টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২২: পাকিস্তান দলে নতুন এক ম্যাচ উইনারের উত্থান কিন্তু ব্যাটিং নিয়ে এখনও সংকট বিদ্যমান

ছবির উৎস, Getty Images
ঠিক টুর্নামেন্টের আগে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজে শিরোপা জিতে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু করতে যাচ্ছে পাকিস্তান।
বাবর আজমের নেতৃত্বে পাকিস্তান ক্রিকেট দল গত বছরও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছে, চলতি বছর এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলেছে।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ম্যাচ হেরে পাকিস্তান শিরোপা জিততে পারেনি, বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, পাকিস্তান বড় ম্যাচে 'বেশি সতর্ক' হয়ে যায়।
পাকিস্তানের ক্রিকেট নিয়ে যা পড়তে পারেন-
পাকিস্তানের এখন শক্তির জায়গায় ওপেনিং জুটি, কিন্তু.....
দুই হাজার একুশ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল এবং ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এশিয়া কাপ ফাইনাল, দুটো ম্যাচেই টপ অর্ডারের দুই ব্যাটসম্যান বাবর আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ানের ব্যাটিং অ্যাপ্রোচ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
সময়ের সেরা দুই টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যান নিজেদের ব্যাট চালানোর ধরনে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন, একই সাথে দল হিসেবেও পাকিস্তানের সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।
সম্প্রতি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি টি-টোয়েন্টি সিরিজে কোনও উইকেট না হারিয়েই ২০০ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ম্যাচ জেতায় বাবর-রিজওয়ান জুটি।
গত বছর রিজওয়ানের স্ট্রাইক রেট ছিল ১৩৪, বাবর আজমের ১২৭।
চলতি বছর রিজওয়ানের স্ট্রাইক রেট কমেছে, বাবর আজমের বেড়ে ১৩০ পার হয়েছে।
তবে বাবর-রিজওয়ানের ওপর এই নির্ভরতা কমছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ম্যাচ উইনার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করছেন মোহাম্মদ নাওয়াজ
সম্প্রতি ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজে পাকিস্তানের শেষ দুই ম্যাচেই নাওয়াজ ব্যাট হাতে ম্যাচ জিতিয়েছেন।
নাওয়াজ ধীরে ধীরে নিজেকে ইমপ্যাক্ট ক্রিকেটার হিসেবে প্রমাণ করছেন।
ভারতের বিপক্ষে চলতি বছর এশিয়া কাপের সুপার ফোরের ম্যাচটিতে ১৮১ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তানের রান ছিল ৯ ওভারে ৬০ এর মতো, সেখানে নাওয়াজকে চার নম্বরে ব্যাট করতে পাঠায় পাকিস্তান।
নাওয়াজ ২০ বলে ৪২ রানের একটি ইনিংস খেলে ম্যাচে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেন।
গত এক বছরে নাওয়াজের স্ট্রাইক রেট- ১৪৯।
বল হাতেও নাওয়াজ বেশ কার্যকরী, ২৪ ম্যাচে ২৪ উইকেট নিয়েছেন তিনি গত এক বছরে, ইকোনমি রেট আটের একটু কম।

ছবির উৎস, Getty Images
শাদাব খান- ব্যাটে বলে পাকিস্তানের ভরসার জায়গা
গত এক বছরে পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে শাদাব খানের চেয়ে বেশি স্ট্রাইক রেট কারও নেই। ১৬১ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করেছেন তিনি।
তবে শাদাব খানের ব্যাটিংটার সুফল পাকিস্তান আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তেমন উপভোগ করতে পারেনি কখনো।
সাতাত্তর ম্যাচ খেলে মাত্র ৩২ ম্যাচে তিনি ব্যাট হাতে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছেন।
তবে যখনই সুযোগ পেয়েছেন ব্যাট হাতে ভূমিকা রেখেছেন এই লেগ স্পিনার।
ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২২ বলে ৩৮ রান তুলেছেন তিনি, যা ম্যাচে প্রভাব ফেলেছে।
বল হাতে শাদাব ভালো ভূমিকা রেখেছেন, গত এক বছরে ২১ ম্যাচে ২৭ উইকেট নিয়েছেন তিনি। ওভারপ্রতি সাতের নিচে রান দিয়েছেন তিনি।
এমনকি দুই ম্যাচে চার উইকেটও নিয়েছেন শাদাব খান।
পাকিস্তানের সবসময়ের শক্তির জায়গা- ফাস্ট বোলিং
পাকিস্তানের ক্রিকেট আর ফাস্ট বোলিং, যেন ক্রিকেটের সবচেয়ে মধুর সমন্বয়ের একটি।
এবারে পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সেরা তিন ফাস্ট বোলার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মাঠে নামবে- শাহীন শাহ আফ্রিদি, হারিস রওফ, নাসিম শাহ।
আরও তিনজন আছেন বিকল্প- শাহনাওয়াজ দাহানি, হাসনাইন ও মোহাম্মদ ওয়াসিম।
নাসিম শাহ চলতি বছর এশিয়া কাপে ভিরাট কোহলি, রোহিত শর্মার মতো ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে নেমে ভালো বল করেছেন, সেটি ছিল তার প্রথম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ।
চোটের কারণে প্রায় চার মাস মাঠের বাইরে কাটিয়ে ফিরেছেন শাহীন শাহ আফ্রিদি। নতুন বলে তিনি এখন ক্রিকেটের সেরা বোলারদের একজন।
ডেথ ওভারে হারিস রউফ নিজেকে প্রমাণ করেছেন। হারিস রউফ গতির কারণে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাড়তি সুবিধা পাবেন।
রউফের উত্থান এই অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগ বিগ ব্যাশেই, পাকিস্তানের বেশ কজন ক্রিকেটারের বিগ ব্যাশে খেলার অভিজ্ঞতা আছে তাই এই দেশের উইকেট ও কন্ডিশনে সেই অভিজ্ঞতা কাজে আসবে।
নতুন বলে শাহীন শাহ ক্রিকেটের সেরা ফাস্ট বোলারদের একজন।
ক্রিকেটারদের নিয়ে জানতে পারেন

ছবির উৎস, Pakistan Cricket Board
ব্যাটে ছক্কা নেই পাকিস্তানের টপ অর্ডারে
পাকিস্তান সেরা দুজন ব্যাটসম্যান ও ভালো টপ অর্ডার নিয়েও শিরোপা জিততে পারছে না, অতি সতকর্তার কারণে- অন্তত বিশ্লেষকরা তাই মনে করেন।
পাকিস্তানের ক্রিকেট পরিসংখ্যানবিদ মাজহার আরশাদ প্রশ্ন তুলেছেন, পাকিস্তান ম্যাচ জিতছে ঠিক কিন্তু টপ অর্ডার যেভাবে ব্যাট করছে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জন্য এটা যথেষ্ট কি না সেটা ভেবে দেখা দরকার।
মি. আরশাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ত্রিদেশীয় সিরিজে পাকিস্তান প্রথম চারটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ২৭৯ বলে কোনও ছক্কা মারেনি। এই সময় তাদের স্ট্রাইক রেট ছিল ১১৬। শুরুর দিকে আরও রান প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
কখনো কখনো এই টপ অর্ডার যদি ফ্লপ করে, তবে দুশ্চিন্তার জায়গাটা মিডল অর্ডারও, কারণ পাকিস্তানের মিডল অর্ডারে যেসব ব্যাটসম্যানের ওপর রানের গতি বাড়ানোর দায়িত্ব, তারা সময়মতো জ্বলে উঠতে পারছেন না
গত এক বছরে পাকিস্তানের মিডল অর্ডারের টি-টোয়েন্টি স্ট্রাইক রেট
- শান মাসুদ- ১২৫
- হায়দার আলি- ১২২
- ইফতখার আহমেদ- ১২২
- খুশদিল শাহ- ১১১
খুশদিল গত এক বছরে ১৫ ম্যাচে সুযোগ পেয়ে ২০ এর নিচে গড়ে ব্যাট করেছেন।
ছক্কা হাঁকানোর জন্য সুপরিচিত আসিফ আলি ১৩৭ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করলেও, তিনি খুব বেশি বল খেলতে পারছেন না।
গত এক বছরে আসিফ আলির ব্যাটিং গড় মাত্র ১০এর মতো।
এই জায়গায়টায় পাকিস্তান যখনই পরীক্ষিত হয়েছে দল ব্যর্থ হয়েছে, যেমনটা ২০২১ সালের টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে, এশিয়া কাপের ফাইনালে দেখা গেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
শোয়েব মালিককে দলে না নেয়ায় বিতর্ক
পাকিস্তানের মিডল অর্ডারের ধারাবাহিকতার সমস্যা অনেকটাই স্পষ্ট। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, শোয়েব মালিক এই জায়গাটায় একটা ভালো বিকল্প হতে পারতেন।
অনেকদিন ধরেই শোয়েব মালিক জাতীয় দলে খেলছেন না, শেষ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন ২০২১ সালে নভেম্বরে বাংলাদেশের বিপক্ষে মিরপুরে।
সম্প্রতি তিনি টুইটারে লিখেছেন, "ছেড়ে দেয়া কোনও অপশন নয়"।
চল্লিশ বছর বয়সী এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান এখনই ক্রিকেট ছাড়ছেন না।
শোয়েব মালিককে না নেয়া নিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকেও প্রশ্ন শুনতে হয়েছে।
সম্প্রতি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি টি-টোয়েন্টি সিরিজের পর পিসিবি প্রেসিডেন্ট রামিজ রাজা বলেছেন, "আমাদের বেঞ্চে লিওনেল মেসি নেই, যে আপনারা এতো বিতর্ক করছেন।"
পাকিস্তানের হয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতা ফাস্ট বোলার মোহাম্মদ আমির দল ঘোষণার পর একটি টুইটে লিখেছিলেন, "সস্তা নির্বাচকদের সস্তা দল।"
শোয়েব মালিক ছাড়াও ইমাদ ওয়াসিম ও আজম খানের কথা শোনা যাচ্ছে।
ইমাদ ও আজম ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে সম্প্রতি পারফর্ম করেছেন।
পাকিস্তানের এই দলটির মিডল অর্ডার সমস্যার সমাধান করতে এই ক্রিকেটারদের কথা বলছেন বিশ্লেষকরা।
কিন্তু আপাতত পাকিস্তানের স্কোয়াড চূড়ান্ত এবং সেখানে কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।








