টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০২২: সাকিব আল হাসান বিশ্বের একমাত্র ক্রিকেটার যিনি একইসাথে দেশের সেরা বোলার ও সেরা ব্যাটসম্যান

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, রায়হান মাসুদ
- Role, বিবিসি বাংলা
সাকিব একইসাথে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী এবং আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ২ হাজার রানের মালিক।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আরও চার দু-চারজন বোলারের ১০০ উইকেট আছে, আরও ১২ থেকে ১৩জন ব্যাটসম্যানের ২ হাজার বা তারও বেশি রান আছে।
কিন্তু আর কারোই ২০০০ রান ও একশ উইকেট একসাথে নেই।
সাকিব এই একটা জায়গায় অনন্য এক ক্রিকেটার।
সাকিব আল হাসান শুধু সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিই নন, তার ইকোনমি রেটও বেশ ভালো, প্রতি ওভারে সাতের কম রান দেন সাকিব।
তিনি একইসাথে বাংলাদেশ দলটার সেরা বোলার এবং বর্তমান দলের সেরা ব্যাটসম্যানও তিনিই।
কেন তিনি এই তালিকায় একমাত্র
অস্ট্রেলিয়ায় যেমন অলরাউন্ডার হিসেবে খেলছেন মিচেল মার্শ, কিন্তু তিনি দলের সেরা ব্যাটার বা বোলার নন। অস্ট্রেলিয়ায় ভালো একটা টপ অর্ডার আছে।
আবার শক্তিশালী তিনজন ফাস্ট বোলার এবং একজন স্পেশালিস্ট লেগস্পিনার আছেন- হেইজেলউড, স্টার্ক, কামিন্স ও জাম্পা।
ভারতের দলে আছেন অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়া, আকশার প্যাটেল- একই সাথে তাদের দলে আছেন রোহিত শর্মা, ভিরাট কোহলি, ভুবনেশ্বর কুমার, রাভিচান্দ্রান আশ্বিনরা।
ইংল্যান্ডে আছেন মঈন আলী ও বেন স্টোকস, এই দলেও অলরাউন্ডারদের চেয়ে ভালো ব্যাটসম্যান ও বোলার আছেন।
এসব দলে অলরাউন্ডাররা মূলত 'ইমপ্যাক্ট ক্রিকেটার' হিসেবে খেলেন। যারা শেষে নেমে দ্রুত রান তোলেন এবং বল হাতে পঞ্চম বা ষষ্ঠ বোলারের ভূমিকা পালন করেন।
কিন্তু বাংলাদেশে সাকিবের ব্যাপারটা আলাদা।

ছবির উৎস, Getty Images
যে কারণে সম্প্রতি ত্রিদেশীয় সিরিজে সাকিব আল হাসান পারফর্ম করার পরেও সাকিবকে পুরোপুরি সফল বলা যায় না।
তিন ম্যাচে সাকিব ১৫০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করে ১৫৪ রান তুলেছেন, দুটি অর্ধশতকসহ।
কিন্তু বল হাতে তিন ম্যাচে ১০ ওভারে ৯১ রান দিয়েছেন, কোনও উইকেট পাননি।
সাকিব যখন বাংলাদেশের হয়ে খেলেন, তখন তাকে ব্যাটে বলে দুই দিকেই পারফর্ম করতে হয়।
সাকিব নিজেও স্বীকার করছেন বিষয়টি, ত্রিদেশীয় সিরিজ শেষে বলেছেন, "আমার কাজ ব্যাট হাতে রান করা ও বল হাতে উইকেট নেয়া। আমি বল হাতে ভালো করতে পারিনি। এটা নিয়ে কাজ করতে হবে।"
এখন সাথে যোগ হয়েছে অধিনায়কত্ব।
সাকিব আল হাসান ও ভারতের অধিনায়ক রোহিত শর্মাই এখন পর্যন্ত সবগুলো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মাঠে নামছেন।
সাকিব আল হাসান ও তার দল বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত ব্যর্থই বলা যায়- মূলপর্বে ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি ম্যাচে জয় ছাড়া বাংলাদেশ গত ১৫ বছরের ছয়টি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূলপর্বে কোনও ম্যাচে জয় পায়নি।
তবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেরা উইকেট শিকারি এখন সাকিব আল হাসান।
ব্যাটসম্যানদের তালিকাতেও তিনি সেরা রান সংগ্রাহকদের তালিকায় আছেন- তিনটি অর্ধশতক হাঁকিয়েছেন সাকিব দুটি পাকিস্তানের বিপক্ষে এবং একটি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।
আর সাকিবই দলের একমাত্র ক্রিকেটার যিনি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পেশাদার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলেছেন, বিগ ব্যাশের দুই মৌসুমে সাকিব মেলবোর্ন রেনেগেডস ও অ্যাডেলেইড স্ট্রাইকার্সের হয়ে খেলেছেন।
ম্যাচসেরার পুরস্কার সহ, স্পিনার হিসেবে সেরা বোলিং ফিগারের তৎকালীন রেকর্ডও ছিল সাকিবের দখলে।

ছবির উৎস, Getty Images
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে সাকিব আল হাসান নয় মৌসুম খেলেছেন।
দুইবার আইপিএল শিরোপা জিতেছে সাকিবের দল। ২০১২ ও ২০১৪ সালে ব্যাট ও বল হাতে কলকাতা নাইট রাইডার্সের শিরোপা জয়ে অবদান রেখেছিলেন তিনি।
বিশেষত ২০১৪ সালে ১৩ ম্যাচে ১৪৯ স্ট্রাইক রেটে ২২৭ রান তুলেছিলেন সাকিব, বল হাতে ১১ উইকেট নিয়েছিলেন।
মাঠের বাইরের সাকিবের বিপক্ষে অনেক অভিযোগ
সাকিব আল হাসান অনুশীলনে আসেন না, বেশ কটি সিরিজে দলের সাথে যোগ দিয়েছেন দেরিতে, আনুষ্ঠানিক ফটোসেশনে থাকেননি তিনি- এমন ঘটনাও ঘটেছে তিনবার।
বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্লেষক সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি মনে করেন, সাকিব যেভাবে দলের সাথে যোগ দিচ্ছেন, এটাকে একটা রীতিতে পরিণত করছেন, 'এটা ভালো দেখায় না'।
দুই হাজার উনিশ সালে সাকিব আল হাসান জুয়াড়িদের সাথে কথপোকথনের ব্যাপারটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের দুর্নীতি বিরোধী ইউনিটকে না জানানোর কারণে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন।
ঠিক নিষেধাজ্ঞার আগেই ওয়ানডে বিশ্বকাপে ৬০০ এর বেশি রান ও ১১ উইকেট নিয়েছিলেন।
সাকিব আল হাসানের এই পারফরম্যান্স তাকে ল্যান্স ক্লুজনার, যুবরাজ সিংদের মতো অলরাউন্ডারদের কাতারে নিয়ে গিয়েছিল তখন, এমনটা বিশ্লেষণ করেছেন ক্রিকেট ম্যাগাজিন দ্য ক্রিকেট মান্থলির পরিসংখ্যানবিদ আনান্থা নারায়ানান।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরার পর আর সেই সাকিবকে পাওয়া যায়নি।
আর কোনও সেঞ্চুরি করেননি তিনি কোনও ফরম্যাটেই।
তবে সাকিব নিজের রূপে ধীরে ধীরে ফিরে আসছেন। গত মাসে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে তিনি দুই ম্যাচে ব্যাট ও বল হাতে পারফর্ম করে ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কার পেয়েছেন।
বাংলাদেশ দলে ফিরে ব্যাট হাতে দুটি ফিফটি করেছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
এবার প্রত্যাশার চাপটাও বেশি
বাংলাদেশের ক্রিকেটের 'পঞ্চপান্ডব' বলে পরিচিত যে পাঁচ ক্রিকেটার যার মধ্যে, মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ২০১৭ সালে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ছেড়েছেন।
তামিম ইকবাল চলতি বছর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন।
এশিয়া কাপে ব্যর্থতার পর মুশফিকুর রহিম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকেও বিশ্বকাপের দলে ডাকা হয়নি।
স্বভাবতই সাকিব আল হাসানের দিকে পূর্ণদৃষ্টি থাকবে সবার।
সাকিব টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি তিন ফরম্যাটেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকারী বোলার।
তিন ফরম্যাটেই রান সংগ্রাহকদের তালিকায় তিনি সেরা তিনে আছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা দলীয় পারফরম্যান্সে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
যেমনটা দেখা গেছে ২০১৯ বিশ্বকাপে, সাকিবের ওমন একটা পারফরম্যান্সের পরেও বাংলাদেশ ১০ দলের তালিকায় ৮ নম্বরে থেকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছিল।
এবারে বাংলাদেশের সমর্থকদের অনেকেই চাইবেন যাতে সাকিবের ব্যক্তিগত দক্ষতায় ম্যাচের ফলাফল বাংলাদেশের পক্ষে আসে।








