ভারত: ধর্মীয় সহিংসতায় ধসে পড়লো ঘরবাড়ি আর মানুষের স্বপ্ন

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, নিতিন শ্রীভাস্তভা
- Role, বিবিসি নিউজ, দিল্লি
ভারতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা আর ঘরবাড়ি ভাঙচুরের পর রাজধানী দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরী এলাকা এখনও উত্তপ্ত।
শনিবার হনুমান জয়ন্তী উপলক্ষে একটি হিন্দু মিছিল ঐ এলাকার একটি মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সহিংসতা শুরু হয়।
এই দাঙ্গার জন্য হিন্দু এবং মুসলমান দু'পক্ষই একে অন্যকে দায়ী করছে।
সহিংসতায় আহত হয়েছে প্রায় নয় জন। এর মধ্যে সাতই জনই পুলিশ।
এই ঘটনার পর ঐ এলাকায় বুধবার থেকে শুরু হয় "অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ" অভিযান।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
সেখানকার পৌর কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে ভারতের শাসক হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি।
তারা বলছে, ঐ এলাকায় অবৈধ ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার জন্যই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
কিন্তু সেখানকার মুসলমানরা বলছেন, বিশেষভাবে তাদের বাড়িঘরকে লক্ষ্য করেই ভাঙচুরের এই অভিযান চালানো হয়েছে।
এই অভিযান থামানোর জন্য ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি অন্তর্বর্তী আদেশ জারি করার পরও এক ঘণ্টা সময় ধরে উচ্ছেদ অভিযান চলে।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের জারি করা দ্বিতীয় একটি আদেশে ঐ এলাকায় স্থিতাবস্থা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
সম্পর্কিত খবর:
কিন্তু দিল্লিতে যা ঘটেছে তার সাথে মধ্য প্রদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর অনেক মিল রয়েছে। ঐ প্রদেশেও বিজেপি এখন ক্ষমতায়।
সেখানকার খারগোন শহরে আরেকটি হিন্দু মিছিল যাওয়ার সময় গোলযোগ তৈরি হয়।
ঐ শহরের বাসিন্দা মুসলমানরা বলছেন, ঐ ঘটনার পর তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেয়া হয়েছে।
জাহাঙ্গীরপুরীর বাসিন্দারা বলছেন, এক্সক্যাভেটার দিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙ্গা দেখে তারা হতবাক হয়েছেন। কারণ অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান সম্পর্কে তাদের কোন নোটিশ দেয়া হয়নি।

ছবির উৎস, Getty Images
সাতটি এক্সক্যাভেটার যখন জাহাঙ্গীরপুরী মহল্লার সরু গলির ভেতরে ঢুকে পড়ে তখন শত শত সশস্ত্র পুলিশ সেগুলোকে ঘিরে পাহারা দিতে থাকে।
এটি দিল্লির একটি গরীব এলাকা। মূলত বাংলাভাষী মুসলমান ও হিন্দু পরিবারগুলোর বাস জাহাঙ্গীরপুরীতে। বেশ কয়েকটি ছোট ছোট মন্দির রয়েছে এখানে।
কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ঘরবাড়ি ভাঙার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা বলছেন, তাদের সহায় সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বিয়াল্লিশ-বছর বয়সী গুফরান জাহাঙ্গীরপুরীতে তার বাড়ির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে হন্যে হয়ে কিছু একটা খুঁজছিলেন। জিজ্ঞাসা করতে ভাঙারি দোকানের এই মালিক জানালেন, তার পুরনো নোটবুকটি তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images
"যাদের আমি টাকা ধার দিয়েছিলাম তাদের সবার নাম টুকে রাখা ছিল ঐ নোটবুকে। দোকানের সব মালামালের সাথে নোটবুকটিকে খুঁজে পাচ্ছিনা।"
গুফরান আর তার পরিবারের সদস্যরা যখন তাদের জিনিসপত্রের খোঁজ করছিলেন তখন পাশের একটি মসজিদের একটি অংশ এক্সক্যাভেটার দিয়ে গুঁড়িয়ে ফেলা হয়।
এই মসজিদের কাছেই শনিবার গোলযোগ শুরু হয়েছিল।
বুলডোজার দিয়ে যখন মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলা হয় তখন তা দেখছিলেন মসজিদের ছাদে বসা কিছু মুসলমান।
পবিত্র রমজান মাসে এদের অনেকেই রোজা রেখেছিলেন।
ঐ মসজিদের পেছনে ৩২ বছর ধরে বসবাস করছিলেন সাবিনা বেগম। তাকে দেখা গেল এক ভাগ্নির হাত জড়িয়ে ধরে তিনি নীরবে কাঁদছেন।
"আমাদের সবকিছু বদলে গেছে," বলছিলেন তিনি, "এসব অপকর্ম করে বাইরের লোকজন। আর তার খেসারত দেই আমরা।"
দিল্লির পৌর কর্মকর্তাদের হাতে ছিল সরকারি খাস জমির ওপর তৈরি ঘরবাড়ির বিস্তারিত এবং তারা একের পর এক এসব বাড়িঘর ভেঙে ফেলছিলেন।
চুয়ান্ন-বছর বয়সী গণেশ গুপ্তা কর্মকর্তাদের বার বার করে অনুরোধ করছিলেন তাকে কিছুটা সময় দেয়ার জন্য।
কিন্তু তার কথা কেউ শোনেনি। তার চোখের সামনে তার ফলের জুসের দোকানটি ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া হয়।
"এটা একটা নির্লজ্জ ঘটনা," চিৎকার করে বলছিলেন তিনি, "এটা আমার বাবার আমলের দোকান। এর সব বৈধ কাগজপত্র রয়েছে আমার কাছে। অভিযানের আগে তারা কেন আমার কাছে নোটিশ পাঠালো না?"
দিল্লির পৌর আইন অনুযায়ী, সরকারি জমির ওপর অবৈধ দখলদারদের হঠাতে পাঁচ দিনের সময় দেয়ার বিধান রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট এখন ভুক্তভোগীদের বলেছে, তারা কোন উচ্ছেদ নোটিশ পেয়েছিল কিনা সে সম্পর্কে অ্যাফিডেভিট জমা দিতে।
আদালত সপ্তাহ দুয়েক পর এই ঘটনার ওপর শুনানির দিন ধার্য করবে বলে কথা রয়েছে।









