই প্রবল স্রোতের ঘূর্ণিতে ডুবে গেছে একাধিক নৌযান যার আর হদিস মেলেনি। আবার সুস্বাদু ইলিশের জন্যও বিখ্যাত এই স্থানটি।

তবে চাঁদপুর জেলাটি প্রমত্ত মেঘনার উত্তাল স্রোতে ভাঙন প্রবণ হওয়ায় এখানকার অনেক মানুষ আজ বাস্তুহারা।

মেঘনা নদী চাঁদপুর জেলার মধ্যে প্রবাহিত ৪০ নটিক্যাল মাইল ধরে।

ব্লক ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা। কিন্তু স্থানীয় মানুষেরা বলছেন, বর্ষার সময় ব্লক আরও নিচে নেমে যায়।
ছবির ক্যাপশান, ব্লক ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা। কিন্তু স্থানীয় মানুষেরা বলছেন, বর্ষার সময় ব্লক আরও নিচে নেমে যায়।

মেঘনার ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য চাঁদুপরের বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করে, ব্লক ও বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।

এখনো গোবিন্দা, হাইমচর পুরান বাজার, বড় স্টেশন ঝুঁকির মধ্যে আছে। বর্ষার মৌসুম এলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায় বলে জানান স্থানীয় লোকেরা।

চাঁদপুর নদী ভাঙন প্রতিরোধ কমিটির সদস্য ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মন্টু গাজী বলছিলেন শহরের নতুন বাজার যেটি মূল হেড নামে পরিচিত সেটি এবং পুরানবাজার দুটি ব্যবসায়িক এলাকাই বিপদের ঝুঁকিতে রয়েছে।

তিনি বলেন, পুরানবাজার এলাকাটি বহু প্রাচীন একটি ব্যবসায়িক এলাকা। কিন্তু পুরান বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা নদী ভাঙনের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে রয়েছেন।

মিস্টার গাজী জানান, পুরান বাজার এলাকার ব্যবসায়ীদের কোন ব্যাংক এখন আর ঋণ দিতে চায় না।

“ব্যাংক থেকে নিষেধ আছে পুরান বাজারে সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ দেয়া। এটার জন্য আমরা অনেক আন্দোলন করেছি। কিন্তু ব্যাংক বলে আমরা কি করবো? ওপর থেকে আমাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেহেতু এটা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা”।

অসংখ্য বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা। ছবিটি হরিনা ফেরিঘাট সংলগ্ন গোবিন্দা গ্রামের কাছে তোলা।
ছবির ক্যাপশান, অসংখ্য বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা। ছবিটি হরিনা ফেরিঘাট সংলগ্ন গোবিন্দা গ্রামের কাছে তোলা।

সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা এবং নদী ভাঙন প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মজিবর রহমান বলছিলেন, এরি মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক পুরান বাজারের ব্যবসায়িক এলাকা থেকে শাখাও গুটিয়ে নিয়ে গেছে।

কারণ তারাও এখন আতঙ্কিত। তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে থাকে ব্যবসায়ীরা। প্রশাসনের লোকেরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

“অনেকগুলি ব্যাংকের শাখাও চলে গেছে এখান থেকে। ন্যাশনাল ব্যাংক, রূপালি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক এরি মধ্যে চলে গেছে। আমরা জেনেছি কৃষি ব্যাংকও চলে যাবে”।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আতাউর রহমান আতংকিত হওয়ার মত অবস্থা এখন আর নেই বলে দাবি করেন।

তিনি বলেন, "নদী ভাঙার কারণগুলো আরও কিছু হয়েছে। যেমন নদীর মধ্যে বিভিন্ন স্থানে চর পড়ায় গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে বা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় অপরিকল্পিত ড্রেজিং এর কারণে নদীপথ পরিবর্তন তরান্বিত হচ্ছে। এটাও নদী ভাঙনের একটি কারণ। তবে অত আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থা বর্তমানে নাই। আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি”।

প্রমত্তা মেঘনা ঘর নিয়ে গেছে। আবার খাবারেওর খোঁজ মেলে মেঘনার বুকে।
ছবির ক্যাপশান, প্রমত্তা মেঘনা ঘর নিয়ে গেছে। আবার খাবারেওর খোঁজ মেলে মেঘনার বুকে।

আবার ফিরে যাই ভাঙনের শিকার মানুষদের কাছে।

সত্তর বছরের বৃদ্ধ আব্দুল লতিফ।

জাফরাবাদে কয়েক বছর আগেও তার বাড়ি ছিল, জমি ছিল, হাঁস-মুরগী ছিল। ঘর বাড়ি হারিয়ে তিনি এখন নি:স্ব।

গুচ্ছগ্রাম করে কিছু মানুষের আবাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তবে অর্থের বিনিময়ে যাদের ঘরবাড়ি আছে তাদেরও সেখানে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে বলে স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়।

নদী ক্রমশ এগিয়ে আসছে লোকালয়ের দিকে।
ছবির ক্যাপশান, নদী ক্রমশ এগিয়ে আসছে লোকালয়ের দিকে।

বৃদ্ধ আব্দুল লতিফ গুচ্ছগ্রামের জন্য নাম নিবন্ধন করেও এখনও ঘরহারা।

মেঘনা নদী ভোলা, বরিশাল, মেহেন্দীগঞ্জসহ বহু অঞ্চলেই নিজের পাড় যেমন ভাঙছে, সেইসাথে ভেঙে চলেছে বহু মানুষের জীবনের গতিধারা।

চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের কারণে ঘরহারা দিশেহারা শত শত মানুষ বলছেন, ভাঙন ঠেকাতে নদীতে যেসব ব্লক ফেলা হচ্ছে সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী নয়।

বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবল স্রোতে এগুলো নিচের দিকে নেমে যায়। বালুর বস্তা ফেলে বা ব্লক দিয়ে শহরটিকে রক্ষা করা যায় না।

পানির গভীরতা সঠিক পদ্ধতিতে যাচাই করে নদী ড্রেজিং-ই মেঘনার ভাঙন ঠেকানোর একমাত্র উপায় বলে তারা মনে করছেন।