সংলাপে রায়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বাংলাদেশের আইন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন স্কাইপ কেলেঙ্কারি বা রায়ের একটি অংশ ফাঁস হওয়ার মতো ভবিষ্যতে আরও কিছু ঘটে কি-না তা নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন।
তবে বিএনপি চেয়ারপার্সনের একজন উপদেষ্টা বলেছেন কাল্পনিক বা মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে কাউকে সাজা দেয়া হলে তার সঙ্গে জড়িতদের ভবিষ্যতে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
অনুষ্ঠানে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচর হবে কিনা এবং নির্বাচন কালীন সরকার বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসে।
ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশের বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমেনা মহসীন এবং ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনের বিশেষ সংবাদদাতা জুলফিকার আলি মাণিক।
অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন ইশরাত জাহান।
তিনি জানতে চান সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই রায়টি আংশিক প্রকাশিত হওয়ার ফলে এর গ্রহণযোগ্যতা কি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে ?
জবাবে আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন একটি শক্তিশালী চক্র যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু থেকেই ষড়যন্ত্র করছে। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে পরিকল্পিত উপায়ে। তবে সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয়টিও স্বীকার করেন তিনি।
তিনি বলেন রায় বের হওয়াতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে তা বলা যায়না। রায় পাবলিক ডকুমেন্টস। প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ নেই। প্রথম থেকেই যেভাবে ট্রাইব্যুনালকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে এটা তারই অংশ। তবে ট্রাইব্যুনালের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।
বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশের বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন এর আগে ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারকের স্কাইপ কেলেঙ্কারির তদন্ত রিপোর্ট এখনও প্রকাশিত হয়নি।
তিনি বলেন রায় ফাঁসের বিষয়টির তদন্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন দেখা যায় আইন মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার থেকে রায়টা বের হয়েছে এবং তারিখ হল ২৩ মে, তখন সাক্ষী চলছিল। তাই অনেকে বলতে চায় রায়টা মামলা শেষ হওয়ার পূর্বে নির্ধারিত অবস্থায় লিখিত ছিল।
একজন দর্শক বলেন ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে কোন প্রভাব পড়বে বলে মনে হয়না। আরেকজন দর্শক বলেন ট্রাইব্যুনাল থেকে ফাঁস হলে তেমন বিতর্ক হতোনা। আইন মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার থেকে হারিয়ে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।
আলোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমেনা মহসীন বলেন প্রক্রিয়াগত বা প্রশাসনিক কিছু দুর্বলতা আছে। এক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা ছিল।
অপর আলোচক ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনের বিশেষ সংবাদদাতা জুলফিকার আলি মাণিক বলেন রায়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সমস্যা হবেনা। তবে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা বা প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয়নি।
বিএনপি বিচার করবে ?
জয়নব বেগম ঝুনঝুন জানতে চান বিএনপি ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ভবিষ্যৎ কি হবে ?
আলোচক আমেনা মহসীন বলেন, “যুদ্ধাপরাধের বিচারগুলোর ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন। দায়মুক্তি যে সংস্কৃতি তা থেকে বাংলাদেশকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন বিএনপিকে তার অবস্থান আরও পরিষ্কার করতে হবে”।
তিনি বলেন, “বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বিএনপি যদি দেশে রাজনীতি করতে চায়। নিজের গ্রহণযোগ্যতা যদি চায় বিএনপিকে অবশ্যই এ বিচার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে।জনগণ এটা চায়। বিএনপি চাইলেও এ বিচার ভেস্তে দিতে পারবেনা। আমার মনে হয়না বিএনপি নিজের এত বড় সর্বনাশ করবে”।
একজন দর্শক বলেন, “বিএনপি সরকার যদি সুন্দরভাবে দেশ চালাতে চায় তাহলে তাদের অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চালিয়ে যেতে হবে”।
আরেকজন দর্শক বলেন, “বিএনপি বিচার করবেনা। অত্যন্ত খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তখন”।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাংবাদিক মিস্টার মাণিক বলেন বিএনপি কেন তার দল বা জোটের শরীক দলের নেতাদের বিচার করবে কেন ?
তিনি বলেন, “বিএনপি কেন তার দলীয় নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচার করবে ? জামায়াত হচ্ছে তাদের জোটের বন্ধু। কেন জোটের শরীক দলের নেতারা যারা অভিযুক্ত সে বন্ধুদের বিচার করবে?নিজের ঘরে যদি অপরাধী থাকে তার বিচার করার প্রাকটিস আমরা বাংলাদেশে দেখিনি। তাই বিএনপি সেটা করবে বলে আমি মনে করিনা।”
মাহবুব হোসেন বলেন, “বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সত্যিকারের যুদ্ধাপরাধীদের স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচার হবে। এমন বিচার হওয়া উচিত। এখন যারা বিচার কাজে সম্পৃক্ত সেই মামলার বাদী, আসামী ও সাক্ষী তাদের বিচার হবে যদি তদন্তে দেখা যায় কাল্পনিক কাহিনীর উপর মামলা হয়েছে বা মিথ্যা সাক্ষী দেয়া হয়েছে”।
মি: হোসেন বলেন, “কাল্পনিক বা মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে কাউকে সাজা দেয়া হলে ভবিষ্যতে তার বিচার হবে”।
আইন প্রতিমন্ত্রী বলেন, “পৃথিবীর আর কোথাও বাংলাদেশের মতো স্বচ্ছ বিচার হয়নি। কোটি টাকা খরচ করে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে বিচার করবে এটা আমি বিশ্বাস করিনা। কারণ তাদের সখ্যতা হল জামায়াতের সঙ্গে”।
মি: মাণিক বলেন, “আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিলো ১৯৭৩ সালে এবং খন্দকার মাহবুব হোসেন তখন প্রসিকিউটর ছিলেন”।
নির্বাচন কালীন সরকারের ফর্মুলা
রেজা সারোয়ার জানতে চান নির্বাচন কালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নতুন কোন ফর্মুলা উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা আছে কি ?
আমেনা মহসীন বলেন, “সংবিধানের কাঠামোতে থেকে অন্তবর্র্তী সরকার হতে পারে দু দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে। কিন্তু সরকার প্রধানের ক্ষমতা কমাতে হবে। তার হাতে কি ক্ষমতা থাকবে তা সংজ্ঞায়িত করতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে”।
জুলফিকার আলি মাণিক বলেন, “রাজনৈতিক সংকট যদি এমন অবস্থায় যায় যে বড় কোন দল নির্বাচনে এলোনা তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই ভালো হচ্ছে আলোচনার মাধ্যমে একটা ফর্মুলা বের করা”।
তিনি বলেন, “কখনো মনে হয় একদলীয় নির্বাচন হচ্ছে আবার মনে হয় এই বুঝি সমাধান এলো। তবে আশা করি দু দল একটি সমাধান বের করে আনবে”।
একজন দর্শক বলেন, “বিএনপি সংসদে ফর্মুলা দিচ্ছে না কেন ?”
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, “সংসদে তো সরকার সব। বিরোধী দলের ফর্মুলা তো গ্রহণ করা হবেনা। কারণ সরকার তো বলছে সংবিধান অনুযায়ী হবে। আমরা ছাড় দিতে চাই। সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর যে ক্ষমতা যে কমাতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে”।

আইন প্রতিমন্ত্রী বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়ার প্রশ্ন আসেনা। সংবিধানের মধ্যেই সমাধান আছে। নির্বাচন কালীন সরকারের নেতৃত্ব দিবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বিরোধী দলের শেয়ার থাকতে পারে। সে সরকারের কাঠামো, দায়িত্ব এবং নির্বাচন কমিশনকে কত শক্তিশালী করা যায় সেটা আলোচনা করে সমাধান হতে পারে”।
বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:
"কাল্পনিক কাহিনী বা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে কাউকে সাজা দেয়া হলে ভবিষ্যতে তার বিচার হবে।" অবশ্যই হওয়া উচিত। রায় ফাঁসের মধ্যদিয়ে এই রায় গ্রহনযোগ্যতা হারিয়েছে। এটি একটি প্রশ্নবিদ্ধ রায়। এরজন্য বর্তমান সরকারকেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। এবং কোন ভাবেই নির্বাচনকালির সরকার প্রধান হিসাবে শেখ হাসিনা গ্রহনযোগ্য নয়। অবশ্যই সংবিধান সংশোদন করে নির্দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচন দিতে হবে। উন্নত বিশ্বের গনতন্ত্রের দোহায় দিয়ে লাভ নেই, কারণ তাদের রাজনৈতিক চরিত্র আর আমাদের রাজনৈতিক চরিত্রের অনেক অনেক প্রার্থক্য।
মিজানুর রহমান, ঢাকা
বাংলাদেশে দু কোটি নব্বই লাখ জামায়াত শিবির আছে। এদেরকে কিভাবে অবহেলা করবেন। এটা পাগলের প্রলাপ নয় কি ?
মো: আব্দুল লতিফ, ঢাকা।
আওয়ামী লীগে কি যুদ্ধাপরাধী নেই ? তাদের বিচার হোক আগে।
মো: রহমত আলী, সিলেট।
জাতিকে বিভক্ত করে আওয়ামী লীগ সস্তায় ইস্যু সৃষ্টি করে ফায়দা লুঠতে চায় । জনগন যত শিক্ষিত হবে তত সস্তায় রাজনীতি বন্ধ হবে ।
হাবিব চৌধুরী, হামাদ টাউন, বাহরাইন।
নিজের ঝুঁড়িতে পচা আম রেখে অন্যের ঝুঁড়ি পরিষ্কার করে কোনদিনও পচনরোধ করা সম্ভব নয়। নিরাপরাধীর পক্ষে যাওয়া আর যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে যাওয়া এক কথা নয়।








