ডলফিন: সঙ্কটাপন্ন মিঠা পানির প্রাণীটিকে রক্ষায় নেয়া ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে?

ছবির উৎস, মোস্তফা ফিরোজ
- Author, ফারহানা পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
সারা বিশ্বে মিঠা পানির ডলফিন যেটা বাংলাদেশে শুশুক নামেও পরিচিত তার সংখ্যা প্রায় তিন হাজার।
এর মধ্যে বাংলাদেশের সুন্দরবনেই আছে প্রায় ২২৫টি শুশুক।
পদ্মা-যমুনায় আছে প্রায় ২০০টি। কর্ণফুলী, সাঙ্গু, রূপসা, সুরমা, হালদাসহ অন্যান্য নদীতে ৫০০-এর মতো ডলফিন আছে।
দেশের নদীগুলোতে সব মিলিয়ে শুশুকের সংখ্যা হাজারখানেক, যা গোটা পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
কিন্তু জেলেদের অসচেতনতাসহ নানা কারণে এইসব ডলফিনের সংখ্যা দিনকে দিন কমছে। নানামুখী উদ্যোগ নেয়া সত্বেও ডলফিন নিধন খুব একটা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি এখনো।
স্বাদু পানির ডলফিন সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে ২০০৯ সালের ২৪ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ায় বিশ্বব্যাপী স্বাদু পানির ডলফিন দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এরপর থেকে বাংলাদেশে প্রতিবছর দিনটি পালিত হয়ে আসছে।
আরো পড়ুন:
মিঠা পানির ডলফিনের বৈশিষ্ট্য:
মিঠা পানির ডলফিন সাধারণত নদীতে থাকে।
লবণাক্ততা সহ্য ক্ষমতা না থাকায় তারা সমুদ্রে থাকে না।
এই ডলফিন লম্বায় ৭ থেকে ৮ ফুট লম্বা হয়। স্তন্যপায়ী এই প্রাণী ৩ থেকে ৪ বছর পর বাচ্চা প্রসব করে।
এরা বাচ্চা প্রসব করতে নয় মাস সময় নেয়।
ডলফিন শ্বাস নেয়ার জন্য ৩ থেকে ৪ মিনিট পরপর পানির উপরে মুখ উপরে তুলে শ্বাস নেয় এবং শ্বাস ছাড়ে।
বিজ্ঞানীরা বলেন এই ডলফিনের ব্রেনের একটা অংশ শ্বাস নেয়া এবং অন্যান্য কাজ করে আরেকটা অংশ ঘুমের সময় হলে ঘুমায়।
এরা সাধারণত গভীর পানিতে থাকে। তবে কিছু কিছু সময় ২০ থেকে ৩০ ফুট গভীর পানিতে চলে আসে।

ছবির উৎস, Getty Images
কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে?
বাংলাদেশ বন অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশের সর্ববৃহৎ ডলফিনের আবাসস্থল সুন্দরবন এলাকায় অনেক হটস্পট চিহ্নিত করে সেগুলোর মধ্য থেকে পানখালি, শিবসা ও দুধমুখীতে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
শুধু সুন্দরবনেই এখন ডলফিনের জন্য ছয়টি অভয়ারণ্য রয়েছে।
সেখানকার জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে সাতটি ডলফিন সংরক্ষণ দল গঠন করা হয়েছে। বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং ডলফিন সংরক্ষণ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা রেজাউল করিম বলেন, "এই সাতটা দলকে ২১ লক্ষ টাকা দেয়া হয়েছে। তারা যাতে সুরক্ষার কাজটি করে"।
দলটির জন্য 'ফান্ড ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন' প্রণয়ন করেছে মন্ত্রণালয়। এছাড়া পাবনায় তিনটি রক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে।
সম্প্রতি নদী ও উপকূলীয় এলাকায় ডলফিনের সংখ্যা হ্রাস প্রতিরোধে এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষায় 'ডলফিন কনজারভেশন অ্যাকশন প্ল্যান' প্রণয়ন চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রণালয়।

ছবির উৎস, Getty Images
মি. করিম বলেন "এটা ১০ বছরের একটা মেগা প্ল্যান। প্ল্যানটি অনুমোদন হয়েছে এখন বাজেট দরকার"।
হালদা নদীর ডলফিন সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডলফিন ও এর আবাসস্থল সংরক্ষণ ছাড়াও ডলফিন সংরক্ষণকারী কর্তৃপক্ষের সহায়ক হিসেবে 'ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান ফর দ্য গ্যাঙ্গেজ রিভার ডলফিন ইন হালদা রিভার' প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রাণিবিদ্যা বলছেন শুশুক বা গাঙ্গেয় ডলফিন নামে পরিচিত দেশের মিঠা পানির ডলফিন নদীর যে অংশে বেশি সেখানে মাছও বেশি পাওয়া যায়।
কেন কার্যকর হল না?
বর্তমানে নানা কারণে ডলফিন হুমকির মুখে।
উপকূলের পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীব-বৈচিত্র্য সুরক্ষা ও সমুদ্রের নীল অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডফিশের ইকো ফিশ বাংলাদেশ-২ অ্যাকটিভিটির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে কেবল কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতেই ১৭টি মৃত ডলফিন পাওয়া গেছে।
দুই হাজার বাইশ সালে ১৮টি এবং ২০২১ সালে ২৪টি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছিল এ সৈকতে।
এ ছাড়া কক্সবাজার সৈকতে গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১৬টি ডলফিনের মৃতদেহ ভেসে আসে।
মি. করিম বলেন " ডলফিনের চোখ কাজ করে না। তারা শব্দের উপর নির্ভর করে চলে। আর এই সুযোগটা নেয় অসাধু জেলেরা। তারা কারেন্ট জাল ব্যবহার করে, যেটা ডলফিনের পক্ষে বুঝতে পারার কথা না"।
তবে এই ঘটনা সুন্দরবনে কমে এসেছে এবং হালদাতে কাজ করছেন যাতে ডলফিন রক্ষা করা যায়।
কি করা উচিৎ?
প্রাণিবিদরা বলছেন ডলফিনের আবাসস্থল যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং ডলফিনের অভয়ারণ্য এলাকায় মাছের প্রজনন বিঘ্নিত না হয় তা বিবেচনায় নিয়ে আধুনিক ও কার্যকর টহল পরিচালনার জন্য বন বিভাগের স্টাফদের সামর্থ্য ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক যিনি ডলফিন নিয়ে গবেষণা করেছেন মোস্তফা ফিরোজ বলেন দুটি কারণে মিঠা পানির ডলফিন সংকটাপন্ন।
তিনি বলেন, "একটা জেলেদের কারেন্ট জাল আরেকটা দূষিত পানি। এই দুই কারণে বাংলাদেশে নদীতে ডলফিনের আবাস ব্যহত হচ্ছে। এই দুইটা দিক ঠিক করার জন্য যথাযথা ব্যবস্থা নিতে হবে"।









