নরসিংদীতে পোশাকের কারণে তরুণীকে হেনস্থার মূল অভিযুক্ত নারীকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব

ছবির উৎস, Courtesy: Aparajita Sangita
সপ্তাহ দুয়েক আগে ঢাকার কাছে নরসিংদীর একটি রেলস্টেশনে পোশাকের কারণে এক তরুণীকে হেনস্থার যে ঘটনা বাংলাদেশে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল, সেই ঘটনার মূল অভিযুক্ত সন্দেহে একজন নারীকে গ্রেপ্তার করেছে বিশেষ বাহিনী র্যাব।
গত ১৮ই মে তারিখে সংঘটিত হওয়া ওই হেনস্থার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
এ নিয়ে কিছু অধিকারকর্মী ঢাকায় ও নরসিংদীতে গিয়ে বিক্ষোভও দেখান।
ঘটনার চারদিন পর আদালতের নির্দেশে একটা মামলা হওয়ার পর এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়।
কিন্তু ভাইরাল ভিডিওতে তরুণীকে হেনস্থার ঘটনাপ্রবাহ যে নারীটির কারণে শুরু হয়েছিল বলে অভিযোগ, তাকেই এতদিন ধরা যাচ্ছিল না।
এ নিয়ে নারী অধিকারকর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও জানাচ্ছিলেন।
র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানভীর মাহমুদ পাশা বিবিসি বাংলাকে বলছেন, রবিবার রাতে একজন আত্মীয়ের বাসা থেকে ওই নারীকে গ্রেপ্তার করেছেন তারা এবং ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার কথা রয়েছে বলে জানান লে. কর্নেল পাশা।
গ্রেপ্তারের এই খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন আন্দোলনকারীরা।
অভিযুক্ত নারীর 'জঘন্য গালিগালাজ' দিয়ে শুরু
গত ১৮ই মে ভোরবেলা নরসিংদী রেলস্টেশনে একজন তরুণী আর তার বন্ধু একদল স্থানীয় মানুষের তীব্র রোষের মুখে পড়েন।
তাদের এই রোষের কারণ ছিল তরুণীটির পরিধেয় পোশাক।
ঘটনার বেশ কয়েকদিন পর ওই তরুণীর সাথে কথা হয় বিবিসির মুন্নী আক্তারের। তরুণীটি ওই ঘটনার পর খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানান।

ছবির উৎস, APARAJITA SANGITA
তরুণীটি বলেন, স্থানীয় একটি জনপ্রিয় খাবার খেতে তিনি আর তার এক বন্ধু ১৭ই মে মঙ্গলবার ঢাকা থেকে নরসিংদী গিয়েছিলেন।
ওইদিন রাত হয়ে যাওয়ায় তারা পরদিন ভোরের ট্রেনে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
রাতটা স্থানীয় এক বড়ভাইয়ের পরিবারের সাথে তাদের বাড়িতে কাটিয়ে বুধবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে তারা রেলস্টেশনে যান।
সেখানে গিয়ে এক নারীর তীব্র বাক্যবানের মুখে পড়েন তরুণীটি।
ঘটনার দু'দিন পর রেলওয়ে পুলিশের ইনচার্জ ইমায়দুল জাহেদি বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন যে প্লাটফরমে অপেক্ষার সময় আরেকজন নারী ওই তরুণীকে এ ধরণের পোশাক পরেছে কেন জিজ্ঞেস করেন।
"মেয়েটা শর্ট টপস আর জিন্স পরিহিত ছিলো। এ নিয়ে এক নারী প্রথম চার্জ করেন। এ নিয়ে উত্তপ্ত কথা বিনিময়। ছেলে দুটো প্রতিবাদ করে। তখনি অন্য কয়েকজন এসে চার্জ করলে তরুণীটি দৌড়ে স্টেশন মাষ্টারের কক্ষে আশ্রয় নেয়।"
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তরুণীটি বিবিসিকে বলেন, স্টেশনে যাওয়ার পর তার বন্ধুটি কিছুক্ষণের জন্য টয়লেটে গিয়েছিলেন।
এ সময় "হঠাৎ করে মহিলাটি কোথা থেকে হাজির হয়"।
"আমি বুঝতে পারলাম না, উনি আসলেন, তারপর ইচ্ছেমত গালিগালাজ শুরু করলেন"।
"আমি তাকিয়ে আছি আর বারবার জিজ্ঞাসা করছি, আন্টি আপনি কেন আমার সাথে এরকম করতেছেন। নরমালভাব কথা বলেন। আপনি বলেন আমার প্রবলেমটা কী? আমি শুনতেছি আপনার কথা", বলছিলেন তরুণীটি।
"উনি আমার কোন কথাই শুনবেন না। এক পর্যায়ে তিনি আমার বাবা মা, আমার পরিবারকে নিয়ে ইচ্ছেমত গালিগালাজ করতেছেন - আমার ফ্যামিলি আমাকে শাসন করে না, এই জন্যেই এই অবস্থা হচ্ছে।"
"খুবই জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করতেছেন", বিবিসিকে বলেন বিপর্যস্ত হয়ে পড়া তরুণীটি।
এরই এক পর্যায়ে তরুণীর বন্ধু টয়লেট থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিবাদ করেন।
তখন ওই নারীর সাথে আরও একজন এসে যোগ দেন এবং তিনিও একই ভাষায় গালিগালাজ করেন বলে তরুণীটির অভিযোগ।
"এক পর্যায়ে আমি বললাম, আন্টি আমার যেহেতু প্রবলেম, আমার সাথে বড় একটা ওড়না আছে, আপনি আমার পিঠটা ঢেকে দিন। কিংবা আপনার যেহেতু ওড়না আছে ওটা দিয়ে ঢেকে দিন। কিন্তু ওনারা গালিগালাজ করেই যাচ্ছে", বলেন তরুণী।
এর এক পর্যায়ে তরুণী পাল্টা প্রতিবাদ করেন বলে বিবিসিকে জানান।

ছবির উৎস, Courtesy: Aparajita Sangita
এর কোন এক সময়ে তরুণীর সাথে থাকা বন্ধু পুলিশের জরুরি নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেন এবং স্থানীয় যে বড় ভাইয়ের বাড়িতে ছিলেন তাকে ফোন করে আসতে বলেন।
তিনি এসে পরামর্শ দেন ট্রেনে না গিয়ে তাদের বাসে করে ঢাকায় ফিরতে।
"এই সময় এক লোক এসে তার কলার ধরে বলে তোরা কোথায় যাবি? তোরা এখান থেকে বাসে যেতে পারবি না", বলেন তরুণী।
এসময় ওই নারী, যিনি শুরুতে গালিগালাজ করছিলেন, তিনি তরুণীটির বন্ধুকে মারধর করতে শুরু করেন।
"আমি সেদিন শুধু হাত দেখছিলাম। চারিদিকে হাত", বিবিসিকে বলছিলেন তরুণীটি।
শুরুতে তার ধারনা ছিল যে তাকে তখন মারা হয়নি, কিন্তু পরে টের পেয়েছিলেন তার পিঠে এবং কোমরে ধারালো কোন কিছুর ক্ষত।
তরুণীর ভাষায় 'সম্ভবত চাবির মত কিছু একটি দিয়ে' আকস্মিক আঘাত করা হয়েছিল তাকে।
প্রতিবাদ
এ ঘটনায় পরপরই ঢাকায় শাহবাগে বিক্ষোভ দেখান একদল অধিকারকর্মী।
আর গত শুক্রবার ঢাকা থেকে কুড়ি জন নারীপুরুষ নরসিংদী রেলস্টেশনে গিয়ে 'ইচ্ছেমত' পোশাক পরে এক অভিনব প্রতিবাদ করেন।
এই প্রতিবাদকারীরা অভিযুক্ত ওই নারীকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছিলেন।
এদের একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা অপরাজিতা সঙ্গীতা গ্রেপ্তারের খবরে নিজের সন্তোষ প্রকাশ করে বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এটা একটা বার্তা"।
"যারা একাজ করেছে এবং একের পর এক একই ধরণের কাজ করছে তাদের কাছে একটা বার্তা যাবে যে এগুলো রাষ্ট্রের আইন পরিপন্থী এবং এগুলো করে কেউ পার পাবে না"।
তবে মিজ সঙ্গীতা এও বলেন যে, গ্রেপ্তারের মাধ্যমে যেন ঘটনার শেষ না হয়।
"সে যেন দুদিন পর ছাড়া পেয়ে না যায়। তার যেন শেষ পর্যন্ত বিচার হয়। এটা দেখার জন্য আমরা লেগে থাকবো"।








