মার্কিনদের এক হাত হাক্কানি নেতার

সিরাজুদ্দিন হাক্কানি
ছবির ক্যাপশান, হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতা সিরাজুদ্দিন হাক্কানি

আফগানিস্তানে হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতা বিবিসিকে বলেছেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং আফগান সরকারের সঙ্গে শান্তি-আলোচনা চালানোরও প্রস্তাব দিয়েছে৻

সিরাজুদ্দিন হাক্কানি অবশ্য একে তালেবানের কাছ থেকে তাদের গোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করার একটি চেষ্টা হিসেবেই বর্ণনা করেছেন৻

কাবুলে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বিধ্বংসী জঙ্গী হামলার বেশ কয়েকটার জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে হাক্কানি নেটওয়ার্ককে – যারা আফগান-পাকিস্তান সীমান্তে সবচেয়ে সহিংস জিহাদী আন্দোলন৻

অপরাধ ও রাজনৈতিক হিংসার জন্যই তারা পরিচিত – কিন্তু পাশাপাশি নিজেদের কর্মকান্ড নিয়ে এই গোষ্ঠী আধুনিক প্রচার চালাতেও পিছপা নয়৻

তবে এই গোষ্ঠীর নেতা সিরাজুদ্দিন হাক্কানি বিবিসি পাশতো বিভাগের পাঠানো প্রশ্নগুলোর রেকর্ড-করা জবাব পাঠিয়ে তাদের যে বক্তব্য জানিয়েছেন – সেই সাক্ষাৎকার অবশ্যই খুব বিরল একটি ঘটনা, এবং তাদের গোষ্ঠীর ভাবনাচিন্তা সম্পর্কেও সেখান থেকে পরিষ্কার একটা আভাস মেলে৻

সিরাজুদ্দিন হাক্কানি
ছবির ক্যাপশান, হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রচারপত্রে সিরাজুদ্দিন হাক্কানি

বিবিসি মনে করে রেকর্ড করে পাঠানো হলেও এই সাক্ষাৎকারটি খাঁটি, আর সেটি শুরুই হয়েছে বিবিসির শ্রোতাদের প্রতি সিরাজ হাক্কানির অভিবাদন দিয়ে৻

সম্প্রতি আমেরিকার সর্বোচ্চ সেনা কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল মাইক মালেন সরাসরি বলেছেন, হাক্কানি নেটওয়ার্ক আসলে পাকিস্তানি গোয়েন্দা বিভাগ আই এস আইয়েরই একটা শাখা৻

এর জবাবে সিরাজ হাক্কানি যেটা বলেছেন তার মর্মার্থ হল, ওই অঞ্চলে যে সব শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছে, তাদের প্রায় সবাই তাঁর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বা করেছে – এবং এর মধ্যে পাকিস্তানি বা মার্কিনরাও পড়ে৻

কিন্তু পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখেই তারা কাজ চালান, সে কথা মানতে চাননি তিনি৻

তাঁর কথায়, ‘সোভিয়েত অভিযানের সময় শুধু আমরা নই, সব মুজাহিদিন গোষ্ঠীর সঙ্গেই পাকিস্তানি গোয়েন্দা বিভাগ আই এস আইয়ের সম্পর্ক ছিল৻ কিন্তু এখন আর সে সম্পর্ক রেখে মুজাহিদিনদের তো কোনও লাভ হবে না!`

সিরাজ হাক্কানি আরও বলেন, ‘আফগানিস্তানে যে দিন থেকে আমেরিকা পা-রাখল, সেই প্রথম দিন থেকে আজ অবধি শুধু পাকিস্তান নয় – আমেরিকা-সহ বিভিন্ন মুসলিম ও অমুসলিম দেশই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, এখনও করে চলেছে৻`

তিনি দাবি করেন তারা এই গোষ্ঠীকে আফগান সরকারে বড় পদ দেওয়া হবে বলে টোপও দিয়েছে – কিন্তু তাঁরা সাড়া দেননি৻

কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, ‘আসলে আমরা জানি এরা শান্তি চায় না – এরা ইসলামি আন্দোলনকে বিভক্ত করতে চায়৻`

তবে সিরাজুদ্দিন হাক্কানির এই সাক্ষাতকারে তিনি একটা জিনিসের ওপর বারে বারে জোর দিয়েছেন – আর তা হল হাক্কানি নেটওয়ার্ক কোনও একক, বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী নয়; তারা তালেবানেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ৻

স্পষ্টতই এটা একটা নতুন রাজনৈতিক বার্তা – কারণ পশ্চিমী বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করেন এই নেটওয়ার্কের যথেষ্ট পরিমাণে স্বাধীনতা আছে৻

এই নেটওয়ার্ক ঠিক কীভাবে কাজ করে, সেটা ব্যাখ্যা করে সিরাজ হাক্কানি বলেন, ‘আমীর-উল মোমিনিন মোল্লা ওমরই আমাদের নেতা – তার নির্দেশই আমরা মেনে চলি৻`

সিরাজুদ্দিন হাক্কানি

ছবির উৎস, Other

ছবির ক্যাপশান, সিরাজুদ্দিন হাক্কানির সন্ধানে এফবিআইয়ের পোস্টার

তাঁর কথায়, ‘তবে ইসলামি আমিরাতের ভেতর নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে আমাদের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত আছে, সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করে যাই৻ প্রতিটি সামরিক অভিযানে ইসলামী আমিরাতই আমাদের নির্দেশ দেয়, পরিচালনা করে, আর্থিক মদতও জোগায়৻ আমরা সেটা হুবুহু মেনে চলি৻`

তিনি সেই সঙ্গেই দাবি করেন, ‘এখানে আলাদা কোনও দল বা গোষ্ঠী চালানোর প্রশ্নই ওঠে না৻ ফলে সংবাদমাধ্যম আমাদের যতই আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করুক, বা বিভক্ত করতে চাক – তাতে তারা সফল হবে না৻`

সিরাজ হাক্কানি আরও বলছেন, জিহাদ-বিরোধী শক্তিগুলো তাদের পরাজয় আড়াল করতে এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতেই এ ধরনের প্রচার চালাচ্ছে৻

অবশ্য বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা জোনাথন মার্কাস জানাচ্ছেন, অনেক পর্যবেক্ষকেরই ধারণা ইসলামী জঙ্গী আন্দোলনগুলোর ভেতর কারা নেতৃত্ব দেবে, সেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ক্রমশ প্রকট হচ্ছে৻

আর সেই দ্বন্দ্বে হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রভাব বলয় ক্রমশ বাড়ছে, দিনে দিনে আরও বড় ভূমিকায় আত্মপ্রকাশের জন্য তারা চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে৻