হাসিনা-ওয়াং ই বৈঠক: 'এক চীন' নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সাহায্য চেয়েছে

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই কে বিদায় জানাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন

ছবির উৎস, PID

ছবির ক্যাপশান, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই কে বিদায় জানাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইকে বাংলাদেশ আশ্বাস দিয়েছে দিয়েছে তারা এক চীন নীতিতে বিশ্বাস করে এবং সেই নীতির কোন পরিবর্তন হয়নি।

তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সফরের পরে ঐ দ্বীপ নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া হওয়া উত্তেজনার মাঝে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ঢাকায় এসে বাংলাদেশের সরকারি নেতাদের সাথে কথা বলেন।

রোববার সকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে চীনা মন্ত্রী তাইওয়ানের প্রসঙ্গ ওঠালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকের 'এক চীন' নীতির প্রশ্নে অটল থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়।

বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী হাসিনার প্রেস সচিব এহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন,''তাইওয়ান ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে চীনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চীনের সাথে বন্ধুত্বকে মূল্য দেয় বাংলাদেশ এবং এক চীন নীতিতে বিশ্বাস করে।''

স্বশাসিত তাইওয়ান নিজেদের সার্বভৌম বলে দাবি করলেও চীন ওই দ্বীপকে নিজেদের অংশ বলে মনে করে।

এর আগে, ওয়াং ই ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ কে আব্দুল মোমেনের মধ্যে বৈঠকেও তাইওয়ান প্রসঙ্গ উঠলে ঢাকার 'এক চীন' নীতি অব্যাহত রাখার ব্যাপারে চীনা মন্ত্রীকে আশ্বাস দেওয়া হয় বলে জানানো হয়েছে।

দুপুরে মি ওয়াং-এর মঙ্গোলিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার আগে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে চারটি চুক্তি এবং সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে সহযোগিতা, পিরোজপুরের কচা নদীর ওপর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রি সেতুর হস্তান্তর, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও শিক্ষা সহযোগিতা।

রোহিঙ্গা ইস্যু এবং চীন

ঢাকায় নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থান তুলে ধরা এবং এ ব্যাপারে ঢাকার সমর্থন নিশ্চিত করার দিকেই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার এই সফরে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন।

তাইওয়ান ছাড়াও বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অনেকগুলো ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন

ছবির উৎস, PID

ছবির ক্যাপশান, তাইওয়ান ছাড়াও বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অনেকগুলো ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন

তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অবকাঠামো নির্মানে অব্যাহত সহযোগিতার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন নিয়ে চীনের সাহায্য চাওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে চীনকে আরো জোরালো ভূমিকা নেয়ার জন্য চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এহসানুল করিম জানান বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেছেন বাংলাদেশের জন্য বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা বাড়তি বোঝা হয়ে উঠেছে এবং এই সমস্যা সমাধানে তিনি চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন।

জবাবে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চীন আশা করে বাংলাদেশ আর মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে। তবে, মি ওয়াংকে উদ্ধৃত করে মি. করিম বলেন, "যদি তৃতীয় কোন পক্ষের অংশ নেয়ার দরকার হয়, চীন তার ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত আছে।''

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য ঘরবাড়ি বানানো হচ্ছে বলেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন চীনা মন্ত্রী।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, ''রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। চীন বলেছে যে, তারা চেষ্টা করছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীন চ্যালেঞ্জগুলোর জন্য শুধু বাংলাদেশের নয় অনেকেরই সমস্যা হচ্ছে। বুঝতে পারছেন সমস্যাগুলো কী।'' ''আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এটা খুব জোরালোভাবে বলেছেন যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের সহযোগিতা প্রয়োজন," বলেন প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

তাইওয়ান ইস্যুতে বাংলাদেশ ও চীনের যে আলোচনা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের সাথে বৈঠকে চীনা মন্ত্রী তাইওয়ান সংকট নিয়ে তার দেশের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।

সে প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, "তিনি (ওয়াং ই) বলেন এটা তাদের ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্সে..রিসেন্টলি আমার (চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর) দেশের একটা অংশকে উস্কানিমূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে আমার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, এটা তো গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি (চীনা মন্ত্রী) তির্যকভাবে বলেছেন, বিভিন্ন দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী লোকজন আছে, তাদের যদি উৎসাহিত করা হয়, তাহলে দুনিয়ার কোথাও শান্তি থাকবে না।''

''আর এই বিচ্ছিন্নতাবাদী উস্কানির মূলে রয়েছে, যেটা উনি বলেছেন, ওনাদের যে উন্নয়ন হচ্ছে তাতে অনেকেই অসন্তুষ্ট," বলেন আব্দুল মোমেন।

তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সফরের পর আবার নতুন করে উত্তেজনার তৈরি হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সফরের পর আবার নতুন করে উত্তেজনার তৈরি হয়েছে।

ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং ফেসবুকে এক পোস্ট দিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন যে, বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ অব্যাহতভাবে 'এক চীন মতাদর্শ' মেনে চলবে। চীনা রাষ্ট্রদূত আরও লিখেছেন, আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি রক্ষায় চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ একসাথে কাজ করবে বলে তারা আশা করেন।

বাংলাদেশ সবসময়ই এক চীন নীতি অনুসরণ করেছে।

তাইওয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বা আনুষ্ঠানিক কোন সম্পর্ক না থাকলেও সেখান থেকে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৮৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়ে থাকে। তবে চীন থেকে আমদানি হয় ১৩০০ কোটি ডলার।

চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শহরিয়ার আলম বলেন, বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ব্যাপারেও চীনকে বলা হয়েছে এবং চীনা মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশের আরো কটি পণ্য চীনের বাজারে শুল্ক মুক্ত আমদানির সুবিধা পাবে।।

''আমাদের দ্বিপাক্ষিক ইস্যুর মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে বাণিজ্য। চায়না থেকে আমরা সবচেয়ে বেশি জিনিস কিনি। আমাদের রপ্তানি সেই তুলনায় অত্যন্ত কম," মন্ত্রী বলেন।

চীন থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর ১৩০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি হয় মাত্র ৬০ কোটি ডলার।

''আমরা বলেছি, এই বিরাট ব্যবধান কমাতে হবে। সেজন্য আমাদের বিভিন্ন সুপারিশ...তারা আমাদের ৯৭ শতাংশ আইটেমে ডিউটি ফ্রি সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইটেম তার মধ্যে পড়ে না। আমরা বলেছি, সেই আইটেমগুলো ডিউটি ফ্রি কোটায় ঢোকাতে হবে। যেমন গার্মেন্টস, সবজি, ফার্মাসিউটিক্যালস- আমরা এগুলো উল্লেখ করেছি। চীনা মন্ত্রী রাজি হয়েছেন। ''

পহেলা সেপ্টেম্বর থেকেই এসব সুবিধা পাওয়া যাবে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে চারটি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে

ছবির উৎস, PID

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে চারটি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দক্ষ জনশক্তি ব্যবহার, বাংলাদেশে বিনিয়োগ আরও বাড়ানো, বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রীদের দ্রুত শিক্ষার্থী ভিসা দেয়ার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। সেই সঙ্গে চীন-বাংলাদেশের মধ্যে বিমান চলাচল আরও বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

২০১৬ সালে যখন চীনের প্রেসিডেন্ট শী জিনপিং বাংলাদেশে আসেন, তখন ২৭টি সমঝোতায় স্বাক্ষর করেছিল দুই দেশ। সেসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।