রামু হামলা: ১০ বছর পর স্থানীয় দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্যের পরিবেশ কি ফিরেছে?

    • Author, সানজানা চৌধুরী
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা কক্সবাজারের রামু উপজেলায় ২০১২ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও প্রায় ৩০টি বসতঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে দুষ্কৃতিকারীরা। ফেসবুকে শেয়ার হওয়া একটি পোস্টের জের ধরে ওই হামলার ঘটনা ঘটে।

ওই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্থানীয় মুসলমান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ, সম্প্রীতির জায়গাটি। যা ১০ বছর পরেও এখনও পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।

হামলার চিহ্ন মুছে গেলেও পুরোপুরি আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি সেখানকার মানুষ।

তাদের অভিযোগ ১০ বছরেও এই ঘটনায় ১৮টি মামলার একটিরও বিচারকাজ নিষ্পত্তি করা যায়নি।

তবে সরকারি কৌঁশুলি বলছেন, সাক্ষীদের সাক্ষ্যদানে অনীহার কারণেই বিচারকাজ থমকে আছে।

'সেদিন কেউ বাঙালি ছিল না, সবাই মুসলমান হয়ে গেছে'

ওই রাতের হামলার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা রিয়াজুল ইসলাম।

তিনি জানান, রামুতে বৌদ্ধ ও মুসলমান সম্প্রদায়রে মধ্যে যে সম্প্রীতি ছিল, ওই হামলার পর তা পুরোপুরি বদলে যায়।

এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থার সংকট প্রকট হয়ে পড়ে।

"ওই সময় মুসলমানদের একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখা হতো। সব মুসলমান অপরাধী, এমন চিন্তা করতো। আমাদের সামনেই অনেক বৌদ্ধ ভাই বলেছে 'সেদিন কেউ বাঙালি ছিল না, সবাই মুসলমান হয়ে গেছে।"

আবার এই ঘটনার জেরে ঢালাওভাবে অনেক নিরপরাধ মানুষকেও আটক করা হয়। বিশেষ করে, অনেকে ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে মিথ্যা অভিযোগ তুলে অনেক মুসলমান বাসিন্দাকে ঘরছাড়া করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

এতে প্রকৃত আসামীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে রূপ নেয়। দুই সম্প্রদায়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়।

আরও পড়তে পারেন:

'আশি পারসেন্ট পরিস্থিতি আগের মতো'

তবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বৌদ্ধদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কারণে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আগের মতো হয়ে আসছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তার ভাষায়, "পুরোপুরি না হলেও ৮০% পরিস্থিতি আগের মতো হয়েছে।"

বিষয়টি কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন্দল নয় বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হামলা ছিল বলে তিনি মনে করেন।

তবে বিচার নিষ্পত্তির মাধ্যমে মূল কারণ বের করে আনা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

এদিকে, ঐ ঘটনার পর পরই সরকারি উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার ও ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

পরের বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালে বৌদ্ধ বিহার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আতঙ্ক কাটেনি, দেশ ছাড়ার প্রবণতা বেড়েছে

অবকাঠামো থেকে হামলার চিহ্ন মুছে গেলেও এখন জনমনে আতঙ্ক বিরাজমান, বলছেন স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী শিউলি শর্মা।

এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করছেন ১০ বছর পরও বিচার নিষ্পত্তি না হওয়াকে।

অভিযোগ রয়েছে, মূল অভিযুক্তদের বেশিরভাগ জামিনে ঘোরাফেরা করছেন, কেউ কেউ আছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। আবার অভিযোগপত্র থেকে হামলাকারী অনেকের নাম বাদ পড়েছে।

এমন নিরাপত্তা-হীনতার মুখে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনেকে ভেতরে ভেতরে দেশ ছাড়ার চিন্তা করছেন বলে জানান মিসেস শর্মা।

তিনি বলেন, "যখন মানুষ কোন বিচার পায় না তখন আতঙ্ক, হতাশা থেকেই যায়। এখন তারা মনে করে যে কেউ চাইলেই তাদের ওপর হামলা চালাতে পারে।

"এতদিনের ভিটা-বাড়ি, ব্যবসা, সারাজীবনের অর্জন যেকোনো সময় যেকোনো গোষ্ঠী ধ্বংস করে দিতে পারে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কোন বিচার হয় না। তাদের মধ্যে এমন মানসিকতা কাজ করছে।"

তার মতে, দিন শেষে মানুষ নিরাপত্তা চায়। এজন্য যারা পারছে তারা দেশ ছাড়ছে। দু'একটা পরিবার চলেও গেছে। আগের হৃদ্যতা আর নাই।

রামুতে, মুসলমান, বৌদ্ধ, হিন্দু, রাখাইন - এই চারটি সম্প্রদায় পাশাপাশি বসবাস করে।

দৈনন্দিন প্রয়োজনে মুসলমানদের সাথে তারা যোগাযোগ রাখলেও ২৯শে সেপ্টেম্বর সামনে আসলে তাদের মনে হয়, তারা কারও কাছে নিরাপদ না।

"মুসলমান সম্প্রদায় সেখানে সহনশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে কাজ করছে, সরকারও সহায়তা করেছে। কিন্তু সব অনুষ্ঠানে যেরকম স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। সেটা আর আগের মতো নেই। একমাত্র বিচার হলেই আগের আত্মবিশ্বাস ফিরে আসতো," তিনি বলেন।

বিচারকাজ থমকে আছে

রামুতে ওই হামলার পর মোট ১৯টি মামলা দায়ের হয়।

এর মধ্যে একটি মামলা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে দায়ের করেন। যা পরবর্তীতে বিবাদীদের সঙ্গে আপোষ-নামায় নিষ্পত্তি হয়ে যায়।

বাকি ১৮টি মামলা দায়ের করে পুলিশ, যার একটিও আজ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

এর কারণ হিসেবে জেলা দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁশুলি অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম জানান, সাক্ষীদের সমন জারি করলেও তারা আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসায় মামলাগুলো ঝুলে আছে।

এছাড়া চার্জশিটে কিছু ত্রুটি থাকায় তিনটি মামলা পুন:তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।

মি. আলম বলেন, "তারা সাক্ষ্য দিলেই এই মামলার নিষ্পত্তি সম্ভব। আমি স্থানীয়দের কথা বলেছি, তাদের সর্বোচ্চ আইনি নিরাপত্তা দেয়ার কথা বলেছি। সমন জারি করেছি। কিন্তু তারা আসেনি। সাক্ষ্য ছাড়া মামলা নিষ্পত্তি হবে কিভাবে?"

মূলত যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তারা সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পর বিষয়টিকে আর সামনে বাড়াতে চান না বলে তিনি জানান।

কেন ভয়ে সাক্ষীরা

কিন্তু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা সুকুমার বড়ুয়া বলছেন, হামলার ভয় থাকায় এবং সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়ায় সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে ভয় পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, "সাক্ষীদের পরিবার আছে। যেকোনো সময় যেকোনো কিছু হতে পারে। সরকার তো তাদের ২৪ ঘণ্টা সুরক্ষা দেবে না। এজন্য ভয়ে তারা সাক্ষ্য দিতে যায় না। ঘটনার অনেক ভিডিও ফুটেজ আছে সেটা কেন ব্যবহার করছে না, এটা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ আছে।"

হামলার দিনটিকে ঘিরে বৃহস্পতিবার রামুর চেরাংঘাটা মৈত্রী বিহার উপাসনালয়ে স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়।

সেখানে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা ঘটনার বিচারকাজ শেষ করে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান। পাশাপাশি সকল সম্প্রদায়ের মানুষের সম্প্রীতি অটুট থাকুক এই প্রার্থনা করেন।

স্থানীয় বিভিন্ন বৌদ্ধ সংগঠন সংঘদান ও শান্তি শোভাযাত্রারও আয়োজন করে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন: