ইতিহাসের সাক্ষী: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার স্মৃতিচারণ

ছবির উৎস, Bettmann/Getty
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। পাকিস্তান ভেঙ্গে গিয়ে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল নতুন একটি রাষ্ট্র - বাংলাদেশ।
ঐ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন পাকিস্তান সেনা বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল সুজাত লতিফ। ২০১৫ সালে তার সেই অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করেন ইসলামাবাদে বিবিসির সংবাদদাতা শুমাইলা জাফরির কাছে :
১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন লেফটেন্যান্ট পদমর্যাদার তরুণ এক অফিসার। সে বছর সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের যশোর শহরে পোস্টিং দিয়ে পাঠানো হয়।
"একসাথে আমাদের বেশ কজন সেনা কর্মকর্তার পোস্টিংয়ের নির্দেশ আসে। আমরা বেশ খুশিই হয়েছিলাম এই ভেবে যে আমরা কোনো সেনা অভিযানে অংশ নিতে যাচ্ছি। অমি নিজে বেশ রোমাঞ্চিত ছিলাম," বলেন মি লতিফ।
সেখানে গিয়ে তারা কী দেখবেন সে সম্পর্কে তাদের কারোরই তেমন কোনো ধারণাই ছিলনা। পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে পড়েছিল কারণ মুক্তি বাহিনী তখন হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল।
সুজাত লতিফ যখন যশোর পৌঁছান পাকিস্তান সেনাবাহিনী তখন চরম বিপদের মধ্যে।
"কোনো জায়গাই আমাদের জন্য নিরাপদ ছিলনা। যেসব যানবাহনে করে সৈন্যদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হতো একদিন তার একটির নীচে মাইন বিস্ফোরণ হলো। আমাদের পাঁচজন মারা গিয়েছিল।"
পাকিস্তানি সৈন্যদের অন্যতম বড় একটি ঘাঁটি ছিল যশোর সেনানিবাস। সেখান থেকেই মুক্তি যোদ্ধাদের সাথে লড়াই করতে বিভিন্ন জায়গায় তাদের পাঠানো হতো।
সুজাত লতিফ বলেন, "এক পর্যায়ে আমরা সেনানিবাসের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। যেতে পারতাম না। পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল যে আপনি তা কল্পনাও করতে পারবেন না।"
মুক্তিবাহিনীর সাথে লে সুজাত এবং তার ইউনিটের অনেকবার মুখোমুখি যুদ্ধ হয়েছে।
কিন্তু ডিসেম্বরের ৩ তারিখের পর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায় যখন ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেয় এবং সেই সাথে মুক্তিবাহিনীর সমর্থনে ভারত সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

ছবির উৎস, Bettmann/Getty
যশোরে আত্মসমর্পণ
১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় লে. সুজাত এবং তার ইউনিটের কাছে সে খবর আসেনি। ফলে, পরদিন পর্যন্ত তারা যশোরে যুদ্ধ চালিয়ে যায়।
"আমরা কখনই ভাবিনি যে আত্মসমর্পণের মত ঘটনা ঘটবে। আদৌ ভাবিনি। বাকি বিশ্বের সাথে আসলে আমাদের কোনো যোগাযোগই ছিলনা। রেডিও ছিলনা, সংবাদপত্র ছিলনা। আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্তের কথা জানতামই না। "
"যখন জেনারেল দালবির সিং (যশোর সেক্টরে ভারতীয় বাহিনীর কর্মকর্তা) ঘোষণা করলেন যে ঢাকায় আত্মসমর্পণ হয়েছে, তোমরা কেন আত্মসমর্পণ করছো না ! তারপরও আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলাম।"
পরে অবশ্য যশোরে পাকিস্তানি ব্রিগেডও আত্মসমর্পণ করে।
সুজাত লতিফ বলেন, আত্মসমর্পণে তারা খুবই মুষড়ে পড়েছিলেন।
"খুবই হতাশ হয়েছিলাম। কতটা হয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। শুধু আমি নয়, আমার সব সহযোদ্ধাই কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু আমাদের কিছু করার ছিলনা। অন্য কোনো সমাধান তখন ছিলনা। আমাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসছিল। বলতে গেলে কিছুই ছিলনা। হাতে ছিল রাইফেল আর মেশিনগান। কিভাবে তা দিয়ে ট্যাংকের সাথে লড়াই করবো ? ভারতীয় সৈন্যরা ভারি কামানোর গোলা ছুড়তে শুরু করেছিল।"
যশোরে একটি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় যেখানে লে সুজাত এবং তার ব্রিগেড ভারতীয় জেনারেলদের হাতে অস্ত্র সমর্পণ করেন।
"ভারতীয় জেনারেল আমাদের সামনে একটি প্লাটফর্মের ওপর বসেছিলেন। তিনি বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন কেন তোমরা আত্মসমর্পণ করলে। আমি তাকে বলেছিলাম স্যার আমি আপনাকে এখন এর জবাব দিতে পারবো না। তিনি বললেন - জবাব দাও নাহলে আমি তোমার গলার ভেতর দিয়ে বুলেট চালিয়ে দেব।"
আগ্রায় বন্দিশিবির
কিন্তু হত্যা করার বদলে আত্মসমর্পণ করা পাকিস্তানি সৈন্যদের যুদ্ধবন্দি করা হলো। তারপর প্রথমে ট্রাকে তারপর ট্রেনে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় আগ্রায়। কলকাতা থেকে ৩০ ঘণ্টা রেল যাত্রার পর সুজাত লতিফ এবং আরো হাজার হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আগ্রায় পৌঁছে।

ছবির উৎস, Bettmann/Getty
"আমাদের বলা হয়েছিল আমরা সরাসরি পাকিস্তান যাচ্ছি। আগ্রায় যাত্রাবিরতি হবে। তারপর তারা আমাদের পাকিস্তানে নিয়ে যাবে। আমরা খুশিই হয়েছিলাম। কিন্তু আগ্রায় পৌঁছুনর পর আমাদের এমনভাবে অপমান অপদস্থ করা হয় যে আমরা বুঝে গেলাম ভারতীয়দের অন্য পরিকল্পনা রয়েছে। তারা আমাদের আগ্রার কারাগারে ঢোকালো। খুব ঠাণ্ডা পড়েছিল সে বছর। আমার মাত্র এতটি পোশাক ছিল। প্রথম রাতে আমাদের একটি ব্যারাক থেকে আরেক ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। "
যুদ্ধের পর শান্তি মীমাংসা নিয়ে যত সময় যাচ্ছিল ততই পরিষ্কার হচ্ছিল পাকিস্তানি এই যুদ্ধবন্দিদের আশু মুক্তি হয়তো হবেনা। তবে লে. সুজাত বলরে তাদের সাথে দুর্ব্যবহার তেমন হয়নি।
"অল্প কজন অফিসার যাদের কাছ থেকে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করতে পারবে তাদের ছাড়া বাকিদের সাথে ভারতীয়রা খুব বেশি দুর্ব্যবহার করেনি। আমরা জানতাম তারা আমাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখবে না। আজ না হয় কাল আমাদেরকে ছাড়তে হবেই।"
কিন্তু লে সুজাত এবং তার আরো কজন সহকর্মী অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন। তারা আগ্রার জেল থেকে পালানোর পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা টের পেয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের আগ্রা থেকে রাঁচির একটি কারাগারে স্থানান্তর করেন। আগ্রা থেকে রাঁচি যাওয়ার পথে পাকিস্তানি ঐ সেনা দলের কজন ট্রেনের জানালার লোহার জাল কেটে পালানোর চেষ্টা করে।
"আমাদের ইউনিটের একজন অফিসার ছোট একটি করাত শরীরে লুকিয়ে রেখেছিল। সেটি দিয়ে আমরা ট্রেনের জানলার তার কাটতে শুরু করলাম। রাত নয়টায় কাটতে শুরু করি। ভোর তিনটার দিকে শেষ করি। আমি জানলা দিয়ে গলে ট্রেনের বাইরে ঝুলে পড়লাম। তারপর একসময় হাত ছেড়ে দিলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই।"
পরদিন সুজাতকে রেললাইনের পাশ থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। তাকে রাঁচির কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানেও তিনি তৃতীয়বারের মত পালানোর চেষ্টা করেন। তবে সফল হননি।
"রাঁচিতে আমরা একটা সুড়ঙ্গ খুঁড়েছিলাম। কোনো যন্ত্র ছাড়াই ৭৯ ফুট লম্বা টানেল। জেলের পাঁচিলের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল সেই সুড়ঙ্গ।"
কেন তারা এমন সুড়ঙ্গ খুঁড়েছিলেন? এই প্রশ্নে তার উত্তর ছিল, "এটা আমাদের কাছে ছিল একটি দায়িত্ব। ভারতে বন্দিদশা থেকে নিজেদের মুক্ত করা আমাদের দায়িত্ব ছিল। সফল হয়েছিলাম বা ব্যর্থ হয়েছিলাম তা ছিল অপ্রাসঙ্গিক।"

ছবির উৎস, Central Press/Getty
সিমলা চুক্তি এবং দেশে প্রত্যাবর্তন
১৯৭২ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিমলা শান্তি চুক্তি হয়। ঐ চুক্তিতে যুদ্ধবন্দি মুক্তির বোঝাপড়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ দাবি করছিল পাকিস্তানি কিছু সৈন্যের যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে হবে। এ কারণে দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় আরো দেরি হয়। লে. সুজাত প্রায় আড়াই বছর পর দেশে ফিরতে পেরেছিলেন।
"আমি খুবই খুশি হয়েছিলাম। কারণ আমি আমার দেশে ফিরতে পেরেছিলাম। যখন সীমান্ত পর হচ্ছিলাম মনে হচ্ছিল পাকিস্তানের ভাগ্যে একটি সর্বনাশ ঘটে গেছে। দেশের অর্ধেকটা চলে গেছে। তবে ঐ ঘটনা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছিলাম। কিন্তু আমি যখন দেখি ঐ ইতিহাস নিয়ে অনেক মানুষ কেনো মাথাই ঘামাচ্ছেনা, এমন ভাব করে যেন কিছুই হয়নি তখন আমার খুবই দুঃখ হয়। আমরা কি এতটাই অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছি ?"
সব বন্দি পাকিস্তানি সৈন্য দেশে ফিরে যায়। কাউকেই যুদ্ধাপরাধের মুখোমুখি করা হয়নি।
পেছনের দিকে তাকিয়ে সুজাত লতিফ এখন ঐ যুদ্ধ নিয়ে খুবই নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। পাকিস্তানের ভাগ হয়ে যাওয়া তিনি একবারেই মানতে পারেননি। তবে তিনি মনে করেন সৈনিক হিসাবে তিনি তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন
"একেক সময় আমার মনে হতো কী জন্য আমি এই যুদ্ধ করেছি। এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য কী? কিন্তু একজন সৈনিককে তো লড়াই করতে হবেই। এটা তার কাজ। এর জন্য সে পয়সা নেয়। ভালো-মন্দ বিবেচনা করার তার সুযোগ নেই। লড়াই করতে বললে তা করতে হবে।"
সুজাত লতিফ পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল হিসাবে অবসর নিয়েছিলেন।








