আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ: বাংলাদেশের মানুষ এই লড়াই নিয়ে কী ভাবছে?
- Author, সাইয়েদা আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। রাশিয়ার ছোঁড়া বোমা আর রকেটে কেঁপে উঠছে কিয়েভ, লিভিভ আর খারকিভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর। হাজারো মানুষ শরণার্থী হয়ে ছুটছেন দেশের সীমানা পেরিয়ে।
যুদ্ধের আঁচ হয়ত পশ্চিমের দেশগুলোতেই বেশি লাগছে।
কিন্তু ইউক্রেন থেকে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ বাংলাদেশের মানুষও অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে।
সংবাদ মাধ্যম আর সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে যুদ্ধের খবর এখন নিয়মিত পাচ্ছে মানুষ, ফলে যুদ্ধ নিয়ে তাদের মাঝে দেখা যাচ্ছে নানারকমের মতামত আর অবস্থান।
যুদ্ধের বিপক্ষে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে বুধবার সকালে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে বিবিসি, যাদের মধ্যে একটি বিষয়ে খুবই মিল, আর তা হচ্ছে তারা সবাই যুদ্ধের বিপক্ষে।
তারা বলছিলেন তারা যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে চিন্তিত, তাই তারা যুদ্ধ চান না।
নাট্যকলা বিভাগের একজন শিক্ষার্থী সুনয়না রিমঝিম বলছিলেন, "যুদ্ধের ক্ষতিটা তো অপূরণীয়, অনেকে মারা যাচ্ছে, অনেকে আহত হচ্ছে। যুদ্ধ একদিন শেষ হবে, এই ক্ষতিটা কিন্তু আর পূরণ করা যাবে না।"
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের রুমানা লায়লা মনে করেন, ইউক্রেনের সাথে অন্যায় আচরণ করেছে রাশিয়া।
তিনি বলছেন, "এটা অন্যায়ই হচ্ছে, ইউক্রেনের সাথে। মহিলা এবং শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দেশ ছেড়ে পরিবার ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে অন্য দেশে শরণার্থী হয়ে, সেটা খুব করুণ লাগছে আমার কাছে। এ জন্যই আমি যুদ্ধ চাই না।"
অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী হুমায়রা আক্তার আবার ভিন্নমত পোষণ করেন, তিনি মনে করেন ইউক্রেনের প্রতি মিডিয়া বেশি সহানুভূতি দেখাচ্ছে।
তিনি বলছেন, "মানুষের সিমপ্যাথি দেখা যাচ্ছে ইউক্রেন নিয়ে বেশি, কিন্তু সিরিয়া বা ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে একই রকম ঘটনা দেখি না আমরা।"
তবে বন্ধুদের এই আড্ডায় যুদ্ধের মানবিক ক্ষতির বিষয়ের সাথে পারমাণবিক যুদ্ধের আশংকার কথাও বলছিলেন দুয়েকজন।
শিমুল আহমেদ নামে বলছেন, "আমরা চাই না একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হোক, পারমাণবিক যুদ্ধ হোক। যেহেতু পশ্চিমা বিশ্ব এবং রাশিয়া উভয়েই পারমাণবিক শক্তিধর, আমাদের শঙ্কা আছে এই পরিস্থিতি নিয়ে।"
খবরের কাগজে যুদ্ধের খবর
গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি সকালে ইউক্রেনের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় রাশিয়ার হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে প্রাধান্য পেয়েছে এ যুদ্ধের খবর।
দৈনিক সংবাদপত্রের প্রায় সবগুলোতেই রোজকার শীর্ষ খবরে মধ্যে উঠে আসছে যুদ্ধের খবর।
কেবল যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং এ সংক্রান্ত বিশ্ব রাজনীতির নানা মেরুকরণ নিয়ে খবর আর বিশ্লেষণই নয়, দৈনিক খবরের কাগজগুলোতে সম্পাদকীয়তেও উঠে এসেছে যুদ্ধের খবর।
কয়েকদিন দ্য ডেইলি স্টারের একটি সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, 'কিপ নিউক্লিয়ার প্লান্টস আউট অব ওয়ার'—এতে মূলত চেরনোবিল ট্রাজেডির কথা স্মরণ করিয়ে রাশিয়াকে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু না করার আহ্বান জানানো হয়।
আবার কয়েকদিন আগে কালের কণ্ঠ দৈনিকের একটি সম্পাদকীয়তে রাশিয়াকে যুদ্ধ থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এর বাইরে নানা ধরনের মন্তব্য প্রতিবেদন লেখা হয়েছে দৈনিক খবরের কাগজে, যার বড় অংশটাই ইউক্রেনে মানবিক সংকটের দিকটিতে গুরুত্ব দিয়ে লেখা হয়েছে।
রাশিয়ার পক্ষেও সমর্থন অনেকের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর আশেপাশের এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে কথা বলে দেখা যায় তাদের মধ্যে রাশিয়াকে সমর্থন করছেন অনেকে।
এছাড়া বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমেও রাশিয়ার অবস্থান এবং কার্যক্রমের পক্ষে জোরালো মতামত রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র সামিউল ইসলাম বলছেন, "আমার কাছে মনে হয় পশ্চিমারা ইউক্রেনকে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছিল। কিন্তু এখন দেখছে হিতে বিপরীত হয়ে গেছে।
"এখন ইউক্রেনকে তারা না নেটোতে নিচ্ছে, না ইউরোপীয় ইউনিয়নে নিচ্ছে। আমার মনে রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধটা ঠিকই আছে।"
স্নিগ্ধা সুলতানা নামে একজন আইনজীবী মনে করেন, রাশিয়াকে এ যুদ্ধে উস্কে দিয়েছে ইউক্রেন এবং নেটো।
তিনি বলেন, "রাশিয়া যে পূর্ব ইউরোপে নেটোর উপস্থিতি চায় না, সেটা তো সব সময়ই বলে এসেছে। তাহলে এখন সেখানে যদি ইউক্রেনের মত একেবারের কাছের দেশ যদি নেটোতে যেতে চায়, তার (রাশিয়া) কাছে সেটা হুমকি মনে হবে এটাই স্বাভাবিক।"
বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে মতামত
ইউক্রেনে অভিযান চালানোর কারণে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ।
কিন্তু চীন, ভারত, বাংলাদেশ এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক অবস্থান জানায়।
কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে মিশ্র মতামত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন বাংলাদেশের উচিত রাশিয়ার অবস্থানের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া।
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন একজন শাদাত আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশের উচিত নিজের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের বিরোধিতা করা।
তিনি বলছেন, "আমাদের পাশে ইন্ডিয়া আছে, এখন এই অভিযানকে যদি আমরা এনকারেজ করি যে অন্য দেশে সামরিক হামলা করলাম, তাহলে এটা আমাদের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।"
"আমাদের মত দেশ যারা আছে উন্নয়নশীল দেশ, সামরিকভাবে শক্তিশালী না। এখন বাংলাদেশ কারো মতের বাইরে গেলে চাইলেই কেউ আমাদের ওপরও হামলা চালাতে পারে। এইটা তো আমরা পছন্দ করবো না।
"আমি মনে করি এখন ছোট দেশ যারা আছে তারা সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। ফলে সবারই এ যুদ্ধের বিরোধিতা করা উচিত।"
তবে ঢাকায় সাধারণ মানুষের কথা বলে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক দিকটি নিয়েও অনেকেই চিন্তিত। যুদ্ধের প্রভাবে ইতিমধ্যেই দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে যে প্রভাব পড়েছে, তার ফলাফল বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করেন অনেকে।