অ্যালোপেশিয়া: মাথার চুল ঝরে যাওয়ার এ রোগ কেন হয়, লক্ষণ আর নিরাময় কী

জেডা পিঙ্কেট স্মিথের সাথে উইল স্মিথ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অস্কার জেতার পর স্ত্রী জেডা পিঙ্কেট স্মিথের সাথে উইল স্মিথ

স্ত্রী অভিনেত্রী জেডা পিঙ্কেট স্মিথের যে রোগ নিয়ে মস্করা করায় অস্কার মঞ্চে উপস্থাপক ক্রিস রকের মুখে চড় কষিয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাঁধিয়ে বসেছেন উইল স্মিথ, সে অসুখের নাম অ্যালোপেশিয়া।

মি. স্মিথ এ বছরের অস্কার আসরে সেরা অভিনেতার পুরষ্কার জিতেছেন।

অ্যালোপেশিয়া রোগের কারণে জেডা পিঙ্কেট স্মিথ নিজের মাথা প্রায় কামিয়ে রাখছেন কয়েক বছর হলো, এ রোগের কথা তিনি প্রথম জানিয়েছিলেন ২০১৮ সালে।

এক ফেসবুক আলোচনায় তিনি সেসময় বলেছিলেন, অ্যালোপেসিয়া নামে এক রোগের কারণে তার মাথার চুল সব পড়ে যাচ্ছে, এবং সে কারণে তখন থেকে তিনি চুল ছোট করে রাখেন।

কিন্তু এই অ্যালোপেশিয়া রোগটি কী আর কিভাবে এর চিকিৎসা করা যেতে পারে?

অ্যালোপেশিয়া কী?

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এনএইচএস বলছে, সাধারণভাবে মাথার চুল পড়ে যাওয়াকে চিকিৎসা শাস্ত্রের ভাষায় অ্যালোপেশিয়া বলে।

সত্তর বছর বয়সী নারীদের অন্তত ৪০ শতাংশ এ রোগে ভোগেন যাতে দেখা যায় তাদের মাথার সামনের অংশের চুল পাতলা হয়ে গেছে।

আরো পড়তে পারেন:

জেডা পিঙ্কেট স্মিথ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এক সময় এমন মাথাভরা চুল ছিল জেডা পিঙ্কেট স্মিথের

এনএইচএস বলছে, দৈনিক যে হারে চুল পড়া স্বাভাবিক, তার চেয়ে বেশি চুল পড়ে গেলে এবং একই অনুপাতে নতুন চুল না গজালে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যালোপেশিয়া বলা হয়।

দৈনিক ৫০-১০০টি চুল পড়া স্বাভাবিক বলে বর্ণনা করছে এনএইচএস।

কিন্তু চুল পড়ার পর নতুন চুল না গজালে মাথার বিভিন্ন জায়গায় বা সম্পূর্ণভাবে টাক পড়ে যেতে পারে। সেটিও এ রোগের কারণেই হয়।

এই মূহুর্তে বিশ্বে প্রায় ১৪ কোটিরও বেশি মানুষের অ্যালোপেশিয়া অর্থাৎ পূর্ণ অথবা আংশিক টাক রয়েছে।

নারী-পুরুষ-শিশু সবার হতে পারে এ রোগ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নারী-পুরুষ-শিশু সবার হতে পারে অ্যালোপেশিয়া

কী দেখলে বুঝবেন অ্যালোপেশিয়া হয়েছে?

সাধারণত মাথার চুল পড়তে শুরু করে একটা নির্দিষ্ট বয়সের পরে।

এক্ষেত্রে একেকজনের একেক সময়ে সেটি শুরু হয়। চুল পড়ার ধরনও হয় প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আলাদা, কারও বেশি, কারও কম।

কিন্তু অ্যালোপেশিয়া হলে স্বাস্থ্যবান লোকের মাথা বা শরীরের চুল হঠাৎ পড়ে যেতে শুরু করে এবং ধারাবাহিকভাবে পড়তে থাকে।

কখনো একটি নির্দিষ্ট জায়গার চুল পড়ে, কখনো আবার পুরো মাথা থেকে সব চুল পড়ে যায়।

কখনো বা ভুরু বা চোখের পাপড়িসহ সারা শরীরের লোমও পড়ে যায়।

আচমকা শুরু হতে পারে চুল পড়া

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আচমকা শুরু হতে পারে চুল পড়া

যেকোন বয়সের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এ রোগের শিকার হতে পারেন, এমনকি শিশুদেরও হতে পারে।

বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. ফারজানা আখতার বলছেন, অ্যালোপেশিয়া বিভিন্ন ধরন আছে।

সে কারণে ভিন্ন ভিন্ন উপসর্গ দেয়া দেয়, একেকজনের জন্য সেটি একেক রকম হতে পারে।

তিনি বলেন, হঠাৎ যদি লক্ষ্য করেন তার চিরুনি ভর্তি করে অস্বাভাবিকভাবে চুল পড়তে শুরু করেছে, বিছানা-বালিশ ভরে যাচ্ছে ঝরে যাওয়া চুলে, মাথায় এক বা একাধিক জায়গায় এক সেন্টিমিটার থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার এলাকার চুল একসাথে খালি হয়ে গেছে, কিংবা মাথার সামনের অংশ দ্রুত খালি হচ্ছে - তাহলে তার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

হেয়ার ফলিকল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এ রোগে শরীরের একটি নির্দিষ্ট অংশের হেয়ার ফলিকল আক্রান্ত হয়

কেন হয় এ রোগ?

নানা কারণে চুল পড়ে যাওয়ার সমস্যা হতে পারে।

চুল পড়ার সমস্যা কখনো সাময়িক ব্যাপার হতে পারে, আবার কখনো স্থায়ী টাকও হয়ে যেতে পারে।

কেউ কেউ বংশগতভাবে টাক মাথার হন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুল পড়া একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া, ফলে স্বাভাবিক চুল পড়ার হার দেখে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।

ডা. ফারজানা আখতার বলছেন, কখনো অত্যধিক চুল পড়া হতে পারে অন্য কোন শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ, অর্থাৎ শরীরে কোন ঘাটতির কারণে চুল পড়া শুরু হতে পারে।

অ্যালোপেশিয়া

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অ্যালোপেশিয়া হলে মাথার বিভিন্ন দিকে বিভিন্নভাবে চুল পড়া শুরু হয়

দীর্ঘদিন কোন রোগে ভুগলেও তা হতে পারে। যেসব কারণে চুল পড়তে পারে তার মধ্যে রয়েছেঃ

* অসুস্থতা বা দীর্ঘমেয়াদী রোগভোগ

* মানসিক চাপ

* ওজন হ্রাস

* আয়রনের ঘাটতি

* ভিটামিন বি এবং ডি এর অভাব

* কোভিডে আক্রান্ত হওয়া

* প্রোটিনের অভাব

* মাথায় খুশকি

* মানসিক অবসাদ ও বিষাদ

* ক্যান্সারের চিকিৎসা

* কোন কারণ ছাড়াও পড়তে পারে চুল।

অ্যালোপেসিয়া

ছবির উৎস, Getty Images

চিকিৎসা কী?

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এনএইচএস বলছে, সাধারণত চুল পড়া বা অ্যালোপেশিয়ার স্থায়ী কোন সমাধান নেই।

ডা. ফারজানা আখতার বলছেন, কী কারণে চুল পড়ছে সেই কারণটি চিহ্নিত করা প্রয়োজন সবার আগে, এবং কারণ শনাক্ত হবার পর সে অনুযায়ী চিকিৎসা করালে উপশম হবে এ রোগের।

কিন্তু কখনো কখনো কারণ ছাড়াও চুল পড়ে যায়, ফলে তার চিকিৎসা দেয়া কঠিন।

এদিকে, এনএইচএস বলছে, দুনিয়া জুড়েই চুল পড়া নিয়ে অনেকে, বিশেষ করে নারীরা মনোঃকষ্টে ভোগেন।

সেজন্য ঠিক সময়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, চিকিৎসা নেয়া এবং কিভাবে এর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যায় সে ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

পুরুষদের অ্যালোপেশিয়া

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুরুষদের ক্ষেত্রে এরকম অ্যালোপেশিয়া বেশি দেখা যায়

কারণ বিষয়টি নিয়ে নানারকম সামাজিক হেনস্থার শিকার হতে হয় অনেককে, ফলে বিষয়টি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ ফেলে।

অ্যালোপেশিয়া নিয়ে কয়েকটি দরকারি তথ্য

* প্রতি পাঁচ জন অ্যালোপেশিয়া রোগীর মধ্যে একজনের পরিবারের অন্য সদস্যের এই সমস্যা আছে

* এটি হঠাৎ করে শুরু হয়, কখনো একেবারে কয়েকদিনের মধ্যে

* যাদের অল্প বা হাতে গোনা কয়েকটি জায়গার চুল পড়ে যাচ্ছে, কখনো হঠাৎ করেই সে জায়গায় চুল গজাতে শুরু করতে পারে

* চুল পড়ার স্থায়ী এবং দ্রুত কোন সমাধান নেই।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: