নারী নির্যাতনের ভিন্ন ধরন, গালি ও তিরস্কারমূলক শব্দ যেভাবে তাদের জব্দ করে

তিরস্কারমূলক শব্দ যেভাবে জব্দ করে নারীকে

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, তিরস্কারমূলক শব্দ যেভাবে জব্দ করে নারীকে

বাংলাদেশে বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইড বলছে, বাংলা ভাষায় অধিকাংশ হয়রানিমূলক কথা, গালি, তিরস্কারমূলক শব্দই সাধারণত নারীকে অবমাননা অথবা হয়রানি করার জন্য ব্যবহার হয়।

সেই সঙ্গে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীকে যে নানা ধরণের মানসিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়, তার একটি বড় অংশ হয় নেতিবাচক নানা শব্দের মাধ্যমে। কোন ঝগড়া বিবাদে নারী বিভিন্ন ধরনের মৌখিক সহিংসতার শিকার হয়।

হয়ত খেয়াল করেছেন আপনার আশপাশে প্রচলিত বেশিরভাগ গালির সাথে স্ত্রী লিঙ্গের সম্পর্ক রয়েছে। অনেক তিরস্কারমূলক শব্দের পুরুষবাচক কিছুই নেই।

ভাষা যেকোন সমাজের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটায়। যেহেতু ভাষা যেকোন সমাজের মানুষের ভাবনাকে ধারণ করে, ফলে কোন সমাজে নারীর অবস্থান সেই সমাজে নারীর প্রতি ব্যবহার হওয়া ভাষার মাধ্যমে বোঝা যায়।

ভাষার মাধ্যমে লিঙ্গীয় বৈষম্য কী?

বাংলাদেশে ভাষাবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকেরা অনেক সময়ই ভাষার মাধ্যমে লিঙ্গীয় বৈষম্যের কথা বলে থাকেন।

শহরাঞ্চলে ৮৮ শতাংশ নারী, পথচারী কর্তৃক আপত্তিকর মন্তব্যের শিকার হন।

ছবির উৎস, Barcroft Media

ছবির ক্যাপশান, শহরাঞ্চলে ৮৮ শতাংশ নারী, পথচারী কর্তৃক আপত্তিকর মন্তব্যের শিকার হন।

নারীর প্রতি তিরস্কারমূলক কিছু শব্দ?

যেমন ধরুন, বাংলাদেশের সমাজে কিছু প্রচলিত শব্দ আছে, যেগুলো বাংলা অভিধানেও রয়েছে, যে শব্দগুলো সাধারণত সবসময়ই মেয়েদের নেতিবাচক ভাবে বর্ণনা করার জন্য ব্যবহৃত হয়, যেমন এই শব্দগুলো-

* মুখরা---যে নারী খোঁচা দিয়ে বেশি কথা বলে

* ঝগড়াটে---যে ঝগড়া করে, কিন্তু কোন আগ্রাসী পুরুষের জন্য এই শব্দ ব্যবহার হয় না

* মাল---আকর্ষণীয় নারী

* বন্ধ্যা---সন্তান নেই যার

* পোড়ামুখী---খারাপ ভাগ্য যার

এছাড়া কিছু শব্দ, বাক্য বা প্রবাদ ও প্রবচন রয়েছে, যেগুলো দিয়ে নারীর কর্মদক্ষতা, বা যোগ্যতা খাটো করা হয়। আবার কিছু শব্দ আছে, যেগুলোর পুরুষবাচক শব্দ বাংলা ভাষায় নেই, যেমন ধরুন-

* ডাইনী

* খানকী বা বেশ্যা

* ছিনাল

* কুটনি

* সতী ও অসতী

* নটী

অনেক শব্দের মাধ্যমে নারী আহত বা অসম্মানিত হতে পারে।

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, অনেক শব্দের মাধ্যমে নারী আহত বা অসম্মানিত হতে পারে।

এসব শব্দ নারীকে হেয় করে

সমাজে এই ধরণের শব্দের মাধ্যমে নারীকে যে হেয় করার চেষ্টা করা হয়, তা নিয়ে বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইড ঢাকায় আজ একটি আয়োজন করেছে, যার নাম শব্দে জব্দ নারী।

সংস্থার কর্মকর্তা কাশফিয়া ফিরোজ বলছিলেন, এক গবেষণায় তারা দেখেছেন শহরাঞ্চলে ৮৮ শতাংশ নারী, পথচারী কর্তৃক আপত্তিকর মন্তব্যের শিকার হন।

তিনি বলছেন, "আমরা প্রায় আটাশ শোটা কেসের ওপর গবেষণা করে দেখেছি, প্রতি তিন জনে একজন নারী সহিংসতার শিকার হন। আমরা দেখেছি, যখন কারো ওপর শারীরিক নির্যাতন করা হয়, তখন তাকে মৌখিকভাবেও নির্যাতন মানে গালিগালাজও করা হয়। আর মানসিক নির্যাতন তো আছেই, যেমন তুমি এটা পারবে না, ওটা করবে না। আবার ধরুন কেউ অফিসে রয়েছে, তার ভয় থাকে বস কী বলবে। অর্থাৎ এক ধরণের ফিয়ার অব ভায়োলেন্স আছে।"

মিজ ফিরোজ জানিয়েছেন, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার সময় নানা ধরণের নেতিবাচক বা আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার হয়।

আরো পড়ুন:

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অল্প বয়সে মেয়েদের স্কুল থেকে ঝড়ে যাবার একটি একটি কারণ।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাষার মাধ্যমে নারীকে হেয় করা বা হয়রানি করার প্রভাব পড়ে সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বলছেন, এর ফলে নারীর আত্মবিশ্বাস কমে যায়, নারী সমাজে তার অবস্থান নিয়ে শঙ্কিত থাকে।

সামাজিক বিভিন্ন কাজে নারীর অংশগ্রহণও এর ফলে কমে যায়।

ভাষার মাধ্যমে নারীকে হয়রানি করার প্রভাব পড়ে সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রে।

ছবির উৎস, Barcroft Media

ছবির ক্যাপশান, ভাষার মাধ্যমে নারীকে হয়রানি করার প্রভাব পড়ে সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রে।

সমাজতত্ত্ব কী বলে?

তার মতে, "সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বলি মেয়েদের মেয়ে হয়ে এবং ছেলেদের ছেলে হয়ে উঠতে শেখানো হয়। লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতার একটি বড় কারণ আমরা দেখেছি, ছেলেদের সমাজে শেখানো হয় ছেলেরা কাঁদবে না।

অর্থাৎ তারা আবেগ প্রকাশ করতে শেখে না, যে কারণে তারা সহিংস একটি প্রকাশের মাধ্যমে তারা আবেগ প্রদর্শন করে। এর পেছনে রয়েছে আমাদের গণমাধ্যমে নারীর উপস্থাপন কেমন তার একটি বড় প্রভাব।"

অনেক শব্দের মাধ্যমে নারী যে আহত বা অসম্মানিত হতে পারে, সে ব্যাপারে ধারণাও থাকে না অনেক মানুষের।

কেবল ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সচেতন হবার মাধ্যমে যে সমাজে নারী পুরুষের বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে আনা যেতে পারে---অ্যাকশন এইডের আজকের অনুষ্ঠানে সে ধারণাই দিচ্ছিলেন আলোচকেরা।

অন্যান্য খবর: