আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইলিশ: অনুকূল পরিবেশ ও সিত্রাং-এর প্রভাবে নিষেধাজ্ঞা শেষে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ তোলার আশা
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে আবারো মাছ ধরা শুরু হতে যাচ্ছে। এরিমধ্যে মাছ ধরার সব ধরণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন জেলেরা।
গত ৬ই অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ৩৮টি জেলায় আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে এবং সমুদ্রে মাছ ধরার এই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল।
ভোলার লালমোহন উপজেলার জেলে মোহাম্মদ মিজান গত কয়েকদিন ধরেই তার ট্রলার মেরামত করেছেন, জাল ঠিক করেছেন।
সব ঠিক থাকলে শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে নিষেধাজ্ঞা ওঠার পরপরই জাল ফেলার পরিকল্পনা আছে তার।
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে এবারে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ উঠবে বলে আশা করছেন মি. মিজান।
তিনি বলেন, "লম্বা দিন তো বন্ধ ছিল, আবার ঝড় গেসে, পানি বেড়ে গেসে। মাছ বেশি উঠবে। সকালে আড়তে তুলবো। দেখা যাক।"
আরও পড়তে পারেন:
মাছ ধরা শুরু হওয়াকে কেন্দ্র করে এরিমধ্যে কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছে জেলেপাড়া, ইলিশের ঘাট, আড়ত ও বরফকলগুলো।
এই নিষেধাজ্ঞার সময়ে উপকূলের অন্তত দুই লক্ষাধিক নিবন্ধিত জেলেকে পুনর্বাসন বাবদ প্রত্যেককে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। আবার অনেককে বিকল্প কাজে নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানায় মৎস্য অধিদফতর।
ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও মা ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত ৬ই অক্টোবর রাত ১২টার পর থেকে ২৮ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত টানা ২২দিন এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়।
ইলিশের ছয়টি অভয়ারণ্য, সমুদ্রসহ মোট ৩৮টি জেলার ১৭৪টি উপজেলায় মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। এরমধ্যে ২০টি জেলায় সব ধরণের মাছ ধরার ক্ষেত্রে এবং বাকি ১৮টি জেলায় শুধুমাত্র ইলিশ মাছ ধরার ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
সেইসাথে সারাদেশে শুধুমাত্র ইলিশ মাছ ধরা, বিক্রি, মজুদ, বাজারজাত ও পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা ছিল।
মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের অংশ হিসেবে এবারে ১ হাজার ৮৯২টি ভ্রাম্যমান আদালত ও ১৫ হাজার ৩৮৮টি অভিযান চালানো হয়েছে। ৮৮৪ লাখ মিটার অবৈধ জাল আটক করা হয়েছে। এছাড়া জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ইলিশ ধরা বন্ধে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালানো হয়েছে বলে জানান অধিদফতরের কর্মকর্তারা।
এবারে প্রায় ছয় লাখ মেট্রিকটন ইলিশ ধরার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অভিযান সফল হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ইলিশ আহরণের আশা করছেন মৎস্য অধিদফতরের প্রকল্প পরিচালক জিয়া হায়দার চৌধুরী।
ইলিশ প্রজননের অনুকূল পরিবেশ ও সিত্রাং এর প্রভাব
ইলিশ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তার ওপর ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এর প্রভাবে ইলিশ মাছের প্রজননে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ফলে এই মৌসুমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বিএফআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, সাধারণত আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি থেকে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত অর্থাৎ সেপ্টেম্বর ও পুরো অক্টোবর মাস জুড়েই ইলিশের প্রজনন মৌসুম চলে।
সেইসাথে আমাবস্যা ও পূর্ণিমাও ইলিশ প্রজননের অনুকূল সময়। এ কারণে চাঁদের এই অবস্থার ওপর ভিত্তি করে নিষেধাজ্ঞার তারিখগুলো নির্ধারিত হয়ে থাকে।
এবারে ১০ই অক্টোবর পূর্ণিমা ও ২৫শে অক্টোবর আমাবস্যা হয়েছে। ফলে মা ইলিশ ডিম ছাড়ার মোক্ষম সময় পেয়েছে।
মি. রহমান বলেন, ইলিশের প্রজননে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় নিলেও এই নিষেধাজ্ঞা ২২ দিন রাখা হয় যেন ইলিশ প্রজননের জন্য সাগর থেকে মোহনা বেয়ে তার অনুকূল পরিবেশ পর্যন্ত বিনা বাধায় আসতে পারে।
এ সময় ইলিশ ৭২-৭৮ কিলোমিটার বা তার বেশি পথ, স্রোতের বিপরীতে চলার সক্ষমতা রাখে। সেই হিসেবে লোনা পানি থেকে মোহনা বেয়ে মিঠাপানিতে আসতে তাদের দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে।
এজন্য আমাবস্যা ও পূর্ণিমার সামনে পেছনে দুই/তিনদিন সময় রেখে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করা হয়।
ইলিশ মাছ ধরার সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশ হল গভীর স্রোতস্বিনী মিঠা পানি, তাপমাত্রা, সেইসাথে পানিতে কিছু গুণাগুণ থাকতে হয়।
প্রথমত পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের হার যেন কোন অবস্থায় ৪-এর নীচে না নামে। বাংলাদেশের নদী ও মোহনায় অক্সিজেনের এই মাত্রা মোটামুটি ভারসাম্যে থাকায় এখনও ইলিশ আসতে পারছে বলে জানান মি. রহমান।
তবে নদী দূষণ ও নাব্যতা সংকটের ফলে অক্সিজেনের মাত্রা দিন দিন কমে যাচ্ছে। যা ইলিশ প্রজননে পরবর্তীতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে এবং ইলিশ বাংলাদেশের বাইরে বিকল্প নদী খুঁজে নিতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এছাড়া ডিম পাড়ার জন্য ২৭ থেকে ৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা ইলিশের জন্য বেশ অনুকূল।
বাংলাদেশের জলসীমায় এই তাপমাত্রা বজায় থাকা ইলিশ উৎপাদনের অন্যতম বড় কারণ।
এছাড়া পানির পিএইচ এর মাত্রা ৮ বা তার উপরে থাকারও প্রয়োজন পড়ে। পিএইচ পানিতে থাকা অম্ল ও এলকালাইনের ভারসাম্যের পরিমাপক। পিএইচ এর ভারসাম্যের ওপর জলজ প্রাণীর স্বাস্থ্য নির্ভর করে।
সাধারণত ৬.৫ থেকে ৮.৫ পিএইচ-এর পানিকে নিউট্রাল বা ভারসাম্যপূর্ণ পিএইচ লেভেলের পানি বলা হয়।
তাছাড়া ইলিশের প্রজননে ঘূর্ণিঝড়ের একটি ইতিবাচক প্রভাব আছে বলে জানান মি. রহমান।
কারণ এই সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত, জলোচ্ছ্বাস, নদীতে প্রচুর স্রোত এবং পানির উচ্চতা বেড়ে যায় ফলে পানিতে থাকা দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণও বাড়ে, সেইসাথে পানির অন্যান্য উপাদানগুলো ভারসাম্যে থাকে।
ফলে ইলিশ মাছ ডিম পাড়ার অনুকূল পরিবেশ পায়। মা ইলিশ বেশি বেশি ডিম পাড়ে। এজন্য উৎপাদনও বেড়ে যায়।
গত ২৫শে অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং যে সময় আঘাত হানে ওই রাতেই ছিল অমাবস্যা। এ কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলায় টানা-বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়ার, স্রোত ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে পানির গুণগত মান উন্নত হয়।
এতে ইলিশের ডিম পাড়ার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যার কারণে ইলিশ প্রচুর ডিম ছেড়েছে বলে আশা করছেন মি. রহমান।
তারমধ্যে ওই সময়ে নদী ও মোহনায় কোনও জেলে ও নৌকা না থাকায় নির্ঝঞ্ঝাটে ডিম পেরেছে মা ইলিশগুলো।
অনুকূল পরিবেশ থাকায় এবার ইলিশ ছাড়াও অন্যান্য মাছও প্রজনন ও ডিম পাড়ার সুযোগ পেয়েছে বলে জানান মি. রহমান।
তবে একটি মা ইলিশের প্রজনন, ডিম পাড়া, বাচ্চা ফোটানো এবং সেই মাছটির পরিণত হওয়া-এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাত থেকে আট মাস সময় লাগে।
তাই এই সময়ে বাচ্চা ইলিশ রক্ষা করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সাধারণত ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বেরোলে ইলিশ ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লার্ভা অবস্থায় থাকে। এরপর এরা বড় হতে থাকে। পানিতে বিচরণ করে বিভিন্ন খাবার ও প্ল্যাঙ্কটন খেতে শুরু করে।
অনেক সময় জেলেদের ফেলা মিহি জাল বা কাঁথা জালে ছোট বড় অনেক মাছের সাথে ধরা পড়ে যায় এই ছোট ইলিশ মাছগুলো। তাই এসব জালের ব্যবহার আটকাতেও নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে মৎস অধিদফতরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জালের নেটগুলো কতো বড় হবে সেটা ঠিক করে দেয়া হয়েছে। যেন বাচ্চা ইলিশের মতো অপরিণত মাছের পোনাগুলো ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারে।