চা শ্রমিক আন্দোলন: দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শনিবার বিকালে গণভবনে চা বাগান মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আহমেদ কায়কাউস।
এর আগে শ্রমিকরা ১২০ টাকা দৈনিক মজুরি পেতেন। ফলে তাদের দৈনিক মজুরি বাড়ল ৫০ টাকা।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের আবাসন, রেশনসহ অন্যান্য যেসব সুযোগসুবিধা দেয়া হয়, তার সঙ্গে এই দৈনিক মজুরি মিলিয়ে তাদের প্রতিদিনের আয় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা হবে।
এর সঙ্গে আনুপাতিকহারে শ্রমিকদের বোনাস, বার্ষিক ছুটি ভাতা, বেতনসব উৎসব ভাতা, অসুস্থতাজনিত ভাতা ইত্যাদিও বাড়বে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, আগামীকাল থেকে শ্রমিকদের সবাইকে কাজে যোগ দেয়ার জন্য বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক শুরু হয় শনিবার বিকাল চারটায়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে বৈঠক চলে।
গত ৯ই অগাস্ট থেকে দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে চা বাগানগুলোর প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। শ্রমিকেরা বলছেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতির যে অবস্থা তাতে দৈনিক ১৪৫টাকা মজুরি তাদের জন্য একেবারেই পর্যাপ্ত নয়।
সে সময় প্রতিদিন দু'ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করলেও, ১৩ই অগাস্ট থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
এর আগে স্থানীয় প্রশাসন ও শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের চা শ্রমিক নেতাদের বৈঠকের পর ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা দৈনিক মজুরি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু শ্রমিকদের একটি অংশ তাতে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও বেশিরভাগ শ্রমিক তাতে রাজি হননি। সাধারণ শ্রমিকদের চাপে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ।
পরবর্তীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মজুরি সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে শ্রমিকদের একটি অংশ পুরনো ১২০ টাকা মজুরিতেই আপাতত কাজে ফিরেছেন। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মজুরির বিষয়টি নির্ধারিত হবে বলে জানানো হয়।
তবে এই ঘোষণার পরেও শ্রমিকর আরেকটি অংশ সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কাজে ফিরতে রাজি হননি।
এমন প্রেক্ষাপটে চা শ্রমিকদের ইস্যুতে শনিবার বাগান মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
যে কারণে মজুরি নিয়ে বিরোধ
শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সর্বশেষ ২০২০ সালে যখন চা শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বাগান মালিকদের সংগঠন চা সংসদ মজুরি নিয়ে চুক্তি করেছিল, সেসময় মজুরি বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। সে প্রতিশ্রুতি ১৯ মাসেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শ্রমিকরা মানবেতন জীবনযাপন করছেন।
তবে মালিকদের সংগঠন বলছে, ৩০০ টাকার প্রতিশ্রুতি কখনো দেয়া হয়নি। তাদের কথা, শ্রমিকদের আবাসন, রেশনসহ যেসব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়, তার অর্থমূল্য চারশো টাকার চেয়ে বেশি।
তবে মালিকদের এই যুক্তি মানতে রাজি নন শ্রমিকরা।

ছবির উৎস, Getty Images
চা বাগানের শ্রমিক সীমা মাহালী বিবিসি বাংলাকে বলেন,''না হয় বাগানের জমিতে থাকি, কিন্তু ঘরের মেরামতের খরচ আমাদের। কাপড় কিনতে হয়, বাচ্চাদের পড়ালেখা করাতে হয়, চাল, ডাল সবজি কিনতে হয়। এই ১২০ টাকায় কি এতো কিছু হয়?''
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের চা বাগান গুলোয় প্রতিদিন ১২০ টাকা দৈনিক মজুরির বাইরে সপ্তাহে সাড়ে তিন কেজি চাল বা আটা রেশন হিসাবে দেয়া হয়। এছাড়া বাগানের জায়গায় থাকার জন্য বাঁশ, কাঠ, টিন আর এককালীন ৪/৫ হাজার টাকা দেয়া হয়, তবে ঘর শ্রমিকদের নিজেদের তুলে নিতে হয়।
সাধারণত একজন চা শ্রমিককে প্রতিদিন অন্তত ২০ কেজি চা পাতা সংগ্রহ করতে হয়। চারা গাছ হলে অন্তত ১৬ কেজি পাতা সংগ্রহ করতে হয়। এর বেশি সংগ্রহ করতে পারলে কেজি প্রতি চার থেকে পাঁচ টাকা বাড়তি পাওয়া যায়।
ব্রিটিশ ভারতের বাংলাদেশ অংশে প্রথম বাণিজ্যিক-ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয় সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানে ১৮৫৪ সালে।
বাংলাদেশ চা উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, দেশে চা বাগান রয়েছে ১৬৭টি। এর বড় অংশটি সিলেট, হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজার এলাকায় অবস্থিত। আর এসব বাগানে শ্রমিক রয়েছে এক লাখ ৪০ হাজারের মতো।









