সীতাকুণ্ড অগ্নিকাণ্ড: কন্টেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণে আহতদের বেশিরভাগের শ্বাসনালী ধোঁয়ায় আক্রান্ত

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শাহনাজ পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গতরাতে কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে যারা আহত হয়েছেন তাদের অধিকাংশের শ্বাসনালী আগুনের ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, সেখানে এখন ৪৭ জন ভর্তি রয়েছেন। বাকিদের চট্টগ্রামের জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ও ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ডা. আহমেদ জানিয়েছেন সেখানে আহত যারা ভর্তি হয়েছেন তাদের শরীর ৭০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়েছে এবং আহতদের সকলের শ্বাসনালী ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয়েছে।
তিনি বলছেন, "শ্বাসনালী ধোঁয়ায় আক্রান্ত হওয়া খুবই গুরুতর বিষয়। এই ধরনের রোগী সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবে কুড়ি জনের অবস্থা বেশি খারাপ। শ্বাসনালী প্রচণ্ড গরম ধোঁয়ায় আক্রান্ত হলে যেটা হয় -শ্বাসনালী ফুলে যায়, অক্সিজেন ঢুকতে পারে না। রোগী শ্বাস নিতে পারে না। পরবর্তী পর্যায়ে শ্বাসনালীতে ইনফেকশনের বড় সম্ভাবনা থাকে। ফুসফুস আক্রান্ত হয়।"

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি জানিয়েছেন, ধোঁয়ায় চোখেরও ক্ষতি হয়। আগুনের ধোঁয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কণ্ঠস্বর খসখসে হয়ে যায় আর ধোঁয়ার সাথে সূক্ষ্ম বস্তু ফুসফুসে প্রবেশ করে ফুসফুসের ক্ষতি করে। রোগী ঠিক মতো শ্বাস নিতে না পারার কারণে রক্তে অক্সিজেন কম পৌছায়। যার ফলে মানসিক বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
তবে তারা রাসায়নিকে পুড়ে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিচ্ছেন বলে তিনি জানান।
হাসপাতালে হিমশিম অবস্থা
হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ শামীম আহসান জানিয়েছেন গত রাত থেকে অ্যাম্বুলেন্স ও অটোরিকশায় করে একের পর একের আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে আনা হতে থাকে। পুরো হাসপাতালের চিত্র পাল্টে যায়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে ছয়জন চিকিৎসক রয়েছেন। হাসপাতালে একসাথে এত অগ্নিদগ্ধ রোগী ভর্তি হওয়ার কারণে এখন পুরো হাসপাতালে যত বিভাগ রয়েছে সব বিভাগের ডাক্তার ও নার্স বার্ন ইউনিট কাজ করছেন।
সকাল থেকে আহত ব্যক্তিদের রক্ত দিতে অনেকেই সেখানে হাজির হন।
আহতদের মধ্যে বেশিরভাগই মূলত ডিপোতে মাল নিয়ে যাওয়া কন্টেইনার বহনকারী গাড়ির চালক, হেলপার ও শ্রমিক।

ছবির উৎস, Getty Images
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহসান জানিয়েছেন সেখানে এপর্যন্ত ১০২ জনকে ভর্তি করা হয়েছিল। অগ্নিদগ্ধ ছাড়াও অনেকে বিস্ফোরণের সময় ছিটকে আসা নানা বস্তু দ্বারা মাথাসহ শরীরের নানা অঙ্গে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে হাত কেটে ফেলতে হয়েছে এমন আহত ব্যক্তিও রয়েছেন।
এখন সবমিলিয়ে ৭০ জনের মতো নানা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানাচ্ছেন, আরও ৪ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহত দমকল কর্মীদের চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, সিএমএইচে ভর্তি করা হয়েছে। পনের জন দমকল কর্মী আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত ছয়জন দমকল কর্মীকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। গুরুতর আহতদের ঢাকায় সিএমএইচ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে।
হাসপাতালে এপর্যন্ত ৩৯ টি মরদেহ এসে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহসান। নিহতদের মধ্যে অন্তত ছয়জন দমকল কর্মী রয়েছেন যারা সীতাকুণ্ড এবং কাছের কুমিরা ফায়ার স্টেশনের দমকল কর্মী ছিলেন। ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের খবর আসার পর তারাই সেখানে প্রথম গিয়েছিলেন এবং বিস্ফোরণের সময় খুব কাছে থেকে আগুন নেভানোর কাজ করছিলেন।
একসঙ্গে এত দমকল কর্মী মারা যাওয়ার ঘটনা কাছাকাছি সময়ে ঘটেনি।
আহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য রয়েছেন অন্তত ১০ জন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
বিএম ডিপো নামের ওই কন্টেইনার টার্মিনালটি সীতাকুণ্ড থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে কদমরসুল এলাকায় অবস্থিত। শনিবার রাত নটার দিকে আগুন লাগার চল্লিশ মিনিটের মাথায় রাসায়নিক থেকে সেখানে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়।
বিস্ফোরণে মালবাহী কন্টেইনারগুলো দুমড়ে মুচড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। পরপর বেশ ক'টি বিস্ফোরণ হয়।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে সেসময় লাইভ করছিলেন অনেকে। যার মধ্যে একটি ভিডিও ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে বেশ দূর থেকে দমকল কর্মীদের আগুন নেভানোর দৃশ্য ভিডিও করা হচ্ছে। এক পর্যায়ে শোনা যায় বিকট শব্দ এবং দেখা যায় রাতের আকাশে জ্বলে ওঠা আগুন। আর মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার হয়ে যায় স্ক্রিন, শোনা যায় মানুষের গোঙানি ও আগুনের শোঁশোঁ শব্দ।
স্থানীয় গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে যে ব্যক্তি এই ফেসবুক লাইভ করছিলেন তিনি নিজেও নিহত হয়েছেন।
ডিপোটির আশপাশের বাসিন্দারা বলছেন, বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠেছিল আশপাশের পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত। ডিপোটির পাশেই কদমরসুলের কাশেম জুট মিল গেট নামে পরিচিত এলাকা। সেখানকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে সরে যাবার জন্য মাইকিং করা হচ্ছিল স্থানীয় মসজিদ থেকে।

ছবির উৎস, Getty Images
'একটু বাদে বাদে বিস্ফোরণ'
এই মসজিদের কাছেই বাড়ি সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফাতেমা বেগমের। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, ডিপোতে আগুন লাগার খবর পেয়েছিলেন প্রায় সাথে সাথেই। বাড়ি থেকেই দেখতে পাচ্ছিলেন আগুনের লেলিহান শিখা। তখনো পরিবারের সাথে বাড়িতেই ছিলেন ১৬ দিন আগে সন্তান জন্ম দেয়া ফাতেমা বেগম।
এরই মধ্যে আশপাশের বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে বলার ঘোষণা দিয়ে স্থানীয় মসজিদে মাইকিং করা শুরু হয়।
"কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টা পর ভয়াবহ একটা শব্দ হয়, বুমম করে একটা শব্দ হয়, সব কিছু কেঁপে ওঠে। এরপর একটু বাদে বাদে বিস্ফোরণের শব্দ হতে থাকে। তখন আমরা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই," বর্ণনা করছিলেন ফাতেমা বেগম।
"ভয় পেয়ে আমরা সবাই বাড়ি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যাই। খালি আমরা না, সবাই ছোটাছুটি শুরু করে।"
বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে এক আত্মীয়ের বাড়ি চলে যান সদ্যজাত শিশুকে নিয়ে, এখনো সেখানেই আছেন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা।

ছবির উৎস, Getty Images
বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন ঘটনাস্থল থেকে ২ কিলোমিটার দূরের বাড়ি রোজিনা আক্তার। তিনি বলছিলেন, "প্রায় দুই তিন মিনিট মাটি কেঁপেছে। আমরা ভেবেছিলাম বোমা বিস্ফোরণ বা ভূমিকম্প হচ্ছে।"
সর্বশেষ আর যা জানা যাচ্ছে
ডিপোতে আমদানি হয়ে আসা এবং রপ্তানি-মুখি প্রচুর মালবাহী কন্টেইনার ছিল। যার মধ্যে রাসায়নিক পদার্থও ছিল।
ডিপোটিতে 'হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড' নামের একটি রাসায়নিকে আগুন লেগেছে বলে নিশ্চিত হয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
ওই রাসায়নিক এখন আশপাশের ড্রেনে ছড়িয়ে পড়েছে। রাসায়নিক যেন আশপাশে জলাধার ও সমুদ্রে আরো ছড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে কাজ চলছে। বালুর বস্তা দিয়ে দুটি ড্রেন আটকে দেয়া হয়েছে।
আশপাশে বাতাসে ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে চারিদিক। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মানুষজন। আশপাশের মানুষজনকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ছবির উৎস, Getty Images
ট্রানজিট পয়েন্ট
চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর আগে রপ্তানি পণ্য এবং আমদানি হয়ে আসা মাল খালাস হওয়ার পর 'ট্রানজিট পয়েন্ট' হিসাবে কন্টেইনার রাখার জন্য ডিপোটি ব্যবহৃত হয়।
ঘটনাস্থল থেকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মাইন উদ্দিন জানিয়েছেন মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও প্রায় কুড়ি ঘণ্টা পরও পুরোপুরি আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি।
দিনের বেলায়ও বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ হয়েছে। একারণে আগুন নেভাতে সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দমকল বাহিনীর মহাপরিচালক। বিকেলের পরও কিছু জায়গায় আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।
কী পরিমাণ রাসায়নিক সেখানে মজুদ ছিল সেই তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে।









