আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ- ১৫০০ টাকা বেতনের চাকরি ফিরিয়ে কোটিপতি হয়েছিলেন ৩৫ বছর বয়সে
- Author, ওয়াকার মুস্তফা
- Role, সাংবাদিক, গবেষক
ঘটনাটি বিংশ শতকের শুরুর দিকের। তখন বম্বেতে, (এখন যেটি মুম্বাই নামে পরিচিত) এক ধরনের রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়েছিল।
ওই অঞ্চলে ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা লড়ে সেই লড়াইয়ে জিতেছিলেন একজন উদীয়মান আইনজীবী। ঘটনাচক্রে প্রায় চার দশক পর সেই আইনজীবীই একটা নতুন দেশ গঠনের পেছনে কাজ করেছিলেন যার জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন অহিংস এবং আইনি পথ।
এই ব্যক্তি আর কেউ নন, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে স্থানীয় সরকার পরিচালনার জন্য সীমিত পরিসরে স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা শুরু করা হয়েছিল। এই সীমিত স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার আওতায়, বোম্বে পৌর কর্পোরেশনের অর্ধেক সদস্যদের নির্বাচন করতেন ১২ হাজার করদাতা এবং বাকি সদস্যরা ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের মনোনীত।
কর্পোরেশনের এই 'নির্বাচিত' শাখায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মেন্টর ফিরোজ শাহ মেহতাসহ মধ্যপন্থি কংগ্রেস রাজনীতিবিদদের আধিপত্য ছিল। আর সরকারের মনোনীতদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন ইউরোপীয় কর্মকর্তা।
এই মনোনীত কর্মকর্তারা সরকারের সাথে আঁতাত করে মি. মেহতার মতো কংগ্রেস রাজনীতিবিদদের পরাজয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন।
'ককাস' নামে পরিচিত এই গ্রুপে ছিলেন তৎকালীন বোম্বাইয়ের অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল সি এইচ হ্যারিসন, পুলিশ কমিশনার, পৌর কমিশনার শেপার্ড এবং টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র সম্পাদক লোভেট ফ্রেজার।
সাংবাদিক হিসেবে তার তীক্ষ্ণ লেখনীর জন্য পরিচিত লোভেট ফ্রেজার সেই সময় নিয়মিতভাবে ফিরোজ শাহ মেহতার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন লিখতেন। এই নির্বাচনী লড়াইয়ের সময় তার লেখা আরো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিল।
এই ককাস গ্রুপ পৌরসভার নির্বাচনে মি. মেহতাকে পরাজিত করার জন্য ১৬ জন প্রার্থীকে দাঁড় করায়। কিন্তু তিনি এই তালিকার শেষ প্রার্থী সুলেমান আব্দুল ওয়াহিদকে চ্যালেঞ্জ জানান, কারণ তিনি ওই পৌরসভার সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ ফার্মের শেয়ারহোল্ডার ছিলেন।
মি. মেহতা নিজেও একজন আইনজীবী ছিলেন, তবে এই মামলাটি লড়ার জন্য মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন তিনি।
মামলা লড়তে আদালতে হাজির হন মি. জিন্নাহ। তার যুক্তি, আইনের জ্ঞান ও সূক্ষ্মতা আদালতকে বাধ্য করে সুলেমান আব্দুল ওয়াহিদকে অযোগ্য বলে ঘোষণা করতে।
এদিকে, পৌরসভার নির্বাচিতদের তালিকায় মি. মেহতা ছিলেন ১৭তম স্থানে। মি. ওয়াহিদকে প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই মেহতা নির্বাচিত হন এবং ককাস গ্রুপের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রোহিত দে তার 'জিন্নাহ'স লিগাল ক্যারিয়ার' শীর্ষক প্রতিবেদনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন।
তিনি উল্লেখ করেছেন মি. জিন্নাহ কীভাবে গঙ্গাধর তিলকের মতো ব্রিটিশ শাসকদের সমালোচকদের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন এবং সে সময় রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। সংবাদপত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতারও জন্য অবিরাম সংগ্রাম চালিয়েছিলেন তিনি।
অধ্যাপক রোহিত দে উল্লেখ করেছেন, এই স্থানীয় মামলাগুলো মি. জিন্নাহকে জাতীয়স্তরের খ্যাতি এনে দিয়েছিল।
অধ্যাপক দে বলেছেন, "এই প্রথমবার নিজেদের আদালতেই ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ ইংরেজি এবং স্থানীয় দুই ধরনের সংবাদমাধ্যমেই ব্যাপকভাবে কভার করা হয়েছিল।"
"ব্রিটিশ সরকারের সাংবিধানিক কাঠামোর ত্রুটি ও দ্বন্দকে প্রকাশ্যে আনার জন্য জিন্নাহর যে নীতি ছিল, এই মামলা বোধহয় তারই প্রথম উদাহরণ।"
১৮৯৬ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ লিঙ্কনস ইন থেকে পাশ করা সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় হয়েছিলেন। সেই সময় তার বয়স কুড়িও হয়নি।
স্ট্যানলি ওলপার্ট তার বই 'জিন্নাহ অফ পাকিস্তান'-এ উল্লেখ করেছেন "ভারতে ফিরে আসার পর এই তরুণ আইনজীবীর প্রথম তিন বছর সম্পর্কে কার্যত কিছুই জানা যায় না।"
তবে ডন পত্রিকাকে লেখা এক চিঠিতে করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক লেকচারার ড. আরফা ফরিদ দাবি করেছেন যে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ করাচীর হরচন্দ্রাই অ্যান্ড কোম্পানিতে তার ওকালতি শুরু করেছিলেন। এই হরচন্দ্রাই-ই পরে ১৯১১ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত করাচী মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের প্রধান ছিলেন।
ড. আরিফা তার বাবা আবদুল হামিদ ফরিদকে উল্লেখ করে ওই চিঠি লিখেছিলেন। ভারত বিভাজনের আগে মি. ফরিদ নিজে পুনে ও তৎকালীন বম্বেতে এবং তারপর পরে করাচীতে আইন প্র্যাকটিস করেছেন।
করাচীতে কিছুদিন থাকার পর মি. জিন্নাহ বম্বেতে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করেন।
আকবর এস আহমেদ তার বই 'জিন্নাহ, পাকিস্তান অ্যান্ড ইসলামিক আইডেন্টিটি'-তে উল্লেখ করেছেন সেই সময় বম্বে বার অ্যাসোসিয়েশনে তিনিই একমাত্র মুসলিম আইনজীবী ছিলেন।
"বোম্বের প্রাদেশিক সরকারের সদস্য স্যার চার্লস অলিভান্তে জিন্নাহর প্রতি এতটাই মুগ্ধ হন যে ১৯০১ সালে তাকে স্থায়ী চাকরির প্রস্তাব দেন। মাসিক দেড় হাজার টাকা বেতন ছিল, কিন্তু জিন্নাহ তা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিলেন শিগগিরই ওই টাকা তিনি দিনে উপার্জন করবেন। নিজেকে সঠিক প্রমাণ করেছিলেন তিনি।"
প্রফেসর রোহিত দে উল্লেখ করেছেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বাগ্মিতা এবং যুক্তি তার পসার বাড়াতে সাহায্য করেছিল।
সাংবাদিক ফ্র্যাঙ্ক মরিস পরবর্তী সময়ে তার আদালতের স্টাইল সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন।
মি. মরিস উল্লেখ করেছেন, "যে মনোযোগের সঙ্গে আদালতে তার যুক্তিতর্ক শোনা হতো তেমনটা খুব কমই অন্য আইনজীবীদের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে। মামলা উপস্থাপনে ক্ষেত্রে তার চেয়ে দক্ষ আর কেউ ছিল না।"
"ন্যূনতম চেষ্টায় সর্বোচ্চ ফল পাওয়াকে যদি এক ধরনের শিল্প বলে ধরা হয়, তবে জিন্নাহ একজন শিল্পী ছিলেন। মামলার একেবারে গভীরে যেতে পছন্দ করতেন তিনি। তার মামলার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার শৈলী ছিল অনবদ্য।"
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মামলা উপস্থাপন এবং বাগ্মিতার প্রশংসা করেছেন এই সাংবাদিক।
"তিনি থাকলে আদালতের একঘেয়ে কক্ষও প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। জুনিয়র আইনজীবীরা ঘার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এই দীর্ঘ, ব্যক্তিত্বপূর্ণ আইনজীবীর প্রতিটা পদক্ষেপ অনুসরণ করতেন। সিনিয়র আইনজীবীরা তার উপস্থাপনা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, বিচারকরাও মন দিয়ে তার যুক্তি শুনতেন।"
আকবর এস আহমেদের মতে, "জিন্নাহ প্রায়শই ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরোধিতা করতেন। তবে আইনি দিক থেকে তার বিরোধীরা যাতে তাকে দোষী করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করার জন্যও সবসময় সচেতন থাকতেন তিনি।"
"সংক্ষেপে বলতে গেলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ আইনকেই দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে শিখেছিলেন তিনি। ভারতীয়দের অধিকারের জন্য কথা বলায় বহুবার তাকে জেলে পাঠানোর কথাও বলা হয়েছে।"
প্রফেসর রোহিত দে উল্লেখ করেছেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সংবাদমাধ্যমের উপর আরোপ করা আইনের বিরুদ্ধে বহু মামলা লড়েছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মামলা ছিল ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত জাতীয় সংবাদপত্র 'বম্বে ক্রনিকাল' এর পক্ষে।
এই জাতীয় মামলা লড়ার সুবাদে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল এবং অন্যান্য জায়গা থেকেও তার কাছে একই ধরনের মামলা আসছিল।
এমননি ছুটিতে থাকার সময়ও মামলা লড়েছেন তিনি।
একবার শ্রীনগরে ছুটি কাটাতে গিয়ে কাশ্মীরী নেতা শেখ আবদুল্লার অনুরোধে মামলা লড়েছিলেন তিনি। অন্য কোনো আইনজীবী যে মামলা লড়তে রাজি ছিলেন না, সেই মামলাই তিনি একদিনে জিতেছিলেন।
শেখ আবদুল্লাহ তার আত্মজীবনী 'আতিশ-ই-চিনার'-এ এই ঘটনার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন।
মুহাম্মদ ইউসুফ সরফ তার বইয়ে লিখেছেন, "আদালত কক্ষ সমাজের সকল স্তরের মানুষের ভিড়ে ঠাঁসা ছিল। আইনজীবী, সরকারি কর্মচারী যেমন ছিলেন, তেমনই মানুষ নিজেদের দোকান-পাট দোকান বন্ধ রেখে আদালতে হাজির হয়েছিলেন। শেখ আবদুল্লাহও উপস্থিত ছিলেন।"
ভোপালের একটা মামলায় তার জয়কে জনগণের জয় হিসেবে দেখা হয়েছিল। মামলায় জিতে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা বৃত্তি চালু রাখার রাখার বিষয়টা নিশ্চিত করেছিল তিনি।
১৯১০ সালের ২৫শে জানুয়ারি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বম্বের মুসলিম সদস্য হিসেবে ৬০ জন সদস্যের আইন পরিষদে আসন গ্রহণ করেন।
অধ্যাপক রোহিত দে উল্লেখ করেছেন, "জিন্নাহ প্রায়শই নাগরিক স্বাধীনতার কথা বলতেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ভগৎ সিং-এর বিচারের অবৈধতা নিয়ে ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে তার ভাষণ। যেহেতু ভগৎ সিং এবং তার সহযোগীরা মামলা পরিচালনায় সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেন, তাই তার অনুপস্থিতিতে বিচারের অনুমতি দেওয়ার জন্য একটা বিশেষ অধ্যাদেশ আনার চেষ্টা করা হয়েছিল।"
"এই অধ্যাদেশ আনার ফলে আইনের শাসনের যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন জিন্নাহ।"
তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, "বিচার বিভাগীয় বা ন্যায়বিচারের বোধযুক্ত কোনো বিচারক কখনো এই জাতীয় মামলার পক্ষ হতে পারেন না এবং বিবেক থাকলে এইভাবে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন না।"
"আপনি যা প্রস্তাব দিচ্ছেন তা প্রতারণার সামিল- বলেছিলেন তিনি।"
অধ্যাপক দে বলেছেন, "ওই আইন যে ব্রিটিশ সাধারণ আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ব্যর্থ হয়েছে তা তিনি দেখিয়েছিলেন। জিন্নাহর সবচেয়ে জোরালো যুক্তিগুলোও আইনত বৈধ ছিল।"
মি. আহমেদ লিখেছেন, "জিন্নাহকে মিত্র হিসেবে পাশে পাওয়া নিয়ে ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর ভ্রম শিগগিরই ভেঙে গিয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের সঙ্গে আচরণ বর্ণনা করতে গিয়ে 'কঠোর এবং নিষ্ঠুর'-এর মতো শব্দের ব্যবহারের জন্য জিন্নাহকে তিরস্কার করেছিলেন তিনি।"
উত্তরে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, "মাই লর্ড, আমার আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করা উচিত ছিল। কিন্তু আমি এই পরিষদের সংবিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে পরিচিত এবং আমি এক মুহূর্তের জন্যও তা লঙ্ঘন করতে চাই না। আমি শুধু বলেছি ভারতীয়দের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে তা সবচেয়ে কঠোর এবং দেশের সকলেই এই বিষয়ে একই সহমত।"
ড. রোহিত দে মনে করেন মুসলিম আইন সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
অধ্যাপক দে বলেছেন, "তিনি ১৯১৩ সালের মুসলিম ওয়াকফ আইনের পক্ষে তদবির করে তা কার্যকর করেছিলেন। এরপর কর্মজীবনে ১৯৩৭ সালে তিনি শরিয়া আইনের খসড়া তৈরি করেন এবং ভারতে তা চালু করেন। সেখানে বলা হয়েছিল শরিয়া আইন ভারতে বসবাসকারী সমস্ত মুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য হবে।"
"এই আইন মুসলিমদের মধ্যে সেই সময় প্রচলিত আইনকে বাতিল করে দেয় এবং উত্তারাধিকারসহ একাধিক ক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের অধিকারকে নিশ্চিত করে যা শরিয়া আইনে নিশ্চিত করা আছে। পাশাপাশি সাধারণ আইনের আওতায় মুসলিম সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করার ধারণাকেও সমর্থন করে।"
মুহাল্লদ আলী জিন্নাহর জীবনযাত্রা একজন উচ্চবিত্ত ইংরেজ পেশাদার আইনজীবীর মতো ছিল।
মি. আহমেদ লিখেছেন, "তিনি সিল্কের একই টাই দু'বার পরেননি। তার পোশাকের সম্ভারে প্রায় ২০০টা হাতে তৈরি স্যুট ছিল। সম্ভবত ব্রিটিশশাসিত ভারতে একজন সফল আইনজীবীর জন্য যা প্রয়োজন, সেই দামী পোশাক চেয়েছিলেন জিন্নাহ। পোশাকের প্রতি অস্বাভাবিক রুচি থাকা সত্ত্বেও জিন্নাহ কিন্তু সারা জীবন অর্থ ব্যয়ের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন।"
১৯৩০-এর দশকের গোড়ার দিকে, জিন্নাহ লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড অঞ্চলে একটা বিশাল বাড়িতে বাস করতেন। তার গাড়ির চালক ইংরেজ ছিলেন যিনি তার বেন্টলি গাড়ি চালাতেন। তার গৃহকর্মীও ইংরেজ ছিলেন।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মেয়ে দিনাকে উল্লেখ করে মি. আহমেদ লিখেছেন তাদের দু'জন রাঁধুনি ছিলেন। একজন ভারতীয় এবং অন্যজন আইরিশ। জিন্নাহর প্রিয় খাবার ছিল ভাত আর তরকারি। তিনি বিলিয়ার্ড খেলতে ভালোবাসতেন।
আকবর এস আহমেদ লিখেছেন, "দিনার মনে আছে তার বাবা তাকে থিয়েটার, প্যান্টোমাইম (সঙ্গীতপ্রধান ও কৌতুকধর্মী এক ধরনের মঞ্চনাটক যা প্রধানত শিশুদের জন্য মঞ্চায়ন করা হয়) এবং সার্কাসে নিয়ে গিয়েছিলেন।"
তার বিপুল সম্পত্তির সবকিছুই তিনি উপার্জন করেছিলেন একজন দক্ষ আইনজীবী এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারী হিসেবে।
'ইন ডিফেন্স অফ জিন্নাহ' শীর্ষক নিবন্ধে এজি নুরানি লিখেছেন একজন আইনজীবী হিসেবে আচরণবিধির প্রতি তার প্রতিশ্রুতিই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে সবচেয়ে প্রথমে ছিল।
"জিন্নাহ কমিউনিস্ট মতাদর্শের বিরোধী ছিলেন। তবে আইনজীবী হিসেবে আচরণবিধির প্রতি তার প্রতিশ্রুতি তার কাছে সবচেয়ে আগে ছিল। এটা এও দেখায় যে তিনি ঘৃণার ঊর্ধ্বে ছিলেন," মি. নুরানি লিখেছেন।
"জিন্নাহর একটা নিয়ম ছিল যে পারিশ্রমিক ছাড়া তিনি কোনো মামলা নিতেন না। তার ভাগ্নে তারই চেম্বারে জুনিয়র ছিলেন। বম্বে বারের সহকর্মীদের তার ভাগ্নে সবসময় বলতেন জিন্নাহ এই নিয়ম কখনোই শিথিল করবেন না।"
"কেউ তার পারিশ্রমিক দিতে না পারলে পরিবর্তে জিন্নাহ সম্ভাব্য বাদীকে তহবিল সংগ্রহ করার কথা বলতেন। সেই তহবিলে নিজেও টাকা দিতেন।"
মি. জিন্নাহর পেশাদারিত্বেরও তারিফ করেছেন এজি নুরানি।
তিনি লিখেছেন, "অন্যদিকে পেশাদার নৈতিকতা এবং শিষ্টাচারের প্রতি প্রতিশ্রুতির দিক থেকে তিনি নির্ভীক এবং আপসহীন ছিলেন। বাদীদের মধ্যে একজনের অর্থাভাব ছিল। সেই ব্যক্তি জিন্নাহকে অনুরোধ করেছিলেন তিনি যে ফি দিয়েছিলেন সেটা যেন তিনি (জিন্নাহ) গ্রহণ করেন এবং সেই ফি-র উপর নির্ভর করে যতক্ষণ হয় ততক্ষণই যেন তিনি আইনি পরামর্শ দেন। কারণ জিন্নাহ প্রতি ঘন্টা অনুযায়ী ফি নিতেন।"
"এতে রাজি হন এবং আইনি পরামর্শও দেন। এরপর প্রদত্ত ফি-র একটা বড় অংশ ফেরত দিয়ে বলেছিলেন, তিনি যতটুকু (মামলা বিষয়ক) প্রাসঙ্গিক ততটুকুই পড়েছেন।"
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
অত্যন্ত ধনী আইনজীবীদের তালিকায় ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
"১৯৩০-এর দশকের গোড়ার দিকে শুধু আইন প্র্যাকটিস করেই মাসে ৪০ হাজার টাকা উপার্জন করতেন তিনি। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এটা বিশাল অঙ্কের উপার্জন ছিল। মোহনদাস গান্ধীর মতো বিরোধীরাও জিন্নাহকে সম্মান করতেন। তিনি এই উপমহাদেশের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকের আইনজীবীদের মধ্যে একজন ছিলেন জিন্নাহ।"
"পাশাপাশি, ভালো বিনিয়োগের বিষয়েও তার নজর ছিল। শেয়ার এবং সম্পত্তিতে সফলভাবে বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। লন্ডনের হ্যাম্পস্টেডে, বম্বের মালাবার হিলে তার সম্পত্তি ছিল। দিল্লির ১০ আওরঙ্গজেব রোডে এডউইন লুটিয়েনসের নকশা করা একটা বাড়িও ছিল।"
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কে নটবর সিং জিন্নাহকে "১৯৪৭ সালের আগে সবচেয়ে সফল ভারতীয় রাজনীতিবিদ" হিসেবে বর্ণনা করে লিখেছিলেন, "জিন্নাহ একজন বুদ্ধিমান এবং উজ্জ্বল রাজনীতিবিদ হওয়ার আগে একজন উজ্জ্বল আইনজীবী ছিলেন।"
মি. সিং উল্লেখ করেছেন, "(মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ) তার প্রায় পুরো জীবন বম্বেতে কাটিয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সে, তিনি কোটিপতি হয়ে ওঠেন।"
আকবর এস আহমেদের মতে, "জিন্নাহর সম্পদ তাকে যা খুশি তা বলার স্বাধীনতা দিয়েছিল। আদালতের ভেতরে, আদালতের বাইরে বা রাজনীতিতে আইনই ছিল তার নীতিবাক্য।"
প্রফেসর রোহিত দে লিখেছেন, "জিন্নাহর শেষ মামলা ছিল পাকিস্তান।"