মানসিক স্বাস্থ্য: সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা আর অব্যাহত রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ

    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে তিন কোটির বেশি মানুষ মানসিক রোগে ভুগছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি গবেষণায় জানা গেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেও এখনো এ নিয়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেয়ায় ঘাটতি রয়েছে।

আস্তে আস্তে কমে এলেও এখনো দেশটিতে মানসিক রোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা আছে।

অথচ শুরুতে চিকিৎসা নেয়া হলে আরও অনেক রোগের মতো মানসিক রোগ থেকে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা যায়।

'জিনের আছর থেকে মানসিক চিকিৎসা'

বাংলাদেশে একসময় মানসিক রোগ হলেই জিনের আছর বা ভুতের আছর ধরে নিয়ে অপচিকিৎসা দেয়া হতো। এতে অনেক মানুষের মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটেছে।

অথচ চিকিৎসকরা বলছেন, এটি আসলে পুরোপুরি একটি মানসিক রোগ, যার সঙ্গে অন্য কিছুর সম্পর্ক নেই। নানা কারণে মানসিক রোগ হতে পারে।

প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা না গেলে মানসিক রোগীদের অবস্থার আরও অবনতি হয়।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলছেন, মানসিক রোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক রকম ভুল ধারণা ছিল, যদিও সেই প্রবণতা আস্তে আস্তে কমে আসছে । কিন্তু অন্যসব রোগের মতো মানসিক রোগেও যত তাড়াতাড়ি শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা যাবে, রোগীর ততো উপকার হবে।

তিনি বলছেন, ''আগে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যে অনীহা, স্টিগমা ছিল, তা থেকে কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। তবে একেবারে নেই, বলা যাবে না। কিন্তু মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে তার কর্মক্ষমতা কমে যায়, সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়ে। ফলে তিনি যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা নিতে আসবেন, তার চিকিৎসা সহজ হবে। প্রথমদিকে এলে হয়তো ওষুধ ছাড়াই শুধু কাউন্সেলিং দিয়ে চিকিৎসা করা যায়। কিন্তু যত দেরি হবে, চিকিৎসা তত দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়। দেরি হলে রোগীর রেসপন্স পেতেও সময় লাগে।''

বাংলাদেশের জাতীয় স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ উদ্যোগে ২০২১ সালে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, দেশে বয়স্কদের মধ্যে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ কোন না কোন সময় মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। দেশের জনসংখ্যার হিসাবে এই সংখ্যা তিন কোটির বেশি।

কিন্তু বাংলাদেশে এই রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে পারেন, এমন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র এক হাজারের কিছু বেশি।

ফলে একদিকে যেমন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা সেবার ঘাটতি রয়েছে, তেমনি এই রোগের চিকিৎসা নিতে রোগী বা তাদের স্বজনদের মধ্যে অসচেতনতা ও অনীহা কাজ করে।

অনেকে রোগের কথা লুকিয়েও রাখতে চান।

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা বলছিলেন, বেশ কয়েক বছর আগে যখন তার মা মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হন, তার চিকিৎসা নিয়ে তারাও ভুল করেছিলেন। তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''প্রথমে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পর আত্মীয়স্বজনদের পরামর্শে স্থানীয় হুজুরের পরামর্শ নিয়েছিলাম। তিনি বলছেন, আমার মায়ের ওপর নাকি তিনটা জিন ভর করেছে। খারাপ ধরনের জিন। তার পরামর্শে পানি পড়াও খাওয়ানো হয়।''

''কিন্তু তাতে কোন উপকার হয়নি। পরে একজন বন্ধুর পরামর্শে ঢাকায় একজন মানসিক রোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসি। তার ওষুধ খাওয়ার পর আমার মা আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠেন।''

কিন্তু চিকিৎসক তাকে বলেছিলেন, আরও আগে আনলে হয়তো তার মা আরও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারতেন।

''ডাক্তার বলছেন, আমার মায়ের সমস্যাটা এখন ডিপ (গুরুতর) হয়ে গেছে। জিনের চিকিৎসা করিয়ে আমার মায়ের শরীর আরও খারাপ হয়েছে। তাকে আরও আগে এখানে আনতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু আমরা তো তখন বুঝতেই পারিনি,'' তিনি বলছেন।

এর আগে আরও এক সন্তানের মা নাসরুন নাহার বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, হঠাৎ করেই ২০১৭ সালে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে বসেন তিনি।

এই ঘটনার আগে তার কাছের মানুষজনও বুঝতে পারেননি যে, তিনি বিষণ্ণতার মতো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।

"কাছের মানুষ এমনকি আমার বেস্ট ফ্রেন্ডরাও জানতো না।"

জানালার কাঁচ ভেঙে সেটি দিয়ে হাতের রগ কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

তিনি বলেন, "যেদিন সুইসাইড অ্যাটেম্পট করি তার আগের দিনও আমি কাজিনদের সাথে ট্যুর দিয়ে আসি।"

নাসরুন নাহার বলেন, একেবারে শেষ স্তরে পৌঁছানোর পর যখন তিনি আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে উঠেন তখন তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়।

তবে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার বলছেন, পর্যাপ্ত না হলেও আগের তুলনায় সেই অবস্থার এখন পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষ করে গত এক দশকে মানসিক রোগ নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। এখন অনেকেই বিষণ্ণতা, হতাশার মতো নানা সমস্যা নিয়ে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিচ্ছেন।

চিকিৎসা অব্যাহত রাখা নিয়ে চ্যালেঞ্জ

তবে মেখলা সরকার বলছেন, বাংলাদেশের রোগীদের মধ্যে মানসিক রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও, তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও পরবর্তীতে চিকিৎসা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে এখনো অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে।

তিনি বলছেন, আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু মানসিক রোগ নয়, সব রোগের ক্ষেত্রেই রোগীরা পরবর্তীতে চিকিৎসা অব্যাহত রাখার প্রবণতা কম থাকে।

''বিশেষ করে মানসিক রোগের ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু ওষুধ খেয়ে খানিকটা স্বাভাবিক হলে উঠলে পরবর্তীতে আর চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না বা ওষুধ খান না। কিন্তু মানসিক রোগের চিকিৎসাটা এমন যে, ওষুধের পাশাপাশি কিছু আচরণগত, মানসিক কিছু ব্যবস্থাপনা নিয়মিত অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু এগুলো অনুসরণ করার ক্ষেত্রে রোগীদের আগ্রহ কম থাকে।''

''অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছুদিন পর লক্ষণগুলো চলে গেলে রোগী ওষুধ বন্ধ করে দেন, ফলোআপ করেন না। ফলে কিছুদিন ভালো থাকার পর আবার তার মধ্যে রোগ জোরালো হয়ে ওঠে,'' তিনি বলছেন।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরের অন্য যেকোনো রোগের মতো মানসিক রোগকেও একটি অসুখ হিসাবে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।

শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে এ নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও গ্রামীণ এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকেও এই বিষয়ে সচেতন করে তোলা জরুরি বলে তারা বলছেন।

কী কী লক্ষণ দেখলে চিকিৎসা নিতে হবে

অধ্যাপক মেখলা সরকার বলছেন, একেকজনের ক্ষেত্রে মানসিক রোগের উপসর্গ একেকরকম হয়ে থাকে।

তবে কারও মধ্যে যদি দেখা যায়, তার স্বাভাবিক যে আবেগ, আচরণ বা চিন্তাভাবনা রয়েছে, সেখানে বিশেষ কোন পরিবর্তন হচ্ছে তখনি তাকে মানসিক রোগের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।

তিনি হয়তো এমন কিছু করছেন যা, তার স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব বা আচরণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তখন তিনি না বুঝলেও তার স্বজন বা আশেপাশের ব্যক্তিরা সচেতন হয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন।

মেখলা সরকার বলছেন, অনেক সময় দেখা যায় যে, এরকম পরিবর্তনে তার পারস্পরিক সম্পর্ক, পেশাগত সম্পর্ক, নিজের প্রতি যত্ন-ইত্যাদি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, তখনো তিনি সচেতন হতে পারেন।

অকারণে মন খারাপ থাকা, অল্পতে রেগে যাওয়া, নিজেকে গুটিয়ে রাখা, সামাজিক কাজকর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখা, নিজে নিজে কথা বলা- ইত্যাদি মানসিক রোগের লক্ষণ হতে পারে।

অধ্যাপক মেখলা সরকার বলছেন, ''সিজোফ্রেনিয়া, মুড ডিজঅর্ডার বা বাইপোলারের মতো বড় মানসিক রোগগুলো বাইরে থেকেই বোঝা যায়। তবে সাধারণত আমাদের বেশিরভাগ মৃদু মানসিক রোগ হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, উত্তেজিত হয়ে যাওয়া ইত্যাদির মতো রোগ বেশি দেখা যায়।''

এসব রোগের সঙ্গে অনেক সময় শারীরিক নানা উপসর্গ দেখা যায়। যার মধ্যে রয়েছে খাবারে অনীহা, হজমে সমস্যা, মাথা ব্যথা, বুক ব্যথা, শরীরের নানা জায়গা ব্যথা হচ্ছে বলে মনে হতে পারে, কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও এগুলোর কোন কারণ পাওয়া যায় না। এরকম হলে মানসিক রোগের বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা উচিত।