রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভারতের স্বার্থে: বিএনপি এমপি

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা বগুড়ায় অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে জাতীয় সংসদের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও বিরোধী দল বিএনপির সংসদ সদস্য বলেছেন ভারতের স্বার্থেই বাগেরহাটের রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।
তবে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য বলেছেন সুন্দরবনের ক্ষতি হবে এমন সিদ্ধান্ত সরকার কেন গ্রহণ করবে।
সংলাপের এ পর্বে পোশাক খাতে মজুরী নিয়ে অসন্তোষ এবং নির্বাচন কালীন সরকার নিয়েও প্রাণবন্ত বিতর্ক হয়েছে।
শনিবার বগুড়ার পৌর টিটু মিলনায়তনে সংলাপের এ পর্বে আলোচক ছিলেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মোমিন তালুকদার, আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা টি এম এস এস –এর নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগম এবং কবি ও প্রাবন্ধিক বজলুল করিম বাহার।
অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন শারমিনা ইয়াসমিন মিতু। তিনি জানতে চান বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও সুন্দরবনের কাছাকাছি একটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন কি যুক্তিযুক্ত হচ্ছে ?
জবাবে আব্দুল মান্নান বলেন, “বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থান নিয়ে জেদ ধরার সুযোগ নেই। ক্ষতির কোন সম্ভাবনা হলে করা ঠিক না। কিন্তু সবকিছু বিবেচনা করে সরকার বলেছে সরকার বা পরিবেশের উপর কোন প্রভাব পরবেনা। সুন্দরবনের বা পরিবেশের ক্ষতি সরকার কেন চাইবে”।
তিনি বলেন, “সরকার একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু এটি যে চূড়ান্ত তাতো নয়। ক্ষতি হলে স্থান পরিবর্তন হতে পারে। না হলে কেন্দ্রটি হতে সমস্যা কোথায়” ?
বজলুল করিম বাহার বলেন, “ রামপালের প্রকল্প একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ভারতে তো সুন্দরবনের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যায়না। এখানে তো ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে হচ্ছে"।
তিনি বলেন, "কেন্দ্রটি হলে সুন্দরবনের জন্য বিপর্যয় হবে। এটা ভয়াবহ ক্ষতিকর বিষয় হবে”।
একজন দর্শক বলেন, “ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে গাছ পরিবেশ হরিণ সহ সবকিছুর ক্ষতি হবে”।
আরেকজন দর্শক বলেন, “ আমরা বন সৃষ্টি করতে পারিনা। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারি। অন্য কোথাও এ কেন্দ্র নির্মাণ করা হোক”।
হোসনে আরা বেগম বলেন, “দেশের প্রায় সব মানুষ চায় সুন্দরবন রক্ষা করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করে হোক। সুন্দরবন মনুষ্য সৃষ্টি নয়, বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে কোন জায়গায় করা যাবে”।
তিনি বলেন, “ বাংলাদেশের তিনদিকে ভারতীয় সীমান্ত। যৌক্তিকতা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে সুন্দরবনকে রক্ষা করে যেখানে করা যায় সেখানেই এ কেন্দ্র করা উচিত”।
আব্দুল মোমিন তালুকদার বলেন আমরা কমিটি থেকে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছিলাম যে সুন্দরবনের ক্ষতি বা জীব বৈচিত্র্যের ক্ষতি হলে সেটা করা যাবেনা। কিন্তু সরকার বদ্ধপরিকর”।
তিনি বলেন, “আসলে ভারত সরকার এটাকে অন্যত্র চায়না বা তাদের অস্বীকৃতির কারণেই ভারতের স্বার্থ বেশি দেখা হচ্ছে। জনগণ চাইছে অন্য কোন স্থানে হোক, সরকারের সমস্যা কোথায় সেটি সরাতে”।
পোশাক শিল্পে অসন্তোষ
মিনারা খাতুন জানতে চান পোশাক খাতে মজুরি কাঠামো নির্ধারণে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনে সব পক্ষ কি সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছে ?
বজলুল করিম বাহার বলেন, “ পানি ঘোলা করে এমন পরিস্থিতি করা হয়েছে যে গোটা গার্মেন্ট সেক্টর অস্থিরতায় পড়েছে। একজন মন্ত্রী এখানে নাক গলিয়েছেন তা সঠিক হয়নি”।
হোসনে আরা বেগম বলেন, “কৌশলে কিছুটা ত্রুটি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নন এমন মন্ত্রী যেভাবে ডাকলেন সেখান থেকেই শ্রমিকরা অতি উৎসাহী হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ এবং চীন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এক্ষেত্রে রয়েছে”।
একজন দর্শক বলেন, “ মন্ত্রীর বক্তব্যের পরপরই অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে”।
আরেকজন দর্শক বলেন, “মন্ত্রী শাজাহান খান শ্রমিক সমাবেশ না করে যদি বিজিএমইএ র সাথে আলোচনা করে একটি সমাধান আনতেন তাহলে কি ভালো হতোনা” ?
আব্দুল মোমিন তালুকদার বলেন, “ গার্মেন্ট খাতের বিরুদ্ধে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্র রয়েছে। শ্রমিকদের উস্কানি দেয়ার কারণে সংকটের সৃষ্টি হয়েছ। সঠিক পদক্ষেপ নিলে এ অবস্থা হতোনা। সরকার কি কখনো বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়েছে ? এ বৃহৎ খাত রক্ষায় সর্বদলীয় উদ্যোগ নেয়া উচিত এখনি”।
আব্দুল মান্নান বলেন, “ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী না থাকায় শাজাহান খান ওখানে গেছেন। এখন তার কোন ভূমিকা আছে বলে মনে করিনা। সরকারকে অভিযুক্ত করার কোন সুযোগ নেই। তবে সরকারের দায়িত্ব অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। এটি প্রাইভেট সেক্টর"।
তিনি বলেন, "মজুরী বোর্ড কাজ করছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা হবে এবং এর মাধ্যমেই সমাধান হবে”।
নির্বাচন কালীন সরকার
মাহমুদুল হাসান জানতে চান তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল ছাড়া আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বর্তমান অন্য কি উপায় আছে ?
আব্দুল মান্নান বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি ডেড ইস্যু। এখন বিরোধী দলকে তো বলতে হবে তারা কি চায়। তারা সংসদে প্রস্তাব জমা দিয়েও প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তারা প্রস্তাব দিলে আমরা যদি গায়ের জোড়ে তা বাতিল করি তাও তো জনমত তাদের পক্ষে যাবে”।
আব্দুল মোমিন তালুকদার বলেন, “ প্রায় সবাই চায় সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হোক। কিন্তু সরকার চায় বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন করতে। বাংলাদেশে কোন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পরিবেশ আসেনি। নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে হবে”।
তিনি বলেন, “ আলোচনার তো সুযোগ দেখা যাচ্ছেনা। কারণ প্রধানমন্ত্রী বলছেন এক চুল সরবেননা”।
একজন দর্শক বলেন,” সংবিধান জনগণের জন্য। জনগণের জন্য সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে তাই করা দরকার”।
বজলুল করিম বাহার বলেন, “সরকারকে যেকোনো ভাবে সমঝোতায় আসতে হবে। ডেডলাইন ২৫ অক্টোবর। এরপর সংঘর্ষ হলে কি হবে”।
হোসনে আরা বেগম বলেন, “গত নির্বাচনের ভোটের অনুপাতে সব দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে নির্বাচন কালীন নির্দলীয় সরকার করা হলে তাহলে সরকার সাজানোর কোন ব্যাপার থাকবেনা”।
আব্দুল মান্নান বলেন, “আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে। প্রধানমন্ত্রী কিভাবে সরবেন অবস্থান থেকে কারণ সংবিধান তো তাকে মানতে হবে”।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট
মোসাম্মৎ নাজনীন সুলতানা জানতে চান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট কমানো কি সম্ভব। তিনি জানান চার বছরের কোর্স শেষ করতে এখন প্রায় ছয় বছর সময় লাগছে ।
হোসনে আরা বেগম বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে সময় ও নিয়ম অনুসরণ করতে হবে যাতে সেশন জট না হয়”।
বজলুল করিম বাহার বলেন, “এ সমস্যার মূল কারণ ব্যবস্থাপনা পরিষদ। খাতা দেখা, টেবুলেশন করা এসব কিছুতে গলদ রয়েছে। ব্যবস্থাপনা ভালো হলে সেশনজট থেকে শিক্ষার্থীরা মুক্ত থাকতো”।
আব্দুল মান্নান বলেন, “জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা সেভাবে হয়নি। এখানে শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে প্রশাসন চালানো অতীতে বা এখনো হচ্ছেনা। যে পদ্ধতিতে চালালে সেশনজট কমবে সেভাবে চালাতে তাদের দক্ষতার অভাব রয়েছে”।
আব্দুল মোমিন তালুকদার বলেন, “ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজনীতি মুক্ত রাখলে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে। দলীয় নিয়োগের কারণে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ ভাবে চলতে দিলে এ সমস্যা হবে বলে মনে হয়না”।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:
The way the finance minister said that people can do whatever they want but Government will not change their decision. Is it a language of democracy? I think Government is looking to satisfy only India, not people of Bangladesh.
Pothik, Toronto
সরকার দলের সংসদ সদস্য বলেছেন, “সরকার একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু এটি যে চূড়ান্ত তাতো নয়। আমার প্রশ্ন হলো, এটি চূড়ান্ত না হলে ২১ তারিখে প্রধানমন্ত্রী রামপাল যাচ্ছেন কেন? জনগনের টাকায় আনন্দ ভ্রমন করতে ? আমি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো দাদা-বাবুদের তুষ্ট করা থেকে ফিরে আসুন, নয়তো জনগণ আপনাকে সময়মত উচিত জবাব দিবে ইনশা-আল্লাহ।
মিজানুর রহমান, ঢাকা
সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও সুন্দর একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে আইন সংশোধনের মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি দু'বারের বেশী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না এ জাতীয় আইন পাশ করলে জনসাধারণের পাশাপাশি দেশও অনেক এগিয়ে যাবে। এর সাথে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণরুপে স্বাধীন করতে হবে। সবোর্পরি ব্যক্তির চেয়ে দল বড় এ কথাটি মাথায় রেখেই সকল দলের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।
মোঃ তারিকুল ইসলাম, ঝিনাইদহ
বাগেরহাটের রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করলে ভারতের লাভ কেননা বাংলাদেশের সুন্দরবন ধ্বংস হলে ভারতের সুন্দরবনের ক্ষেত্রে লাভ বেশী। বাংলাদেশের সাথে ভারতের কি রকম সম্পর্ক তা ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা মমতা ব্যানার্জীর আচরনেই বোঝা যায়। বাংলাদেশের সকল প্রকার চুক্তিতেই তিনি বিরোধিতা করছেন। তাহলে যেখানে ভারতের সকল প্রকার স্বার্থের কথা বিবেচনা আমরা করি কেন তারা আমাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করছেন না। যদি আমাদের স্বার্থের কথা তারা বিবেচনা না করে তবে আমরা কেন তাদের কথা ভাবব।
মোঃ তারিকুল ইসলাম, ঝিনাইদহ
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবর না হওয়াই ভালো, ভারত এর স্বার্থ দেখলে হবে না। নিজেদের স্বার্থ আগে দেখতে হবে।
আব্দুর রাকিব, সিলেট
VERY GOOD BBC SANGLAP
MD JOLIL ALI , DUBAI
নিজের ঝুঁড়িতে পচা আম রেখে অন্যের ঝুঁড়ি পরিষ্কার করে কোনদিনও পচনরোধ করা সম্ভব নয়। নিরাপরাধীর পক্ষে যাওয়া আর যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে যাওয়া এক কথা নয়।
নুর মোহাম্মদ মজুমদার, দোহা,কাতার।
বাগেরহাটের রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে সুন্দরবনের ক্ষতি হয়ে থাকলে পরিবেশ বিদদের মতামত নিয়ে নিরাপদ দুরত্বে স্থাপন করা দরকার । আর যদি আদৌ কোন ক্ষতি না হয় তাহলে শুধু শুধু আমিত্ববোধ জবায় রাখার জন্য বিরোধিতার খাতিরে বিরুধিতা না করে এবং সরকারও জেদ ধরে বসে না থেকে দেশের উন্নয়নে এগিয়ে যাওয়া উচিৎ বলে মনে করি। কামনা করি আমাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হউক।








