ইউক্রেন যুদ্ধের ১০০ দিন: রাশিয়া কি এখন 'বিজয়' ঘোষণা করতে পারে?

ডনবাস অঞ্চলে ইউক্রেনীয় অবস্থানের দিকে রকেট ছুঁড়ছে রুশ-সমর্থক যোদ্ধারা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ডনবাস অঞ্চলে ইউক্রেনীয় অবস্থানের দিকে রকেট ছুঁড়ছে রুশ-সমর্থক যোদ্ধারা

ইউক্রেনে রুশ অভিযানের ১০০ দিন পার হচ্ছে। এই যুদ্ধ এখন ঠিক কি অবস্থায় আছে - তার অনেকখানি ধারণা পাওয়া যেতে পারে নিচের তিনটি উক্তি থেকে।

এক. ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলছেন, তার দেশের ২০ শতাংশ ভূখণ্ড এখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে।

দুই. যুক্তরাজ্যের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ তাদের সবশেষ মূল্যায়নে বলছে, রাশিয়া এখন পূর্ব ডনবাসে কৌশলগত সাফল্য পাচ্ছে, যদিও এর জন্য তাকে প্রচুর মূল্য দিতে হচ্ছে।

তিন. নেটোর প্রধান ইয়েন্স স্টলটেনবার্গ অন্যদিকে বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন 'ওয়ার অব অ্যাট্রিশন' বা 'দাঁতে দাঁত চেপে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া'-র অবস্থায় উপনীত হয়েছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য' তৈরি হতে হবে।

রাশিয়ার সাফল্য

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের মূল্যায়নে বলছে, ডনবাস দখলের যুদ্ধে রাশিয়া এখন নিয়ন্ত্রক অবস্থানে আছে বলেই মনে হচ্ছে, তারা লুহানস্ক অঞ্চলের ৯০ শতাংশ ভূখণ্ডের দখল নিয়ে নিয়েছে, এবং আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই হয়তো তারা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে।

একই সাথে তারা বলছে, এই যুদ্ধের জন্য সৈন্য সমাবেশ করতে গিয়ে তাদের বিপুল মূল্যও দিতে হয়েছে।

আরও পড়তে পারেন:

সাঁজোয়া যানে করে যাচ্ছে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সাঁজোয়া যানে করে যাচ্ছে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা

কী ছিল রাশিয়ার মূল উদ্দেশ্যগুলো?

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরো বলছে যে যুদ্ধ শুরুর সময় রাশিয়ার যে মূল উদ্দেশ্যগুলো ছিল - সেগুলোর একটিও আসলে অর্জিত হয়নি।

তারা বলছে মস্কো চেয়েছিল, শুরুতেই তারা ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ এবং ইউক্রেনীয় সরকারের কেন্দ্রগুলো দখল করে নেবে।

কিন্তু ইউক্রেনীয় বাহিনীর তীব্র প্রতিরোধ তাদের সেই প্রয়াস ব্যর্থ করে দেয়।

অভিযান শুরুর প্রথম ২৪ ঘন্টার মধ্যে রুশ বাহিনী কিয়েভের নিকটবর্তী হস্টোমেল বিমানঘাঁটিটির দখল নিতে পারেনি। এর পরিণতিতে তাদের আক্রমণ ঠেকিয়ে রুশ বাহিনীকে পেছনে ঠেলে দেয় ইউক্রেনীয়রা।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা দফতর বলছে, রুশ বাহিনী তাদের পরিকল্পনা তৈরি করেছিল অনেকগুলো ভুল অনুমানের ভিত্তিতে। তা ছাড়া তাদের কৌশলগত পদক্ষেপগুলোও তারা ঠিক ভাবে নিতে পারেনি।

কিন্তু রাশিয়া অবশেষে কিয়েভ দখলের আশা ত্যাগ করে, এবং ইউক্রেনের দক্ষিণপূর্বে ডনবাসের দিকে তাদের যুদ্ধপ্রয়াসকে পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত করে। আর এর পরই যুদ্ধের চেহারাটা ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে।

ডনবাসের ক্রামাটরস্ক শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ডনবাসের ক্রামাটরস্ক শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবন

এখানে রুশ বাহিনী ডনবাসে মনোনিবেশ করার পরই তাদের যুদ্ধপ্রয়াসে গতিসঞ্চার হয়, এবং এখন তারা ইউক্রেনীয় প্রতিরোধকে দমন করতে সক্ষম হয়েছে।

এখন লুহানস্কের ৯০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে রুশরা, পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে আর হয়তো দু'সপ্তাহ লাগবে। অন্যদিকে দোনেৎস্ক অঞ্চলেরও এক বড় অংশ এখন রুশ নিয়ন্ত্রণে ।

রাশিয়ার 'বিজয়?'

যুদ্ধের ১০০ দিনের মাথায় এখনকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য চিত্র তৈরি করেছেন বিবিসির জেমস ল্যানডেল।

সব যুদ্ধেই উত্থান-পতন থাকে, আর এর গতিপথও প্রায় কখনোই সরল হয় না প্রশ্ন হলো, রাশিয়া যদি এ যুদ্ধে জয়লাভ করে - তাহলে কেমন হতে পারে সেই বিজয়?

পশ্চিমা কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, রাশিয়া যদিও ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিতে তেমন সুবিধে করতে পারেনি - কিন্তু রাজধানী কিয়েভ দখল করা এবং ইউক্রেনের অধিকাংশ অঞ্চলকে পদানত করার পরিকল্পনা তারা এখনো করে যাচ্ছে।

"সেই চূড়ান্ত লক্ষ্য রাশিয়া এখনো ত্যাগ করেনি" - বলছেন কর্মকর্তাটি।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওলেক্সেই রেজনিকভ বলছেন যে রাশিয়া এখন প্রলম্বিত যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছে, এবং ইউক্রেনের দক্ষিণ দিকে গড়ে তুলছে কয়েক স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা ইউক্রেনকে এম১৪২ হাই মবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম সরবরাহ করবে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্র দূরপাল্লার এম১৪২ হাই মবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম সরবরাহ করছে ইউক্রেনকে

"রাশিয়া এখন কিছুটা একঘরে হয়ে পড়েছে । তাই যে পরিমাণ ইউক্রেনীয় ভূমি তারা দখল করেছে সেটাকে ধরে রাখার জন্য তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নেবে এবং সেটাই হয়তো আমরা দেখতে পাচ্ছি," - বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সামরিক বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মাহমুদ আলি ।

বিবিসির বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনও হতে পারে যে রাশিয়া হয়তো ডনবাসে তাদের বর্তমান সাফল্যকে কাজে লাগাবে, এবং সেখানে নিজের অবস্থানকে সংহত করার পর বহু সৈন্যকে অন্য জায়গায় যুদ্ধ করতে পাঠাতে পারবে।

পশ্চিমা কর্মকর্তাদের অনুমান, তখন হয়তো আবার কিয়েভ দখলের চেষ্টা করতে পারে রাশিয়া।

একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে রাশিয়ার সৈন্যসংখ্যা বিপুল, আর ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে এ কারণে ভুগতে হবে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এর মধ্যেই স্বীকার করেছেন যে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় একশ' জন ইউক্রেনীয় সৈন্য নিহত হচ্ছে, এবং ৫০০ জন আহত হচ্ছে।

"মি. জেলেনস্কি স্বীকার করছেন যে তার দেশের এক-পঞ্চমাংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আর এই একশ' দিনের মধ্যে মাত্র গত ক'দিন ধরে আমরা পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোতে ইউক্রেনের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে - তার একটা চিত্র পাচ্ছি। এতদিন ধরে আমরা শুধু হিসেব পেয়েছি যে রুশদের কত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে" - বলছিলেন সৈয়দ মাহমুদ আলি ।

পুতিন কি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে পারেন?

এমনও হতে পারে যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হয়তো সবাইকে অবাক করে দিয়ে একতরফাভাবে একটা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে দিতে পারেন।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

ড. সৈয়দ মাহমুদ আলি বলছেন, "সেভেরোদোনেৎস্ক যদি রুশদের হাতে চলে যায়, তাহলে তাদের বলার সুযোগ আসবে যে ডনবাস ও মারিউপোলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার যে লক্ষ্য তাদের ছিল - সেটা অর্জিত হয়েছে। ইউক্রেনীয়রাও হয়তো এখন স্বীকার করে নেবে - যদিও এখনো তারা তা বলছে না - যে যুদ্ধ চলতে থাকতে তাদের খুব বেশি কিছু অর্জন করার থাকবে বলে তারা আর মনে করছে না।"

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনের যে অঞ্চলগুলোতে রাশিয়া দখল কায়েম করেছে এর পর মি. পুতিন 'বিজয় ঘোষণা' করে বলতে পারেন - তার "বিশেষ সামরিক অভিযান" সম্পূর্ণ হয়েছে, ডনবাসের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এখন সুরক্ষিত, ক্রাইমিয়া পর্যন্ত স্থল-করিডোরও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

তাই তিনি আগেভাগেই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে উল্টো ইউক্রেনকেই লড়াই বন্ধ করতে আহ্বান জানাতে পারেন।

"এমন একটা কৌশল রাশিয়া যে কোন সময় নিতে পারে। ইউরোপের দিক থেকে ইউক্রেনের ওপর একটা চাপ আছে যেন তারা শান্তির বিনিময়ে কিছু ভূখন্ড রাশিয়াকে ছেড়ে দেয়। রাশিয়া চাইলে হয়তো এটার সুযোগ নিতে পারে," বলছেন যুক্তরাজ্যের চ্যাটহ্যাম হাউজ গবেষণা কেন্দ্রের রাশিয়া বিশেষজ্ঞ কির জাইলস।

প্যারিস, বার্লিন ও রোমের কূটনৈতিক মহলে এ ধরনের কথাবার্তা ইতোমধ্যেই শোনা গেছে।

কথাটা হলো এরকম যে "যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার কোন দরকার নেই, চলুন সবাই মিলে একটা যুদ্ধবিরতি করে ফেলি, বিশ্ব অর্থনীতিতে যে সংকট দেখা দিয়েছে - তার অবসান ঘটাই।"

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে - যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশই এতে রাজি নয়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি

ছবির উৎস, EPA/UKRAINIAN PRESIDENTIAL PRESS SERVICE

ছবির ক্যাপশান, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি

এসব দেশের নীতিনির্ধারকদের কথা হলো, ইউক্রেনের স্বার্থে এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থাকে রক্ষার স্বার্থে রুশ আগ্রাসনকে অবশ্যই ব্যর্থ হতে হবে - তাকে কোনভাবেই সফল হতে দেয়া যাবে না।

কাজেই, একতরফা রুশ যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে না।

তাই এতে অবাক হবার কিছু নেই যে নেটো জোটের প্রধান ইয়েন্স স্টলটেনবার্গ পশ্চিমা দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য তৈরি হবার কথা বলছেন।

দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়ে যাওয়া

মি. স্টলটেনবার্গ যা বলছেন, তা হলো 'ওয়ার অব অ্যাট্রিশন' বা দাঁতে দাঁত চেপে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা।

এর মানে - যুদ্ধে কোন পক্ষই হয়তো এগুতে পারছে না - কিন্তু পিছিয়েও যাচ্ছে না, এক জায়গায় থেকেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, মাসের পর মাস বা এমনকি বছরের পর বছর ধরে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন হয়তো মনে করতে পারেন - তিনি যদি এই "কৌশলগত ধৈর্য" দেখাতে পারেন তাহলে পশ্চিমা দেশগুলো একসময় এই ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপারে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। তাদের মনোযোগ চলে যাবে অর্থনৈতিক সংকটের দিকে বা চীনের হুমকির দিকে।

তবে, পশ্চিমা দেশগুলো যদি দৃঢ়সংকল্প দেখিয়ে যেতে থাকে, ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করতেই থাকে - তাহলে এ যুদ্ধ একটা "চিরকালের যুদ্ধে" পরিণত হতে পারে।

ইউক্রেনের পক্ষেও কি জিতে যাওয়া সম্ভব?

কিন্তু সব হিসেব-নিকেশ ভুল প্রমাণ করে ইউক্রেনও কি এ যুদ্ধে জয় পেতে পারে? তারা কি রাশিয়ার সৈন্যদেরকে ২৪শে ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে?

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলছেন, ইউক্রেন অবশ্যই এ যুদ্ধে জয়লাভ করবে।

এমন যদি হয় যে রাশিয়া পুরো ডনবাস দখল করতে পারলো না, ইউক্রেন নতুন-পাওয়া দীর্ঘপাল্লার রকেট দিয়ে হারানো ভূখন্ড পুনরুদ্ধার করে নিলো - তাহলে কী হবে?

নীতিনির্ধারকরা এমনটা ভাবতেই পারেন - তবে তারা নিশ্চয়ই এটাও মাথায় রাখবেন যে ভ্লাদিমির পুতিন যদি দেখেন যে পরাজয় আসন্ন, তাহলে তিনি হয়তো রাসায়নিক বা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে বসতে পারেন।

ডনবাসে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির সামনে বাসিন্দারা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ডনবাসে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির সামনে বাসিন্দারা

লন্ডনের কিংস কলেজে ইতিহাসবিদ নিয়াল ফারগুসন কয়েকদিন আগে ঠিক একথাই বলেছেন।

"পুতিনের হাতে যেহেতু পারমাণবিক বিকল্প আছে, তাই তিনি কনভেনশনাল যুদ্ধে পরাজয় মেনে নেবেন - এমন সম্ভাবনা খুব কম," বলেন মি. ফারগুসন।

যুদ্ধ যদি চলতেই থাকে তাহলে কী হবে?

যুদ্ধে এই অচলাবস্থা সৃষ্টিও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চিত্রগুলোর একটি।

এক্ষেত্রে কোন পক্ষই সামরিক দিক থেকে কোন অগ্রগতি ঘটাতে পারছে না, আলোচনাতেও কোন ফল হচ্ছে না, রাজনৈতিক সমাধানও হচ্ছে না - এমন একটা অবস্থাও তৈরি হতে পারে।

যুদ্ধে লোকবল, অস্ত্র ও অর্থ হারাতে হারাতে উভয় পক্ষই তখন ক্লান্ত ও হতোদ্যম হয়ে পড়বে।

কারো জন্যই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা আর লাভজনক থাকবে না।

আমেরিকান এমএলআরএস রকেট যা দূর পাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম (ফাইল চিত্র)

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, দূর পাল্লার লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত হানতে ইউক্রেনের প্রয়োজন আধুনিক অস্ত্রসম্ভার

এ অবস্থায় কি কিয়েভের নেতৃত্ব - পশ্চিমা সমর্থনের ওপর আস্থা হারিয়ে - মস্কোর সাথে আলোচনায় বসে পড়তে পারে?

সৈয়দ মাহমুদ আলি বলছিলেন, "এমন হতে পারে যে দু'পক্ষই বর্তমান পরিস্থিতিকে বাস্তব ভিত্তি হিসেবে মেনে নিয়ে আলোচনায় বসার কথা ভাবতে পারেন। তবে কোন পক্ষ কি শর্ত দেবেন এবং অপর পক্ষ তা মেনে নেবেন কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়।"

"এ ক্ষেত্রে দুপক্ষেরই অনেক রকম হিসেব-নিকেশ রয়েছে যে কে কতটুকু ছাড়বেন, কতটুকু রাখবেন এবং তাতে কার কতটা লাভ-ক্ষতি হবে," বলছিলেন সৈয়দ মাহমুদ আলি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন খোলাখুলিই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে এটা নিশ্চিত করা যে আলোচনার টেবিলে ইউক্রেন যেন যত বেশি সম্ভব শক্তিশালী অবস্থানে থাকে।

কিন্তু কী হবে যদি যুদ্ধ মাসের পর মাস চলতেই থাকে? ইউক্রেনের নেতৃত্ব রাশিয়াকে একেবারেই বিশ্বাস করে না - তাই রাজনৈতিক সমাধানও হবে অত্যন্ত কঠিন।

শান্তি চুক্তি হলেও তা হয়তো ক'দিন পরেই ভেঙে পড়তে পারে, যুদ্ধ আবার শুরু হয়ে যেতে পারে।

নেটো মহাসচিব ইয়েন স্টোলটেনবার্গ

ছবির উৎস, FRANCOIS WALSCHAERTS

ছবির ক্যাপশান, যুদ্ধ বছরের পর বছরও চলতে পারে- নেটো মহাসচিব ইয়েন স্টোলটেনবার্গ

ইউক্রেনের জনগণের মধ্যে এবং পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে বিভক্তি সৃষ্টি হতে পারে।

এক পক্ষ হয়তো চাইবে যুদ্ধ থামুক। কিন্তু রাশিয়া জিতে যাচ্ছে - এমনটা দেখলে কিছু পশ্চিমা দেশও হয়তো উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতেও চাইতে পারে।

বিবিসির জেমস ল্যানডেল লিখেছেন, একজন পশ্চিমা কূটনীতিক ব্যক্তিগতভাবে তাকে বলেছেন - পশ্চিমা জোটের এখন উচিত হবে প্রশান্ত মহাসাগরে একটি পারমাণবিক অস্ত্রের 'পরীক্ষা' চালানো - রাশিয়ার প্রতি একটি সতর্কবাণী হিসেবে।

সুতরাং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী- তা এখনো অজানা।

সৈয়দ মাহমুদ আলির মতে, দু'পক্ষ আলোচনা শুরু করতে রাজি হলেও যে এ যুদ্ধ এক্ষুণি বন্ধ হবে - তা নয়।

"আলোচনা শুরু হলেও সেটা দীর্ঘায়িত হতে পারে। কারণ এখানে শুধু দুটো পক্ষই তো নয়, ইউক্রেনের সাথে অনেকগুলো রাষ্ট্র রয়েছে, তাদের বিভিন্ন মতামত আছে। তারা সবাই নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করার চেষ্টা করবে।

"কাজেই আমি মনে করি আলোচনা হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হতে পারে কিন্তু যুদ্ধ এত সহজে শেষ হবে না," বলেন ড. আলি।

ভিডিওর ক্যাপশান, রাশিয়া আর ইউক্রেনের মধ্যে শক্তির পার্থক্য কতটা?