ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ: মারিউপোলে কেন যুদ্ধের কৌশল বদলানোর নির্দেশ দিলেন পুতিন

মারিউপোলে এখনো আটকা পড়ে আছে বহু বেসামরিক মানুষ

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, মারিউপোলে এখনো আটকা পড়ে আছে বহু বেসামরিক মানুষ

প্রেসিডেন্ট পুতিন রুশ সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তারা ইউক্রেনের মারিউপোলের আযভস্টাল শিল্প এলাকা থেকে কারও বেরুনোর পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

অবরুদ্ধ শহরটিতে ইউক্রেনিয়ানদের দখলে থাকা সর্বশেষ এই এলাকাটিতে রুশ সৈন্যরা যে অভিযানের পরিকল্পনা নিচ্ছিল, প্রেসিডেন্ট পুতিন তা বন্ধ রাখতে বলেছেন। পরিবর্তে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, এলাকাটির চারপাশে এমন অবরোধ তৈরি করতে, যাতে সেখান থেকে একটা মাছিও বেরুতে না পারে।

টেলিভিশনে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট পুতিন এসব কথা বলেছেন। তিনি মারিউপোলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ায় তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শুইগোকেও অভিনন্দন জানান।

মিস্টার শুইগো জানিয়েছেন, মারিউপোলের আযভস্টাল শিল্পাঞ্চলে এখন প্রায় দুহাজার মানুষ আছে।

মারিউপোলের ওপর গত দুমাস ধরে রুশ হামলায় কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ইউক্রেন বলছে এই শিল্পাঞ্চলে অবশিষ্ট ইউক্রেনিয়ান সৈন্যরা ছাড়াও হাজার খানেক বেসামরিক মানুষও আটকা পড়েছে।

রাশিয়া ইউক্রেনে অভিযানের শুরু থেকেই মারিউপোল দখল করা তাদের এক গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করেছিল।

কিন্তু বিগত সপ্তাহগুলোতে মারিউপোলে রুশরা তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

আরও পড়ুন:

রুশ এবং ইউক্রেনিয়ান বাহিনীর অবস্থান

কেন কৌশল বদলানোর নির্দেশ দিলেন পুতিন?

আযভাস্টাল শিল্প এলাকা বিশাল বড় একটা এলাকা, একশো বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। শুধু তাই নয়, এই শিল্পাঞ্চলে মাটির নীচে আছে বহু টানেল, আছে অনেক ওয়ার্কশপ। বলা হচ্ছে, সেখানে মাটির নীচে আছে আরেকটি নগরী। কাজেই ইউক্রেনিয়ানরা রুশদের বিরুদ্ধে যে ধরণের প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত, সে ধরণের যুদ্ধ চালানোর জন্য এটা আদর্শ জায়গা। তাই রুশরা যদি এই অঞ্চলটি দখল করার জন্য একটি পূর্ণ অভিযান চালায়, তাদের জন্য কাজটা সহজ হবে না।

সেজন্যেই প্রেসিডেন্ট পুতিন, এখন এটি দখলের অভিযান চালানোর পরিবর্তে সেটি অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাজ্যের একজন সমর বিশেষজ্ঞ, জেনারেল স্যার রিচার্ড ব্যারন্সও সেকথাই বলছেন। তার মতে, এটি দখল করতে গেলে রাশিয়াকে বিরাট মূল্য দিতে হতে পারে, যে ধরণের লড়াই সেখানে হবে, তাতে দুপক্ষেই প্রচুর রক্তক্ষয় হবে। রাশিয়া হয়তো ভাবছে, এই শিল্পাঞ্চলটি দখলে নেয়ার জন্য এত মূল্য দেয়ার কোন মানে আছে কিনা।

এমনিতেই আযভাস্টাল শিল্প এলাকায় ইউক্রেনিয়ানরা বিপদে আছে, তাদের রসদ ফুরিয়ে গেছে। কাজেই অবরোধের মাধ্যমেই বরং তাদের আরও বেশি কাবু করা যাবে, এটাই হয়তো ভাবছে রাশিয়া। আর তারা হয়তো আসলে ডনবাস অঞ্চলের লড়াইয়ের দিকেই মনোযোগ দিতে চায়। মারিউপোলের বেশিরভাগ অংশ কিন্তু এমনিতেই রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে।

এসব কিছুই হয়তো রাশিয়ার এই কৌশলের পেছনে কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ডনবাস অঞ্চলে তীব্র লড়াই

মারিউপোলে এখনো আটকা পড়ে আছে বহু বেসামরিক মানুষ

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, মারিউপোলে এখনো আটকা পড়ে আছে বহু বেসামরিক মানুষ

ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া পুরো ডনবাস অঞ্চলে এবং দক্ষিণ ইউক্রেনে যেসব জায়গায় লড়াই চলছিল, তার সবগুলোতেই হামলা অব্যাহত রেখেছে।

রুশরা সামরিক এবং বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র এবং বোমা হামলা চালাচ্ছে।

ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা দফতর জানিয়েছে, ডনবাস অঞ্চলের ক্রামাটোরস্ক শহরে রাশিয়া ক্রমাগত রকেট হামলা চালাচ্ছে।

অন্যান্য খবর:

আরও উত্তরে খারকিভের মেয়র জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টা ধরে সেখানে গোলাবর্ষণ চলছে। তবে এর তীব্রতা আগের চেয়ে কমে এসেছে। তিনি শহরের বাসিন্দাদের তাদের আশ্রয় কেন্দ্রের ভেতরেই থাকতে বলেছেন, কারণ দক্ষিণ-পূর্বের ইজিয়ুমে লড়াই চলছে। তিনি বলছেন, শহরে এখনো দশ লাখ মানুষ রয়ে গেছে। তবে তিরিশ শতাংশের মতো বাসিন্দাকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নারী, শিশু এবং বৃদ্ধ।

ব্রিটিশ সমর বিশেষজ্ঞ জেনারেল স্যার রিচার্ড ব্যারন্স বলছেন, ডনবাস অঞ্চলের উত্তর-পূর্ব দিকের লড়াইটা রাশিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে তারা ইউক্রেনিয়ান বাহিনীকে ঘিরে ফেলতে চাইছে। যদি তারা একটা করতে পারে, সেটা হবে তাদের জন্য একটা বড় সাফল্য।

রুশ সেনারা মারিউপোলের বেশিরভাগটাই দখল করে ফেলেছে

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, রুশ সেনারা মারিউপোলের বেশিরভাগটাই দখল করে ফেলেছে

ত্রাণ তৎপরতার বিরুদ্ধে হুমকি

ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, পূর্বাঞ্চলের যেসব শহর রাশিয়া দখলে, সেখানে তারা সীমান্তের কাছাকাছি শহরগুলো থেকে বেরুনোর পথ বন্ধ করে দিচ্ছে, কেবল রাশিয়ার দিকে যাওয়ার পথ খোলা রাখা হচ্ছে। ফলে, যারা পালাতে চান, তাদেরকে বাধ্য হয়ে রাশিয়ার দিকেই যেতে হবে।

এছাড়া খারকিভ অঞ্চলের ভেলিকি বারলুকের আশেপাশে যে কোন ধরণের উদ্ধার তৎপরতা বা মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমের ওপরও রুশরা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বলে দাবি করছে ইউক্রেনিয়ান সূত্রগুলো।