বাল্য বিয়ে: অনুপস্থিত ৮১ জন এসএসসি পরীক্ষার্থীর ৫৫ জনকেই বিয়ে দেয়া হয়েছে নানা কৌশলে

ছবির উৎস, Amzad Hossain
বাংলাদেশের ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলায় এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের বড় অংশকেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন তাদের অভিভাবকরা। কর্তৃপক্ষের চোখ এড়িয়ে মেয়েদের বিয়ে দিতে তারা নানা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।
বাংলাদেশের ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলায় চলমান এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করার পরও শেষ পর্যন্ত ৮১ জন তাতে অংশ নিচ্ছে না, যার মধ্যে ৬৩ জনই ছাত্রী।
বেশ কয়েকটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস বলছে যেসব ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেনা তাদের মধ্যে অন্তত ৫৫ জনের বিয়ে হয়ে গেছে, যাদের বেশিরভাগেরই বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
যদিও বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বয়স বিয়ের উপযোগী নয়। আর সে কারণেই এসব বিয়ের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের চোখ এড়াতে নানা কৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়েছিলো বলে বলছেন উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় শিক্ষকরা।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষায় উপজেলার ২৪টি বিদ্যালয় থেকে ৩ হাজার ২০৫ জন এবং দাখিল পরীক্ষায় ১৯টি মাদ্রাসা থেকে ৮৯৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য ফর্ম পূরণ করেছিলো।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মনজুরুল হক বলছেন অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ না নেয়ার কারণ তারা অনুসন্ধান করবেন।
"এরা সবাই বিয়ের কারণে অনুপস্থিত কি-না কিংবা অনুপস্থিতদের মধ্যে ছাত্রী কতজন - এগুলো আমরা বিস্তারিত এখনো জানি না। তবে বাল্য বিয়ের খবর পেলেই আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। এটি অবশ্য সত্য যে অনেক ক্ষেত্রে অভিনব কৌশলে কেউ কেউ বাল্য বিয়ে দিচ্ছেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ নূরুল আমিন বলছেন যে যেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না তাদের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছে তারা এ বিষয়ে জানতে চেয়েছেন।
"প্রতিষ্ঠান প্রধানরা যেটি বলছেন,অনেক শিক্ষার্থীই পারিবারিক কারণে পরীক্ষা দিতে পারছে না। এর মধ্যে বিয়েও একটি কারণ বলে তারা জানিয়েছেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Amzad Hossain
'আমার কেন্দ্রের অনুপস্থিত মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে'
সোনাগাজী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ জয়নুল আবেদীন বলছেন যে তার কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে আটজন পরীক্ষা দিচ্ছেনা।
"এর মধ্যে একটি ছেলে, যে বিদেশে চলে গেছে পরিবারের সাথে। আর বাকী সবাই মেয়ে এবং তাদের বিয়ে হয়ে গেছে বলে জানতে পেরেছি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
মিস্টার আবেদীন বলেন এসব বিয়ে গোপনে এবং নানা কৌশল অবলম্বন করে করা হয়ে থাকে। এসব নিয়ে কয়েকজন অভিভাবকের সাথেও তিনি কথা বলেছেন যারা বিয়ের যুক্তি হিসেবে পারিবারিক ও সামাজিক কারণ এর কথা উল্লেখ করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
নাম প্রকাশ করতে রাজী হন নি এমন আরেকজন শিক্ষক জানিয়েছেন যে গত এক বছরে ওই এলাকায় স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের বিয়ের প্রবণতা বেড়েছে। তবে প্রশাসনের বাধা এড়াতে এজন্য অনেক অভিভাবক ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়েছিলেন।
"অনেকের বিয়ের খবর পাওয়া গেছে অনেক পরে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা অনুরোধ করেছেন যেন এ নিয়ে উচ্চবাচ্য না করা হয়। ফলে শিক্ষকরা স্থানীয় হওয়ার কারণে এগুলো নিয়ে খুব একটা কিছু করতে পারেন নি," বলছিলেন তিনি।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২১ সালে মাধ্যমিক স্তরের বার্ষিক পরীক্ষায় পৌনে পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল।
এদের মধ্যে ৪৭ হাজার ছাত্রীর বাল্যবিবাহ হয়েছিলো এবং ৭৮ হাজার শিক্ষার্থী শিশুশ্রমে যুক্ত হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
"অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত তথ্য"
এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ লাখেরও বেশি কিন্তু বৃহস্পতিবার প্রথম দিনে পরীক্ষা দিয়েছে ১৯ লাখ ৫ হাজারের কিছু বেশি।
সব মিলিয়ে প্রথম দিনে ৩৩ হাজার ৮৬০ জন অনুপস্থিত ছিলো সারাদেশে।
সোনাগাজী উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা অফিসের সূত্রগুলো বলছেন মোট অনুপস্থিত ৮১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৩ জন ছাত্রী আর ১৮ জন ছাত্র।
৬৩ জন ছাত্রীর মধ্যে একজন আত্মহত্যা করেছে আর একজন পরিবারের সাথে বিদেশে চলে গেছে। আর একজন নিজের সহপাঠীকেই গোপনে বিয়ে করেছে।
আর অন্তত ৫৫ জনের বিয়ে হয়েছে গত এক বছরে। বাকী ৫ জনের অনুপস্থিতির কারণ সম্পর্কে কেউ কোন তথ্য দিতে পারেনি।
আর অনুপস্থিতি ছাত্রদের ক্ষেত্রে মূলত পারিবারিক কাজ কর্মে জড়িয়ে যাওয়া ও এলাকায় না থাকাকেই মূল কারণ হিসেবে বলছেন স্থানীয়রা।
প্রধান শিক্ষক জয়নুল আবেদীন বলছেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিভাবকরা তাদের মেয়েদের গোপনে বিয়ে দিয়েছেন বলেই আমরা কোন খবর পাইনি।
"আবারও কারও মা নেই কিংবা বাবা নেই। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের সিদ্ধান্তে তাদের বিয়ে হয়েছে যেটা আমরা পরে জেনেছি," বলছিলেন তিনি।
একজন অভিভাবক বলেছেন যেসব মেয়েদের বিয়ে হয়েছে তাদের কয়েকজনের পরিবার তার পরিচিত এবং মূলত দারিদ্রের কারণেই তারা মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।
"দরিদ্র মেয়েদের নিরাপত্তা কোথায়? পরিবারগুলোর অর্থ সংকটের কারণে মেয়েরাও স্কুল বা মাদ্রাসায় যেতে চাইতো না। সে কারণে যারা সুযোগ পেয়েছে বিয়ে দিয়েছে," বলছিলেন তিনি।








