টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২২: ভারত বনাম বাংলাদেশ ম্যাচ ঘিরে যে চারটি আলোচনার বিষয়

ছবির উৎস, MANJUNATH KIRAN
- Author, রায়হান মাসুদ
- Role, বিবিসি বাংলা
বুধবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভ পর্বের ম্যাচে মুখোমুখি হবে দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ সময় দুপুর দুইটায় অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডেলেইডে শুরু হবে এই ম্যাচটি।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ঐতিহাসিক অ্যাডেলেইড, যে মাঠে বাংলাদেশ ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা নিশ্চিত করেছিল।
ব্যাঙ্গালোরে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ এক রানে হেরেছিল ভারতের বিপক্ষে, এই ম্যাচের স্মৃতিও অনেক সমর্থকদের মনে স্পষ্ট।
এবারও বাংলাদেশের সামনে আছে সেমিফাইনালের হাতছানি, তবে তার আগে কঠিন একটা পথ অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য।
সেটা সাকিব আল হাসানের মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনেই স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ যদি ভারত বা পাকিস্তানের সাথে জিতে যায় সেটা হবে অঘটন।
"ভারতের দলের দিকে তাকান, ওদের স্কোয়াডে যেসব ক্রিকেটার আছে, তাতে ওদের সাথে জিততে পারলে অঘটনই বলবো।"
তিন ম্যাচে দুই ম্যাচ জিতে বাংলাদেশের এখন হারানোর কিছু নেই এটা ঠিক, কিন্তু পাওয়ার আছে অনেক কিছু।
বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচের আগে চাপে ভারত
বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্লেষক সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি বিবিসি বাংলাকে বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে যেভাবে ভারত যেভাবে ধসে পড়েছে ব্যাটিংয়ের শুরুতে এবং বোলিংয়ের শেষ ১০ ওভারে তাতে এটা ভারতকে ভাবাবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হারের পর ভারতের ক্রিকেটাররা মানসিক চাপে থাকবেন বলে মনে করেন মি. হুসেইন।
ভারতের সামনে এখন দুটি প্রতিপক্ষ - বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে।
তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ হলেও এই দুটি ম্যাচ না জিতলে ভারতের সেমিফাইনালে খেলা নিয়ে শংকা থেকে যাবে।
বাংলাদেশের জন্য ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি সুযোগ, সেমিফাইনালে যাওয়ার যে ক্ষীণ সম্ভাবনা এখন পয়েন্ট টেবিলের দিকে তাকিয়ে সেটাকে জিইয়ে রাখার।
তবে সাকিব আল হাসান আজ সংবাদ সম্মেলনে বাস্তবতার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, "দেখেন ভারত এই মাঠে কয়টি ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছে। শুধু তাসকিন আর আমিই এর আগে এই মাঠে খেলেছিলাম (সাত বছর আগে)। আমরা চেষ্টা করবো। কিন্তু দুই দলের জন্য পরিস্থিতি সমান নয়।"
ভারত অ্যাডেলেইডে এখনও পর্যন্ত ২৯টি ম্যাচ খেলেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতের দুর্বলতা বাঁহাতি ফাস্ট বোলার
বা-হাতি ফাস্ট বোলারদের বিপক্ষে ভারত ইনিংসের শুরুতে, এটা যেন ক্রিকেটে একটা অলিখিত নিয়ম হয় গেছে।
ভারতের টপ অর্ডার এর আগে পাকিস্তানের ফাস্ট বোলারদের বিপক্ষে ভুগেছে, ৩১ রানে চার উইকেট হারিয়েছিল ভারত।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৪ উইকেট হারিয়েছে ৪১ রানের মাথায়।
লুঙ্গি এনগিদির বল খেলতে সমস্যা হচ্ছিল ভারতের।
এনগিদি ২৯ রানে চারটি এবং বাঁহাতি ফাস্ট বোলার ওয়েইন পারনেল ১৫ রান দিয়ে তিনটি উইকেট নিয়েছেন।
ভারতের এই দুর্বলতার জায়গার কথা মাথায় রেখে সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি বলেন, "বাংলাদেশ শরিফুলকে ট্রাই করতে পারে। বাঁহাতি ফাস্ট বোলার এবং শরিফুল লম্বা গড়নের হওয়ায় আরও ওপর থেকে বল রিলিজ করতে পারবে।"

ছবির উৎস, Getty Images
মুস্তাফিজুর রহমান ভারতের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার হয়ে উঠতে পারেন বাংলাদেশের জন্য।
ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে ফরম্যাটে মুস্তাফিজের অভিষেকের কথা বাংলাদেশের সমর্থকদের অনেকের মনেই দাগ কেটে গিয়েছিল। সেই মুস্তাফিজ আর এই মুস্তাফিজে অনেক বছর কেটে গেছে। ফর্মের দিক থেকেও মুস্তাফিজ আগের মতো প্রতিপক্ষের মনে শংকা তৈরি করেন না।
কিন্তু সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি মনে করেন, "২০১৬ সালে মুস্তাফিজের একটি চোটের পর তার অ্যাকশনে পরিবর্তন এসেছিল। সেই পরিবর্তন থেকে তাকে আবারও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে কাজ করেছেন বর্তমান বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ড ও টেকনিকাল কনসালটেন্ট শ্রীধরন শ্রীরাম।"
চলতি বিশ্বকাপে মুস্তাফিজ আশা দেখাচ্ছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দারুণ বল করেছেন তিনি।
এক ওভারে দুই উইকেট নিয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
বাংলাদেশের ক্রিকেট সাংবাদিক দেবদুলাল চৌধুরী বিশ্বকাপ কভার করতে এখন অস্ট্রেলিয়ায় আছেন।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ভারতের টপ অর্ডারে ছয় ব্যাটসম্যানের পাঁচজনই ডানহাতি; রাহুল, রোহিত, বিরাট, সুরিয়া, কার্তিক।
"সাকিবের কথা শুনে যতটুকু মনে হয়েছে, তাদের বিপক্ষে তিনি নিজে এবং মোস্তাফিজ ছাড়াও আরো কোন অপশন নিয়ে হয়তো ভাবছেন।"
দেবদুলাল চৌধুরীর মতে, "ডানহাতি ব্যাটারদের বিপক্ষে বাঁহাতি বোলারদের কার্যকর হওয়ার তত্ত্ব সাকিব নিজে বিশ্বাস করেন এবং ম্যাচের পরিস্থিতিতে সেটা কাজে লাগানোর ব্যাপারেও যথেষ্ট আগ্রহী বলেই মনে হয়েছে"

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা ব্যাটিং নিয়ে
অ্যাডেলেইড থেকে দেবদুলাল চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এই বিশ্বকাপে এখনো পর্যন্ত ফাস্ট বোলাররা যথেষ্ট ভালো করেছেন, বাংলাদেশ দলেও সেই প্রমাণ রয়েছে।
"সমস্যাটা হচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাটাররা ভালো মানের ফাস্ট বোলিং এর বিপক্ষে খুবই দুর্বল। সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচেও সেটাই দেখা গেছে। উল্টোদিকে ভারতের বোলিং লাইন আপ এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা।"
এটা বাংলাদেশের ব্যাটারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন মি. চৌধুরী, বিশেষ করে পুরো ব্যাটিং ইউনিটই যখন কম বেশি অফ ফর্মে।
বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে বিবেচিত লিটন দাস এই টুর্নামেন্টে ব্যাট হাতে ভালো করতে পারছেন না।
শুরুটা পাচ্ছেন তিনি, এমনকি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও ভালো টাইমিং করে তিনটি চার মারার পর স্কুপ করতে গিয়ে আউট হয়ে গেছেন তিনি।
ক্রিকেট বিশ্লেষক সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি বলেন, "লিটন দাসের এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রাশ শট খেলা। এমন একটা শট খেলা যেটা খুব একটা বিবেচনার প্রমাণ দেয় না।"
লিটন নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে করেছিলেন ১১ বলে ৯ রান, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩১ বলে ৩৪ এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১২ বলে ১৪ রান।
সৌম্য সরকার বাংলাদেশের হয়ে বেশ কিছু ভালো ইনিংস খেলেছেন টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে। কিন্তু তাকে যে প্রত্যাশা নিয়ে দলে নেয়া হয়েছে সেটা তিনি ঠিক পূরণ করতে পারছেন না।
টপ অর্ডারে এই দুজন ক্রিকেটারের ব্যর্থতা পুরো দলের ব্যাটিংয়ে প্রভাব ফেলছে।
বল খরচা হচ্ছে, উইকেটও খরচা হচ্ছে প্রথম ছয় ওভার অর্থাৎ পাওয়ারপ্লের মধ্যেই।

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশের বাস্তবতা মাথায় রাখা দরকার
ভারত ও বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে এখনও পর্যন্ত ১১ টি ম্যাচ খেলেছে, বাংলাদেশ এর মধ্যে একটিতে জয় পেয়েছে।
বেশ কটি ম্যাচ ছিল যেখানে মনে হয়েছে বাংলাদেশ জয় পেতে পারতো, কিন্তু পরিসংখ্যানে স্পষ্ট যে বাংলাদেশ আর ভারতের টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের শক্তির পার্থক্যটা অনেক বড়।
সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যদি ইতিবাচক হতে গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে প্রথমেই বল পেটাতে শুরু করে সেক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচের মতো হিতে বিপরীত হতে পারে। বাংলাদেশের দরকার পরিস্থিতি মাথায় রাখা।"
যা যা বাস্তব তা নিয়ে কাজ করার কথা বলছেন তিনি, এক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশের ওপেনার নাজমুল হোসেন শান্ত'র প্রশংসা করেছেন যিনি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৫৫ বলে ৭১ রান তুলেছেন।
"বাংলাদেশের উচিৎ হবে ১৬০ রান টার্গেট করে ব্যাট করা। এরপর ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী সেটা ১৭০ও হতে পারে। ওই দশ রান বোনাস।"
সাকিব আল হাসানও আজ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, "আমরা যেভাবে ম্যাচ জিতেছি তাতে আমি খুশি। আগে আমরা ক্লোজ ম্যাচ হারতাম। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে শেষ ২ ওভারে ফল নির্ধারিত হয়। ওই সময়টা মাথা ঠাণ্ডা রাখা দরকার।"








