বাংলাদেশে হাজার কোটি টাকার কৃষি যন্ত্রের শিল্প

- Author, আহরার হোসেন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় বগুড়া শহরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল অনানুষ্ঠানিক শিল্পাঞ্চল।
তিন দশকেরও বেশী সময় ধরে এখানকার শত শত কারখানায় তৈরি হচ্ছে কৃষি কাজে ব্যবহৃত হরেক রকমের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ।
বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে সাতমাথা বলে পরিচিত প্রধান চত্বরের পাশেই একটি সরু গলি।
এই গলিতেই রয়েছে শ’খানেক ছোট ছোট কারখানা, যেখানে তৈরি হচ্ছে নানা কৃষি যন্ত্রপাতি।
বগুড়ায় এই কারখানাগুলো পরিচিত হালকা প্রকৌশল শিল্প হিসেবে।
এখানকার একজন কারখানা মালিক আব্দুর রহমান পশারি জানাচ্ছেন, তাঁর কারখানায় পাওয়ার থ্রেশার বা ধান ঝরানো যন্ত্র তৈরি হয়।
'ধানের মৌসুমে চার থেকে পাঁচশো পিস যন্ত্র আমি বিক্রি করি। বছরে আমার মোট বিক্রির পরিমাণ বিশ থেকে পঁচিশ লাখ টাকা'। বলছিলেন মি. পশারি।
পাশেই আরেকটি গলি, যেটিকে বলা হয় স্টেশন রোড।
সেখানে গিয়ে দেখা গেলো গোটা পঞ্চাশেক কারখানায় একই ধরণের পণ্য তৈরি হচ্ছে।
ফুট-খানেক দৈর্ঘ্যের গোলাকৃতি একটি স্টিলের সিলিন্ডার সদৃশ যন্ত্র, যেটিকে বলা হচ্ছে লায়নার।
এটি মূলত সেচ কার্যে ব্যবহৃত শ্যালো ইঞ্জিনের একটি যন্ত্রাংশ।
এরকমই একটি লায়নার তৈরির কারখানার মালিক মোহাম্মদ শাহীন বলছেন, 'সারা বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণ করি আমরা বগুড়ার কারখানা মালিকেরাই। ঢাকার ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছ থেকে মাল কেনেন। বরিশাল, খুলনা, যশোর থেকেও আমাদের কাছে কিনতে আসেন'।
লক্ষাধিক মানুষের কর্ম-সৃজন

মূলত ১৯৮০ দশকে বগুড়ার এই হালকা প্রকৌশল শিল্প ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।
বগুড়া এগ্রো মেশিনারি মেন্যুফ্যাকচারিং অ্যান্ড প্রসেসিং জোনের সভাপতি গোলাম আযম টিকুল বলছিলেন, বগুড়ায় এরকম হাজার খানেক কারখানা রয়েছে যেখানে লক্ষাধিক মানুষ কাজ করে।
এখানকার এই শিল্প বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি যন্ত্রপাতি এবং যন্ত্রাংশের শতকরা ৭৫ ভাগ চাহিদা মেটায় যার বার্ষিক বিপণন মূল্য এক হাজার কোটি টাকার বেশী।
সেই সাথে ৫'শ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ও করে উত্তরাঞ্চলীয় এই জেলা শহরটির হালকা প্রকৌশল খাত।
বগুড়ায় তৈরি এসব কৃষি যন্ত্রপাতি বিক্রয় করার জন্য শহরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি মার্কেট যেখানে রয়েছে তিনশ’রও বেশী বিপণন প্রতিষ্ঠান।
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও বগুড়ায় তৈরি বেশ কিছু যন্ত্রাংশ রপ্তানি হয় বলে জানাচ্ছেন মিস্টার টিকুল।
কৃষকদের মাঝে বগুড়ার কৃষি-যন্ত্রের কদর কতটা তা দেখতে আমি এক কৃষকের বাড়িতে গিয়েছিলাম।
তিনি তখন একটি ধান মাড়াই যন্ত্রে ক্ষেত থেকে সদ্য কেটে আনা আমন ধান মাড়াই করছিলেন।
তার ব্যবহৃত এই যন্ত্রটি বগুড়াতেই তৈরি।
এই কৃষক বলছিলেন, একসময় তারা সনাতন পদ্ধতিতে ধানমাড়াই করলেও এখন যন্ত্র ব্যবহার করেই তা করেন।
অন্তত তার পরিচিত কোনও কৃষককে এখন আর হাতে ধান মাড়াই করতে দেখেন না তিনি।
বগুড়াতেই কেন এই শিল্প?

বগুড়া শহরের অদূরেই গড়ে উঠেছে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি বা আরডিএ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।
সেখানে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে স্বনির্ভর করে তোলার উদ্যোগের পাশাপাশি নানা বিষয়ে গবেষণা করা হয়, এবং এদের গবেষণার একটি অন্যতম খাত হলো কৃষি ও কৃষি যন্ত্রপাতির উন্নয়ন।
সংস্থাটির একজন পরিচালক এ কে এম জাকারিয়ার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বাংলাদেশে এত জায়গা থাকতে বগুড়াতেই কেন, কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির এত সমারোহ? আর এর গোড়াপত্তনই বা কিভাবে হলো?
'এর পেছনে কিছু মানুষ রয়েছে। আমি বলবো তারা খুব উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন উদ্যোক্তা ছিলেন। তারমধ্যে দু-একজনের নাম আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি। এদের মধ্যে আছে টুলু ইঞ্জিনিয়ার, ধলু মেকান্ক্সি। পরবর্তী প্রজন্ম আমির হোসেন। এই লোকগুলো প্রথমে শুরু করেছিলো। তাদের দেখাদেখি আস্তে আস্তে জিনিসটা বড় হয়ে গেছে'। বলছিলেন মি. জাকারিয়া।
মি. জাকারিয়া যে ধলু মেকানিকের কথা উল্লেখ করেন তার ছেলে হলেন আমির হোসেন।
কথিত আছে এই ধলু মেকানিকই ১৯৪০ এর দশকে বগুড়াতে প্রথম হালকা প্রকৌশল শিল্পের কারখানা স্থাপন করেন।
তার দেখাদেখি পরবর্তীতে ধীরে ধীরে হালকা প্রকৌশল শিল্পের কারখানা বিস্তার লাভ করে শহর জুড়ে।
আমির হোসেনের নানা উদ্ভাবন
ধলু মেকানিকের ছেলে আমির হোসেনের সাথে আমার দেখা হয় বগুড়া শহরেই।
তিনি নিজেকে একজন উদ্ভাবক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন আমার কাছে।
শহরতলীতে তার কারখানা কাম ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখে বোঝা গেল তিনি একজন উদ্ভাবকই বটে।
নানা কিম্ভূতকিমাকার যন্ত্রপাতি তিনি সেখানে তৈরি করছেন।

বেশীরভাগই কৃষকদের কাজকে সহজ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
একটা যন্ত্র দেখিয়ে মি. হোসেন বলছিলেন, এর একপাশ থেকে পাট গাছ ঢুকিয়ে দিলে আরেক পাশ দিয়ে পাটের আঁশ পাটকাঠি থেকে আলাদা হয়ে বেরিয়ে আসবে।
আরেকটি যন্ত্র দেখিয়ে তিনি বলছিলেন, নষ্ট হয়ে যাওয়া ভুট্টা গাছ থেকে এই যন্ত্র তৈরি করবে উন্নতমানের গোখাদ্য।
আমির হোসেন তার কারখানায় আরও তৈরি করেছেন হস্তচালিত ধান কাটা যন্ত্র, গুটি ইউরিয়া তৈরির যন্ত্র, অটোমেটিক মাছের খাদ্য তৈরির মেশিন এবং এরকম আরও হরেক যন্ত্র যার সবই তিনি তৈরি করেছেন দেশীয় প্রযুক্তিতে।
অত্যন্ত সুলভ মূল্যে সেগুলোকে তিনি কৃষকদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন।
মি. হোসেন দুটি গাড়িও তৈরি করেছেন, যেগুলো তার ভাষায় কোনও জ্বালানী ছাড়াই চলে।
আমির হোসেনের ল্যাবরেটরি থেকে ফিরে যাই শহরের প্রাণকেন্দ্রে কারখানা এলাকায়।
সেখানে কারখানা মালিকেরা বলছেন, তাদের এই শিল্প আজ বিরাট আকার ধারণ করলেও অনেকটা অনানুষ্ঠানিকভাবেই চলছে তাদের ব্যবসা।
এই শিল্পের উন্নয়নের জন্য যেমনি নেই কোনও নীতিমালা, তেমনি সরকারি কোনও সাহায্য সহযোগিতাও তারা খুব একটা পান না বলে জানালেন এই খাতের ব্যবসায়ী নেতারা।








