টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: মোহাম্মদ রিজওয়ান পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার হয়ে উঠলেন যেভাবে

মিচেল স্টার্কের ১৪৪ কিলোমিটার গতির বল রিজওয়ানের হেলমেটের গ্রিলে আঘাত হানে ১৩তম ওভারে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মিচেল স্টার্কের ১৪৪ কিলোমিটার গতির বল রিজওয়ানের হেলমেটের গ্রিলে আঘাত হেনেছিল ১৩তম ওভারে
    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা

পাকিস্তানের উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রিজওয়ান আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এক ক্যালেন্ডার বছরে এক হাজারের বেশি রান করেছেন, যা এখন পর্যন্ত তিনি ছাড়া আর কেউ করতে পারেননি।

চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম সেমিফাইনাল খেলতে নামার আগেই রিজওয়ান বছরে এক হাজার রানের তালিকায় প্রথম টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের নাম লেখান।

ওই তালিকায় অবশ্য তিনি ছাড়া আর কেউ নেই।

আবার একজন উইকেটকিপার হিসেবে বৃহস্পতিবারের সেমিইনালের পর তিনি এখন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক আসরে সর্বোচ্চ রানের মালিক।

পাকিস্তান দলে তার আগমন একজন ব্যাকআপ উইকেটকিপার হিসেবে, তবে ধীরে ধীরে তিনি আজ এই দলের মূল ক্রিকেটারদের একজন হয়ে উঠেছেন।

গতরাতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হারের পর স্বাভাবিকভাবেই মনমরা হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন বাবর আজম। পাকিস্তানের অধিনায়ককে সঙ্গ দিয়েছেন দলের চিকিৎসক নাজিবুল্লাহ সুমরো।

বিশ্বকাপের মধ্যেই আইসিইউ দর্শন

মোহাম্মাদ রিজওয়ানের স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিয়ে ম্যাচের আগেই নানা ধরনের গুঞ্জন ছিল, তা নিয়েই কথা বলতে হয় চিকিৎসককে। জানালেন, "৯ই নভেম্বর রিজওয়ানের বুকে মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দেয়, যার দরুণ তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।"

নাজিবুল্লাহ সুমরো বলেন, "হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে দুই রাত ছিলেন রিজওয়ান। অবিশ্বাস্যভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি এবং ম্যাচের আগে ফিট বলে গণ্য হন।"

সেমিফাইনালে রিজওয়ান ৫২ বলে ৬৭ করেন।

ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ভিভিএস লাক্সমান পাকিস্তানী তারকার ইনিংসটিকে 'সাহস, প্রত্যয় ও অধ্যবসায়ের একটা দারুণ দৃষ্টান্ত' লিখে টুইট করেছেন।

"যদিও জয়ী দলের একজন নন রিজওয়ান, কিন্তু যে লড়াইটা তিনি করলেন, আইসিউ-তে দুই দিন থাকার পর, তা আসলেই অনুপ্রেরণাদায়ী।"

লাক্সমানের মতে, খেলাধুলা আসলেই দারুণ এক শেখার জায়গা। "কতো কী শেখার আছে সবার।"

ম্যাচের ১৪তম ওভারে জশ হ্যাজলউডের বল সপাটে লেগে তুলে যে ছক্কা মারলেন রিজওয়ান তাতে মনেই হয়নি দুই রাত হাসপাতালে কাটিয়ে তিনি নেমেছেন দুবাই স্পোর্টস সিটিতে।

ম্যাথু হেইডেন আইসিসি-র ওয়েবসাইটে দেয়া সাক্ষাৎকারে তাকে বলেছেন, 'যোদ্ধা'।

"রিজওয়ান বাবরের জন্য বিশাল সাহসের জায়গা। শুরুতে রিজওয়ানের ব্যাটে-বলে হচ্ছিল না, তখন বাবর এগিয়ে আসেন, রান তোলার কাজ করেন। কিন্তু রিজওয়ান ছন্দ পেয়েই মারা শুরু করেন।"

পাকিস্তান কাল যতটা সময় ধরে ক্রিকেট খেলেছে, তার প্রায় পুরোটা সময় ধরেই রিজওয়ান মাঠে ছিলেন।

মিচেল স্টার্কের ১৪৪ কিলোমিটার গতির বল রিজওয়ানের হেলমেটের গ্রিলে আঘাত হানে ১৩তম ওভারে, গালের একপাশ ফুলে যায় রিজওয়ানের।

আরও পাঁচ ওভার এক পাশ সামলে রেখে ৬৭ রানের ইনিংসটি খেলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান। এবং এটা ছিল এই বিশ্বকাপে তার তৃতীয় হাফ সেঞ্চুরি। ৭০ গড়ে ব্যাট করেছেন তিনি।

ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তান যখন ১৫১ রান তাড়া করতে নামে, তার আগেই রিজওয়ান একটা শ্যাডো ব্যাটিং অনুশীলন করেছিলেন মূল ক্রিজে দাঁড়িয়ে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, যেসব শট রিজওয়ান অনুশীলন করেছেন, হুবহু একই শট বাস্তবায়ন করেছেন তিনি মাঠে - ভারতের বিপক্ষেই।

কেন রিজওয়ান এত সফল?

সুযোগ মতো বল সীমানার বাইরে পাঠানো, ত্রিশ গজের ভেতর আলতো টোকা দিয়ে সিঙ্গেল নেয়া এবং উইকেটের চারিপাশে শট নেয়ার ক্ষমতা রিজওয়ানকে আধুনিক ব্যাটসম্যান বানিয়েছে। তবে ম্যাথু হেইডেনের মতে, তাকে সফল বানিয়েছে তার একাগ্রতা।

রিজওয়ানের চোখে-মুখে সেটা ফুটে ওঠে বলে মনে করেন তিনি।

২০১৫ সালে ঢাকায় পাকিস্তানের একটা সফরে রিজওয়ানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১৫ সালে ঢাকায় পাকিস্তানের একটা সফরে রিজওয়ানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু হয়

পাকিস্তানের সাবেক ফাস্ট বোলার শোয়েব আখতার টুইটারে লিখেছেন রিজওয়ান পাকিস্তানের 'নায়ক'।

"রিজওয়ান একজন সাহসী ক্রিকেটার," আরও বলেছেন তিনি।

বাবর আজমও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনাল শেষে এই কথাটাই বারবার বলেছেন, ম্যাচ হারলেও রিজওয়ানের প্রশংসা করতে ভোলেননি তিনি।

তবে রিজওয়ানকে আজকের অবস্থানে আসতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

তাকে প্রথমে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ী অধিনায়ক সরফরাজ খানের জায়গা নিতে হয়েছে। ২০১৫ সালে ঢাকায় পাকিস্তানের একটা সফরে রিজওয়ানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু হয়।

সেই সিরিজে পাকিস্তান একমাত্র টি-টোয়েন্টি ম্যাচে হেরে গিয়েছিল, এরপর তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজেও হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল পাকিস্তান।

পাকিস্তান হারলেও রিজওয়ানের শুরু খারাপ ছিল না, অভিষেক ওয়ানডে ম্যাচেই ৬৭ রান তোলেন তিনি। কিন্তু দ্রুতই আবার তিনি জায়গা হারান সরফরাজের কাছে।

কিন্তু পাকিস্তান দলের সাথেই ছিলেন তিনি, ব্যাকআপ উইকেট কিপার হিসেবে। এরপর মাঝেমধ্যে সুযোগ পেতেন রিজওয়ান।

ব্যর্থতার পর এসেছে সাফল্য

রিজওয়ান তার অভিষেক টেস্ট ম্যাচে কোচের নিষেধ সত্ত্বেও বল হুক করে ক্যাচ আউট হয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের নেইল ওয়েগনারের বলে - এটা ছিল গোল্ডেন ডাক।

পরের তিন বছর রিজওয়ান টেস্ট খেলতে পারেননি।

তবে নিউজিল্যান্ডে ফিরতি সফরে তিনি আবারও একই শট খেলেছেন এবং এবারে আর ফিল্ডারের হাতে যায়নি তার শট - মাউন্ট মঙ্গুইয়ে পাকিস্তান টেস্ট হারলেও ২০১৬ সালে অভিষেক ম্যাচে গোল্ডেন ডাক পাওয়া রিজওয়ান ২০২০ সালে এসে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সফরের প্রথম টেস্টে ৭১ ও ৬০ রানের দুটি ইনিংস খেলেছিলেন।

আর এটাই প্রমাণ করে রিজওয়ানের শেখার আগ্রহ ও নিজেকে নিয়ে ভাবনার বিষয়টি।

ঠিক এক বছর আগেও রিজওয়ান টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দাপুটে ব্যাটসম্যান ছিলেন না। কিন্তু তিনি ওপেনিংয়ে নামার পর থেকে চিত্র বদলাতে শুরু করে।

রও পড়তে পারেন:

টেস্ট ক্রিকেটেও পাকিস্তানের অন্যতম সেরা পারফর্মার মোহাম্মদ রিজওয়ান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, টেস্ট ক্রিকেটেও পাকিস্তানের অন্যতম সেরা পারফর্মার মোহাম্মদ রিজওয়ান

২০২০ সালেই নিউজিল্যান্ড সফরে বাবর আজম চোট পেয়ে একাদশের বাইরে যাওয়ার পর রিজওয়ান সুযোগ পান ব্যাট হাতে ইনিংস শুরু করার। এর আগে তিনি ১৫ ইনিংসে ভিন্ন সাতটি পজিশনে ব্যাট করতে নেমেছিলেন।

প্রথম দুই ইনিংস সুবিধের হয়নি - ১৭ বলে ১৭ এবং ২০ বলে ২২। তবে এরপর তিনি ৫৯ বলে ৮৯ রানের একটি ইনিংস খেলেন - সেই থেকে শুরু, আর চালিয়ে যাচ্ছেন আজ পর্যন্ত।

রিজওয়ানকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল - পাকিস্তানের কোচ, টিম ম্যানেজমেন্ট নানা সময় রিজওয়ানের সামর্থ্য ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু সেসব প্রশ্ন জশ হ্যাজলউডের বলে সেই দাপুটে ছক্কার মতোই তিনি সীমানাছাড়া করে এসেছেন এখন পর্যন্ত।

গত এক বছরের হিসেবে দুটি ভিন্ন ফরম্যাটে পাকিস্তানের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন মোহাম্মদ রিজওয়ান।

টেস্ট ক্রিকেটে হয়তো পারফরমেন্স নিয়ে ফাওয়াদ আলমের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে রান, গড় সব হিসেবেই রিজওয়ান সবার ওপরে।

বিবিসি বাংলাআরও যা পড়তে পারেন: