বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী অভিযোগে বেঙ্গালুরুর জেলে পশ্চিমবঙ্গের এক বাঙালি পরিবার

অধিকারী দম্পতিকে ভারতের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া পরিচয়পত্র

ছবির উৎস, Pintu Hawladar

ছবির ক্যাপশান, অধিকারী দম্পতিকে ভারতের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া পরিচয়পত্র
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা

ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে কারও মুখে বাংলা শুনলেই তাকে বাংলাদেশি, অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দেওয়ার চল বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠছে।

মুম্বাই, দিল্লির মতো শহরে অনেক পশ্চিমবঙ্গবাসীকেই এর আগে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে হেনস্থা, মারধর, এমনকি গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হয়েছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গের যেসব জেলার মানুষের কথাবার্তার সঙ্গে সীমান্তের অপর প্রান্তের কথা বলার অনেক মিল আছে, তাদের আরও বেশি করে হেনস্থা হওয়ার ভয় তৈরি হচ্ছে।

বিবিসি বাংলায় সম্পর্কিত খবর:

বাঙলাভাষীদের গ্রেপ্তার ও হেনস্থা

সম্প্রতি দক্ষিণ ভারতীয় শহর বেঙ্গালুরুতেও পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদের হেনস্থা আর গ্রেপ্তারের ঘটনা সামনে আসছে।

পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা এক বাঙালি দম্পতি ও তাদের শিশু পুত্রকে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে বেঙ্গালুরুর পুলিশ।

ওই পরিবারটি চার মাস আগে গ্রেপ্তার হলেও বৃহস্পতিবার রাতে ঘটনাটি সামনে এসেছে।

বেঙ্গালুরুর জেলে বন্দী পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা পলাশ ও শুক্লা অধিকারী

ছবির উৎস, Pintu Hawladar

ছবির ক্যাপশান, বেঙ্গালুরুর জেলে বন্দী পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা পলাশ ও শুক্লা অধিকারী - ফাইল ছবি

পূর্ব বর্ধমানের জৌ গ্রামের বাসিন্দা পলাশ অধিকারী তার স্ত্রী শুক্লা ও দেড় বছরের শিশু সন্তান আদ্রিককে নিয়ে কয়েক মাস আগে বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিলেন।

অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তার

তার পরিবার জানাচ্ছে যে সেখানে তিনি কাগজ ও নানা বাতিল সামগ্রী কুড়ানোর কাজ করছিলেন।

জুলাই মাসের শেষ দিকে হঠাৎই তার পরিবার খবর পায় যে অধিকারী পরিবারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

কারণ জানতে গিয়ে তারা আশ্চর্য হয়ে শোনেন যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে তাদের ধরা হয়েছে।

বেঙ্গালুরুতে এরকম আবর্জনা কুড়োনোর কাজ করতেন পলাশ অধিকারী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বেঙ্গালুরুতে এরকম আবর্জনা কুড়োনোর কাজ করতেন পলাশ অধিকারী - প্রতীকী ছবি

"কেস দিয়েছে অনুপ্রবেশের," মি. অধিকারীর এক আত্মীয় পিন্টু হাওলাদার বিবিসি বাংলাকে জানাচ্ছিলেন।

খবর পাওয়ার পরে তারা পূর্ব বর্ধমানের স্থানীয় জামালপুর থানায় যোগাযোগ করেন। সেখানকার এক অফিসার বেঙ্গালুরুর থানায় ফোনও করেন।

ভারতীয় নাগরিকের প্রমাণ দেখিয়েও জেলে

"আধার কার্ডের মতো কয়েকটি (নথি) ওদের সঙ্গেই ছিল, বাকি নথিপত্র আমরা স্থানীয় থানার মাধ্যমে বেঙ্গালুরুর থানায় পাঠাই। তখনও পর্যন্ত আমার আত্মীয়দের থানাতেই রাখা হয়েছিল। কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরেই বেঙ্গালুরুর পুলিশ আমাদের জানায় যে পলাশরা নাকি স্বীকার করে নিয়েছে যে তারা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী। তাই এদেরকে ছাড়া যাবে না," বলছিলেন মি. পিন্টু হাওলাদার।

বেঙ্গালুরুর পুলিশ বলছে ২৭শে জুলাই এক অভিযান চালিয়ে মোট সাত জনকে তারা আটক করেছিল।

বেঙ্গালুরুর পুলিশ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ধৃতরা নিজেরা স্বীকার করেছে তারা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলছে বেঙ্গালুরুর পুলিশ

অনুপ্রবেশের স্বীকারোক্তি?

পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন যে ওই সাতজনই স্বীকার করেছে যে তারা বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এসেছিল। কিছুদিন পশ্চিমবঙ্গে কাটানোর পরে তারা বেঙ্গালুরুতে আসে কাজের খোঁজে। এই কথা তারা আদালতের কাছে জমা দেওয়া চার্জশিটেও জানিয়েছে বলে মন্তব্য করেন পুলিশের ওই কর্মকর্তা।

তিনি যে এরকম কোনও স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, সেটা অনেক পরে জানতে পারেন পলাশ অধিকারী।

তার সঙ্গে জেলে যখন দেখা করতে যান তারই আরেক আত্মীয় সুজন হালদার, তাকে পলাশ অধিকারী বলেন যে স্থানীয় কন্নড় ভাষায় কী লেখা হয়েছিল এফ আই আরে, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি। কড়া পুলিশ পাহারার মধ্যে তাকে সই করে দিতে বলা হয়।

পলাশ অধিকারীর আধার কার্ড

ছবির উৎস, Pintu Hawladar

ছবির ক্যাপশান, পলাশ অধিকারীর আধার কার্ড

মি. সুজন হালদার বিবিসিকে জানিয়েছেন, "আমাকে পলাশ যেটা বলেছে যে পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে হাতে লাঠি নিয়ে জোর করে অনুপ্রবেশকারী বলে তাকে দিয়ে স্বীকার করিয়েছে। এফআইআরটা লেখা ছিল কন্নড় ভাষায়। সেখানে কী লেখা আছে, কী করে বুঝবে ওরা! আর এতগুলো ডকুমেন্ট যে পাঠানো হল, তারপরে তো পুলিশের তদন্ত করে দেখা উচিত ছিল!"

'আর কত প্রমাণ দিতে হবে ভারতীয়ত্বের?'

মি. সুজন হালদার আরও প্রশ্ন তুলেছেন যে ''আধার কার্ড, আয়কর দপ্তরের দেওয়া প্যান কার্ড, নির্বাচন কমিশনের সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র, জন্ম সার্টিফিকেট, স্কুল পাশ করার সার্টিফিকেট - এত কিছুর পরে আর কোন্ নথি দেখালে প্রমাণ করা যাবে যে পলাশ অধিকারী আর তার স্ত্রী সত্যিই ভারতীয়?''

এই পরিবারের বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠন বাংলা পক্ষ।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক গর্গ চ্যাটার্জীর কথায়, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বাংলা ভাষায় কথা বললেই বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়ার একটা রাজনৈতিক প্রয়াস শুরু হয়েছে।

তার কথায়, "বেঙ্গালুরুতে একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি শ্রমিকদের বস্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একইরকম ঘটনা হয়েছে মুম্বাইতে। আমরা নয়ডাতেও একই জিনিস দেখেছি। এবং এ ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের বুকেও অহরহ দেখা যাচ্ছে - কোনও বচসার সময়ে এখানে যারা অবাঙালি, তাদের কেউ কেউ আমাদের বাংলায় কথা বলতে দেখলেই বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।"

"ভারতীয় বাঙালির নিরাপত্তা ভারতেই আজ হুমকির মুখে। এটা একটা সামাজিক-রাজনৈতিক আক্রমণে পরিণত হয়েছে। এনআরসি, সিএএ ইত্যাদি আসলে বাঙালি ধরার কল। যদিও সেগুলো এখনও সরকারিভাবে প্রয়োগ করা শুরু হয়নি, তবে তার আগেই সরকারি স্তরে, পুলিশ প্রশাসনে আর জনমনে তা প্রয়োগ করা শুরু হয়ে গেছে," বলছিলেন গর্গ চ্যাটার্জী।

অধিকারী দম্পতির মুক্তি চেয়ে সভা বাংলা পক্ষের

ছবির উৎস, Garga Chatterjee

ছবির ক্যাপশান, অধিকারী দম্পতির মুক্তি চেয়ে সভা বাংলা পক্ষের

তিনি মনে করেন এটা বাঙালিদের 'এথনিক টার্গেটিং' করা হচ্ছে, যেটা 'এথনিক ক্নেনসিং'এর আগের ধাপ।

মামলার খরচ তুলতে গয়না, জমি বন্ধক

অন্যদিকে পলাশ অধিকারীর পরিবার দিন গুনছে কতদিনে তারা প্রিয়জনের অন্তত জামিনটুকু করাতে পারেন।

উকিল ঠিক করা, জেলে গিয়ে মি. অধিকারীদের সঙ্গে দেখা করা - এসবের জন্য পূর্ব বর্ধমান থেকে মি. অধিকারীর বাবা, মা এবং সুজন হালদার বেঙ্গালুরুতে গিয়ে পৌঁছেছেন।

আর অধিকারী পরিবার তাদের ভারতীয় হিসাবে প্রমাণ করার জন্য যে অর্থ খরচ করছে, তা যোগাড় হয়েছে কিছু সোনাদানা আর জমির দলির বন্ধক রেখে।

বিবিসি বাংলায় আরও খবর: