শ্রীলংকা: গোটাভায়া রাজাপাকশা অবশেষে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ইস্তফা দিলেন

গোটাভায়া রাজাপাকশা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গোটাভায়া রাজাপাকশা গত কয়েক মাস ধরে পদত্যাগের দাবি অগ্রাহ্য করেছেন। এখন তিনি দেশের বাইরে পৌঁছে পদত্যাগ করলেন
    • Author, জুবাইদা আবদুল জলিল ও সাইমন ফ্রেজার
    • Role, বিবিসি নিউজ

শ্রীলংকায় বহুদিন ধরে সরকার বিরোধী বিক্ষোভের পর পার্লামেন্টের স্পিকার জানিয়েছেন, তিনি শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট গোটাভায়া রাজাপাকশার পদত্যাগপত্র পেয়েছেন। তবে একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই পদত্যাগপত্র এবং এর আইনগত বৈধতা যাচাই করে দেখার দরকার আছে, কারণ পদত্যাগপত্রটি ইমেইলে পাঠানো হয়েছে।

শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট গোটাভায়া রাজাপাকশা মালদ্বীপ থেকে সৌদি এয়ারলাইন্সের বিমানে আজ বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরে নেমেছেন।

শ্রীলংকায় দেশের নেতা হিসাবে বিচারের দায় থেকে অব্যাহতি পাবার সুযোগ প্রেসিডেন্টের রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে তিনি নতুন প্রশাসনের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া এড়াতে পদত্যাগ করার আগেই শ্রীলংকা ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, যাতে সেই সুযোগ প্রেসিডেন্ট হিসাবে তার থাকে।

দেশটির চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট সামাল দিতে তার প্রশাসনের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভের মুখে শ্রীলংকা ছেড়ে পালান গোটাভায়া রাজাপাকশা।

প্রেসিডেন্ট রাজাপাকশা মঙ্গলবার রাতে সামরিক বিমানে দেশ ছেড়ে পালানোর পর তিনি কোথায় যাচ্ছেন বা কোন দেশে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় চাইতে পারেন তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা চলছে।

সিঙ্গাপুর সরকার বলছে তারা তাকে "ব্যক্তিগত সফরের জন্য সেদেশে ঢোকার অনুমতি" দিয়েছে। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছেন, "মি. রাজাপাকশা সেদেশে আশ্রয় চাননি বা তাকে কোন আশ্রয়ও দেয়া হয়নি।"

সিঙ্গাপুরগামী সৌদিয়া বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারে প্রেসিডেন্ট গোটাভায়া রাজাপাকশা সেদেশে নেমেছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলবার মালদ্বীপ পালিয়ে যাবার পর মি. রাজাপাকশা সেখান থেকে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরে গিয়ে নেমেছেন
Presentational grey line

সিঙ্গাপুর বা অন্য দেশে আশ্রয়ের সম্ভাবনা কতটা?- বিশ্লেষণ

অনেকেরই এখন প্রশ্ন যে গোটাভায়া রাজাপাকশা এর পর কোন দেশে পালানোর পরিকল্পনা করছেন? কিন্তু তার থেকেও বড় প্রশ্ন কোন দেশ তাকে আশ্রয় দেবে?

কলম্বো থেকে বিবিসির একজন সংবাদদাতা টেসা ওয়ং বলছেন মধ্য প্রাচ্যে যাবার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি ট্রানজিট হিসাবে সিঙ্গাপুরে গেছেন কিনা, কিংবা তিনি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ারই কোন দ্বীপরাষ্ট্রে থাকতে চাইছেন কিনা বা চাইলে কতদিন বাইরে থাকার পরিকল্পনা করছেন কিছুই এখনও স্পষ্ট নয়।

তবে সিজ ওয়ং বলছেন যে সিঙ্গাপুর সরকার বেশিদিন তাকে সেদেশে থাকতে দেবে বলে সন্দেহ রয়েছে।

তারা অতীতে রবার্ট মুগাবে, কিম জং আন ও থিয়েন সিয়েনের মত বিতর্কিত ব্যক্তিদের আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু মি. রাজাপাকশা যার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে এবং দেশের চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে তিনি দেশ ছেড়ে পালানোয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেহেতু এখন তিনি ব্যাপকভাবে সমালোচিত, ফলে তাকে আশ্রয় দিয়ে সিঙ্গাপুর সমালোচনার মুখে পড়তে চাইবে না বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সিঙ্গাপুর সরকার এধরনের সিদ্ধান্ত নিলে দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হবে যেটা কর্তৃপক্ষকে সামাল দিতে হবে বলে বলছেন বিশ্লেষকরা। সিঙ্গাপুরের জনগণ সাম্প্রতিক কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সরব হয়ে উঠেছেন এবং খোলাখুলি মত প্রকাশ করছেন বলে দেখা গেছে।

এছাড়াও সিঙ্গাপুরে প্রচুর তামিল রয়েছে যাদের অনেকেই শ্রীলংকান বংশোদ্ভুত।

মি. রাজাপাকশা যখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন তখন দেশটির গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার তামিলকে হত্যার নির্দেশ দেবার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কাজেই সিঙ্গাপুর তাকে দীর্ঘমেয়াদে আশ্রয় দিয়ে নতুন সমস্যা ডেকে আনতে চাইবে না বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

Presentational grey line
মি. রাজাপাকশার পদত্যাগের ঘোষণায় কলম্বোয় উচ্ছ্বসিত বিক্ষোভকারীরা

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, মি. রাজাপাকশার পদত্যাগের ঘোষণায় কলম্বোয় উচ্ছ্বসিত বিক্ষোভকারীরা

শ্রীলংকায় সর্বশেষ পরিস্থিতি

চলমান বিক্ষোভ দমন করতে শ্রীলংকার অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট রানিল বিক্রমেসিংহে আজ দ্বিতীয় দিনের মত দেশটিতে কারফিউ জারি করেছেন।

কারফিউ দেয়া হয়েছে স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা থেকে কাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত।

তবে গোটাভায়া রাজাপাকশার পদত্যাগের খবরকে স্বাগত জানিয়েছেন কলম্বোর বিক্ষোভকারীরা। তাদের রাস্তায় নৃত্য করতে দেখা গেছে।

ভিডিওর ক্যাপশান, শ্রীলঙ্কায় জ্বালানির দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে করতে মৃত্যু

খবর পাওয়া যাচ্ছে যে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা দখল করে রাখা কোন কোন সরকারি ভবন ছেড়ে চলে যেতে শুরু করেছে।

কলম্বো থেকে বিবিসির একজন সংবাদদাতা জানাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেছে এবং সেখানে এখন নিরাপত্তা বাহিনী ঢুকেছে।

তবে বিক্ষোভকারীরা জানাচ্ছেন দেশের গভীর অর্থ সঙ্কটের মুখে তারা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাবে।

রানিল বিক্রমেসিংহেকেও অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট পদে প্রত্যাখ্যান করছেন দেশটির বিক্ষোভকারীরা এবং তার পতক্যাগের দাবিতে গতকাল কলম্বো ও তার আশপাশে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভে একজন নিহত এবং ৮৪জন আহত হয়েছে।

কলম্বোয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ফটক ভেঙে ভেতর ঢোকার চেষ্টার সময় বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কলম্বোয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ফটক ভেঙে ভেতর ঢোকার চেষ্টার সময় বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে

রাজনৈতিক শূন্যতা

প্রেসিডেন্ট রাজাপাকশা দেশ ছেড়ে পালানোর পর ক্ষমতায় একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

দেশটির অর্থনীতিতে যে নজিরবিহীন ধস নেমেছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটা সচল সরকার প্রয়োজন।

একটা নতুন ঐক্যমতের সরকার গঠনের জন্য অন্যান্য দলের রাজনীতিকরা আলোচনা করছেন তবে এখনও তারা কোনরকম সমঝোতার কাছাকাছিও পৌঁছননি।

এছাড়া তারা সমাধানের যে ফর্মূলা দেবেন তা জনগণ কতটা মেনে নেবে সেটাও পরিষ্কার নয়।

ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট, রানিল বিক্রমেসিংহে শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তবর্র্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে পারবেন না।

শপথ গ্রহণের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদকে তার নিয়োগ অনুমোদন করতে হবে। এমপিরা তাকে অনুমোদন না দিলে তাদের নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য ভোট দিতে হবে।