আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
খেলার মাঠে থানা নির্মাণ: ঢাকার ফুটপাতে-ডিভাইডারে যেখানে সেখানে পুলিশ বক্স কেন
- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে ঢাকার কলাবাগান এলাকায় একটি খেলার মাঠে পুলিশের থানা ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজন এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে ঢাকার মোড়ে মোড়ে ফুটপাতে এবং রাস্তার ডিভাইডারে স্থাপিত পুলিশ বক্সগুলো নিয়েও।
অন্যতম একজন নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেছেন, নগর উন্নয়নের যে সব পরিকল্পনা রয়েছে, তা না মেনেই এসব পুলিশ বক্স নির্মাণ করা হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক একজন আইজি শহিদুল হক দাবি করেছেন, আইনগতভাবে এবং ট্রাফিক পুলিশের জন্য মানবিক কারণে বেশ কয়েক বছর আগে বিভিন্ন জায়গায় এসব পুলিশ বক্স করা হয়েছে।
কলাবাগানে তেঁতুলতলা খেলারমাঠে পুলিশের থানা নির্মাণের প্রতিবাদ করায় দু'দিন আগে স্থানীয় একজন নারী এবং তার কিশোর সন্তানকে ১৩ ঘন্টা আটকিয়ে রাখার পর পুলিশ বাহিনী সমালোচনার মুখে পড়েছে।
সেই নির্মাণ কাজের বিরুদ্ধে আন্দোলনও একটা মাত্রা পেয়েছে এবং তাতে যুক্ত হয়েছেন নগর পরিকল্পনাকারীদের অনেকে এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনও, যদিও প্রতিবাদ স্বত্ত্বেও খেলার মাঠে পুলিশের থানা নির্মাণের কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
খেলার মাঠের পর আলোচনায় পুলিশ বক্স
ঢাকার মোড়ে মোড়ে ফুটপাতে এবং রাস্তার ডিভাইডারে স্থাপিত পুলিশ বক্সগুলোর বৈধতার প্রশ্ন তুলে নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব এর জন্য নগর অবকাঠামো দখলের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেওয়াকে দায়ী করছেন।
"প্রাকৃতিক সম্পদ এবং নগর অবকাঠামো দখলের যে সংস্কৃতি চলছিল, সে ব্যাপারে আমাদের অনীহা এবং এক ধরনের ব্যবস্থা না নেয়ার মনোভাবের কারণে যাদের মাধ্যমে আমরা তা উদ্ধার করবো বলে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তারাও একাজে যুক্ত হয়ে গেছে," বলেছেন ইকবাল হাবিব।
"বিভিন্নরকম অছিলায় ফুটপাত বা আইল্যান্ড এবং যেখানে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে ঘর তুলে ফেলা বা কাঠামো তুলে ফেলা-এটি কখনই কাম্য হতে পারে না," বলছেন তিনি।
একইসাথে নগরবিদরা বলেছেন, যে সব রাস্তার ফুটপাতে বা ডিভাইডারে পুলিশ বক্স রয়েছে, সেখানে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হয়।
যারা এসব জায়গা অবৈধ দখল মুক্ত রাখতে কাজ করবে বা আইন রক্ষা করবে, তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ কেন উঠবে- এ প্রশ্ন নগরবিদদের।
কলাবাগানে খেলারমাঠে থানা নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের মধ্যে অন্যতম সৈয়দা রেজোয়ানা হাসান বলেছেন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে আইন বা জনমতের তোয়াক্কা করছে না।
প্রতিবাদের মুখেও কলাবাগানে খেলার মাঠে পুলিশের থানা নির্মাণের কাজ অব্যাহত রাখার বিষয়কে উদাহরণ হিসাবে টেনে সৈয়দা রেজোয়ানা হাসান বলেন, "কেউ আইন ভাঙলে আমরা যার কাছে যাব, সে নিজেই জনমত উপেক্ষা করে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে পায়ে দমিয়ে কীভাবে এমন একটা কাজ করতে পারে এবং এত প্রতিবাদের মুখেও সেই কাজ অব্যাহত রাখতে পারে।
"এখন ব্যাপারটা এমন হয়েছে যে, তারা যেটা বলবে সেটাই আইন। তারা যেটা বলবে সেটাই উন্নয়ন, তারা যেটা বলবে সেটাই অগ্রাধিকার। এর বাইরে আর যাওয়া যাবে না," বলছেন মিজ হাসান।
পুলিশের স্থাপনা নিয়ে সাবেক আইজি
তবে বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক একজন আইজি শহিদুল হক দাবি করছেন, আইনগতভাবে এবং ট্রাফিক পুলিশের জন্য মানবিক কারণে বেশ কয়েক বছর আগে বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ বক্স করা হয়েছে।
"ট্রাফিক পুলিশ একটা পয়েন্টে কমপক্ষে দশ ঘন্টা দাঁড়িয়ে ডিউটি করে। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি- এসব মধ্যে তারা ডিউটি করে।"
সাবেক আইজি শহিদুল হক বলছেন, "মনে করেন, তার (ট্রাফিক পুলিশ) প্রস্রাব করতে হবে, সেই জায়গাটা তারা আশে পাশে কোথাও পায় না। মহিলা পুলিশের জন্য ব্যাপারটা আরও কঠিন।"
তিনি আরও বলেন, "ঝড়-বৃষ্টি বা তীব্র গরমে যখন সে অস্থির হয়ে যায়, তখন ক্ষণিকের জন্য ওখানে একটু আশ্রয় নেবে। সেজন্য কোথাও কোথাও পুলিশ বক্স করা হয়েছে।"
শহিদুল হক বলেছেন, সিটি করপোরেশনের অনুমোদন নিয়ে কিছু জায়গায় পুলিশ বক্স করা হয়েছে।
তবে, এসব পুলিশ বক্স তৈরির পেছনে মি: হক নিজেই যুক্তি হিসাবে তুলে ধরেছেন ঢাকার বিভিন্ন ফুটপাতকে হকার বা প্রভাবশালীদের দখলে রাখার বিষয়টিকে।
একইসাথে তিনি হকারদের ফুটপাত থেকে সরানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের চাপ এবং সমস্যা নিয়ে তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, "আমি যখন ঢাকায় পুলিশ কমিশনার ছিলাম এবং সেসময় যখন আমি ফুটপাত পরিস্কার করতে যাই, তখন একেবারে ঝাঁপ দিয়ে পড়েন মন্ত্রী, এমপি এবং পলিটিক্যাল নেতারা। তারা বলেন, হকারদের বিকল্প ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করা যাবে না।"
"একটা শ্রেণি আছে, যারা ফুটপাতে হকারদের কাছে চাঁদাবাজি করে, তারাও ফুটপাত পরিস্কার করার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। তো পুলিশ কি করবে? পুলিশ কি ইচ্ছা করলেই ফুটপাত পরিস্কার করতে পারবে?'' প্রশ্ন তুলছেন সাবেক আইজি শহিদুল হক।
তিনি বলছেন, "পুলিশের সাময়িক সুবিধা বা নিরাপত্তার জন্য দুই চারটা বক্স থাকবে। সেটা নিয়েই শুধু প্রশ্ন তোলা হয়!"
পুলিশের বর্তমান একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারাও অনানুষ্ঠানিকভাবে একইরকম বক্তব্য দিয়েছেন।
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
শহিদুল হক যদিও বলেছেন যে, পুলিশ বক্সগুলো করা হয়েছে সিটি করপোরেশনের সম্মতিতে, কিন্তু ঢাকার দু'টি সিটি করপোরেশনের সাথে যোগাযোগ করা হলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লিখিত কিছু নয়, শুধু মৌখিক সম্মতির ভিত্তিতে এসব পুলিশ বক্স করা হয়েছে।
কিন্তু এগুলো সরানো হবে হবে কিনা-সে ব্যাপারে কোন জবাব তারা দেননি।
পুলিশ বক্স নির্মাণ প্রসঙ্গে শহিদুল হক মন্তব্য করেন ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নেয়া উচিতএবং তা নেয়া হলে পুলিশ বক্স থাকার প্রয়োজনও হবে না।
''পৃথিবীর কোন দেশেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে শত শত পুলিশ ডিউটি করে না। অন্যান্য দেশে এখন ক্যামেরায় বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে (ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ) চলছে," তিনি বলেন।
তিন বছর আগে আইজি থাকাকালে তিনি ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থা চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলেও মি: হক জানান।
তিনি উল্লেখ করেন, তার অবসর নেয়ার কয়েকবছর পরও সেই প্রস্তাব এখনও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পড়ে রয়েছে।