বন্যা: সিলেটের সাথে সড়ক, রেল ও আকাশপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, শহরে ডাকাত পড়ার গুজব

ছবির উৎস, Getty Images
উজান থেকে আসা পানি ও টানা চারদিনের বৃষ্টিপাতের কারণে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের জেলা সিলেটের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও টেলিযোগাযোগ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে সুনামগঞ্জ জেলা থেকে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
জেলা প্রশাসক সীমিত আকারে মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু হয়েছে বলে দাবি করলেও, সুনামগঞ্জের কয়েকজন বাসিন্দার সাথে চেষ্টা করে তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম যেসব খবর দিচ্ছে তাতে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় এক ধরণের মানবিক বিপর্যয় তৈরি হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সিলেটের সাংবাদিকেরা জানাচ্ছেন, সিলেট থেকে সাধারণ মানুষের সুনামগঞ্জ যাওয়ার কোন উপায় নেই। শুধু উদ্ধারকর্মী ও ত্রাণকর্মীরা নৌকাযোগে যেতে পারছেন সেখানে।
সিলেটের পরিস্থিতি:
ঢাকাসহ অন্যান্য জেলার সাথে যোগাযোগের মুল সড়ক ও রেললাইন পানিতে ডুবে গেছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মজিবর রহমান।
তিনি জানিয়েছেন, গতকাল বিকেল থেকে কোন যানবাহন জেলা থেকে বের হতে পারছে না। জেলার ৬০ শতাংশ এখন পানির নিচে।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেল স্টেশনের কার্যক্রম এখনো বন্ধ রয়েছে।
ওসমানী হাসপাতালে নিচের তলায় পানি ওঠায় চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। রোগীসহ সকল কার্যক্রম উপরের তলায় সরিয়ে নিতে হয়েছে।
সিলেটের হযরত শহাজালালের দরগাহ প্রাঙ্গণে পানি জমে গিয়েছিল শনিবার।
তবে স্থানীয় সাংবাদিক আনিস রহমান বিবিসিকে জানাচ্ছেন, রবিবার হাসপাতাল ও দরগাহ প্রাঙ্গণ থেকে পানি সরে গেছে।
শহর থেকেও পানি নামতে শুরু করেছে বলে জানান তিনি।
মূলতঃ টানা চারদিনের অতিবৃষ্টির কারণেই পানি জমে গিয়েছিল বলে উল্লেখ করছিলেন তিনি।
জেলা প্রশাসক জানাচ্ছেন, জেলায় টানা চারদিন বৃষ্টির পর রবিবার ভোরের দিকে থেকে বৃষ্টি কমে এসেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
সিলেটে টিলা ধসের ঘটনাও ঘটেছে বলে উল্লেখ করছিলেন জেলা প্রশাসক মি. রহমান।
এতে কোন হতাহতের ঘটনা না থাকলেও তারা সাধারণ মানুষজনকে সাবধান হতে বলছেন।
সুনামগঞ্জের পরিস্থিতি
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন জানিয়েছেন, শহর থেকে পানির উচ্চতা কিছুটা কমলেও জেলার ৯০ শতাংশ এখনো পানির নিচে।
জেলার ৭০ হাজারের মতো মানুষ দুইশ কুড়িটি আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছেন।
হাওর ও অন্যান্য প্রত্যন্ত অংশে যারা নিরাপদ দূরত্বে এখনো সরে আসতে পারেননি বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে সেনাবাহিনী।
শুক্রবার মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর সেখানে বিশেষ ব্যবস্থায় সীমিত যায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সিলেটে ডাকাত পড়ার গুজব
সামাজিক মাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারীর পোস্ট থেকে জানা যাচ্ছে সিলেটে মধ্যরাতে ডাকাত আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল।
স্থানীয় সাংবাদিকেরা জানাচ্ছেন, বন্যার পানিতে আটকে থাকা শহরবাসী মধ্যরাতে হঠাৎ বিভিন্ন পাড়ার মসজিদে ঘোষণা শোনেন, শহরে ডাকাত পড়েছে।
অনেকের মোবাইল ফোনেও ডাকাতি সম্পর্কিত সতর্কবার্তা সম্বলিত মেসেজ আসে।
এমন পরিস্থিতিতে শহরবাসী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
তবে পুরো বিষয়টিকেই গুজব বলে উল্লেখ করেন সিলেটে এনটিভির ভিডিও সাংবাদিক আনিস রহমান।
তিনি বলেন, "আমরা খোঁজ নিয়েছি, কিন্তু কোথাও ডাকাতি হয়েছে, এমন কোন প্রমাণ আমরা পাইনি"।

ছবির উৎস, Getty Images
বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা
আক্রান্ত জেলাগুলোতে সবমিলিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের মেঘালয়, চেরাপুঞ্জি ও আসামে ক্রমাগত বৃষ্টি হওয়ায় কারণে বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া জানিয়েছেন, সুরমা বাদে দেশের সকল প্রধান নদ ও নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আরও বাড়বে কারণ উজানে এখনো বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, উজান থেকে এখনো পানি প্রবেশ করছে। যার ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে যমুনার পানি। ধরলা ও সুরমা নদীর পানিও এখনো বিপদসীমার উপরে রয়েছে।
সারা দেশে ১০৯টি নদী পর্যবেক্ষণ স্টেশন রয়েছে। তার মধ্যে ৯১টি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে।
সিলেটে কুড়ি বছরের মধ্যে এই পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়নি বলে জানাচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বৃষ্টি কিছুটা কমে এলেও অবস্থার এখনি উন্নতি হবে না বরং উজান থেকে আসা পানির কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
বন্যা ছড়িয়ে পড়তে পারে জামালপুর, বগুড়া, শেরপুর, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ও পাবনা জেলাতে।
তবে সিলেটের সাংবাদিক আনিস রহমান বলছেন, শহর থেকে পানি নেমে যেতে শুরু করেছে।








