রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তুরস্কের ভূমিকা আসলে কী

ছবির উৎস, ADEM ALTAN/AFP/GETTY IMAGE
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধ ১৫তম দিনে গড়িয়েছে বৃহস্পতিবার এবং সেদিনেই তুরস্কের আন্তালিয়া শহরে বৈঠকে বসেছিলেন যুদ্ধরত দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
বৈঠক থেকে কোন সিদ্ধান্ত না এলেও তুর্কী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসলু এই বৈঠকটিকে "গুরুত্বপূর্ণ সূচনা" বলে উল্লেখ করেছেন।
তুরস্কের একটি সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেছেন, "মাত্র একটি বৈঠক থেকে অলৌকিক কিছু আশা করা ঠিক নয়।"
গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর এই প্রথম দুটো দেশের মধ্যে এতো উচ্চ পর্যায়ের কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। এই যুদ্ধে তুরস্ক নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে চেষ্টা করছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন যে তুরস্ক একই সঙ্গে পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোর সদস্য আবার অন্যদিকে দেশটির সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেনেরও সম্পর্ক ভালো থাকায় যুদ্ধকে সমাপ্তির দিকে নিয়ে যেতে তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে।
ঢাকায় সাবেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের বিশ্লেষক হুমায়ুন কবির বলছেন যেহেতু ওয়াশিংটন, মস্কো ও কিয়েভ- সবার সাথেই তুরস্কের সম্পর্ক ভালো সে কারণে মধ্যস্থতার সুযোগ তুরস্কেরই আছে এবং তা ইসরায়েলের চেয়েও বেশি কার্যকর হবে।
ইউক্রেনের কিয়েভ-ভিত্তিক ইস্ট ইউরোপিয়ান ডেভেলপমেন্ট ইন্সটিটিউটের চেয়ারপার্সন ডঃ মৃদুলা ঘোষ বলছেন রাশিয়া ও ইউক্রেনের সাথে তুরস্কের একটা ঐতিহাসিক যোগসূত্র আছে। আবার নেটোর সদস্য হলেও দেশটি রাশিয়ারও ঘনিষ্ঠ মিত্র।
"আমরা মনে হয় এ কারণেই ভ্লাদিমির পুতিন চাইছেন যে কাউকে যদি মধ্যস্থতা করতে হয় সেটা তুরস্কই করুক," বলছিলেন তিনি।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, AFP VIA GETTY IMAGES
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মস্কোর সাথে যোগাযোগের সুযোগ
যুদ্ধ শুরুর পরপরই রাশিয়ার ওপর নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব, যার ফলে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে রাশিয়া ও দেশটির প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু ৬ই মার্চ প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়িপ এরদোয়ান ফোনে কথা বলেন ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে। এক ঘণ্টার ফোনালাপে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তবে একই সাথে ইউক্রেন থেকে রাশিয়ার সেনা প্রত্যাহার এবং ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের প্রতিও তিনি তার সমর্থন ব্যক্ত করেন।
তুরস্কের সরকারপন্থী পত্রিকাগুলো তখন থেকেই তুরস্কের পরিকল্পনাকে 'পিস টেবিল' বা 'হোপ ফর পিস' হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করে।
মূলত এখান থেকেই রাশিয়া - ইউক্রেন যুদ্ধে তুরস্কের ভূমিকা রাখার সুযোগ নিয়ে নানা খবর আসতে থাকে সেখানকার পত্রপত্রিকায়।
এসব খবরে একটি বিষয়ের ওপর জোর দেয়া হয় যে 'তুরস্ক উভয় পক্ষের সাথেই সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে' অর্থাৎ নিরপেক্ষ একটি ভূমিকার বিষয়ে দেশটির নেতৃত্ব সচেষ্ট।
অবশ্য ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক হামলার আগে থেকেই এ সংকট নিরসনের মধ্যস্থতার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন মিস্টার এরদোয়ান।

ছবির উৎস, Getty Images
ডঃ মৃদুলা ঘোষ বলছেন তুরস্ক ও ইসরায়েলের দিক থেকে তৎপরতা দেখা গেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাশিয়া ও ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়েছে তুরস্কে।
"কারণ প্রভাব প্রতিপত্তি ও সক্ষমতার কথা বিবেচনায় নিলে তুরস্কেরই এ সুযোগ আছে উভয় দেশকে আলোচনায় আনার। আর পশ্চিমারাও তাতে বাধা দেবে না। কারণ তুরস্ক নেটোর সদস্য এবং ওয়াশিংটনেরও মিত্রতা আছে তাদের সাথে," বলেন তিনি।
হুমায়ুন কবির বলছেন তুরস্কের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত ইতিবাচক কারণ পশ্চিমা বিশ্ব, মস্কো ও কিয়েভ- সব পক্ষের কাছেই তার গ্রহণযোগ্যতা আছে।
তুরস্কের সরকারপন্থী সাবাহ পত্রিকার কলামিস্ট ওকান মুদেরিসগুলো ৩রা মার্চ তার লেখায় মিস্টার এরদোয়ানের সম্ভাব্য মধ্যস্থতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেছেন, যে কৌশল আঙ্কারা নিয়েছে সেটি 'সক্রিয় নিরপেক্ষতা।'
অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানে আঙ্কারা ভূমিকা রাখবে।
বিশ্লেষক হুমায়ুন কবির এবং মৃদুলা ঘোষও বলছেন যে সব পক্ষের আস্থা থাকায় তুরস্ক এখন সেটাই করছে।

ছবির উৎস, EPA
ঐতিহাসিক যোগসূত্র ও আঞ্চলিক সুপার পাওয়ার
ডঃ মৃদুলা ঘোষ বলছেন ক্রাইমিয়ার সাথে তুরস্কের একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র আছে। সেখানকার তাতারদের ওপর তুরস্কের প্রভাব ব্যাপক। যদিও তারা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী।
আবার পর্দার অন্তরালে যা কিছুই হোক না কেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন মিস্টার এরদোয়ান। যদিও তার দেশ নেটোর সদস্য।
বিশ্লেষকরা বলছেন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে (অর্থাৎ কখনো রাশিয়া আবার কখনো ইউরোপ আমেরিকার সাথে কাজ করা) ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
রাশিয়া থেকে এস-৪০০ কেনা নিয়ে নেটোর সঙ্গে বিবাদে জড়ালেও সিরিয়া, লিবিয়া ও নাগার্নো কারাবাখে রাশিয়ার উল্টো দিকেও অবস্থান নিয়েছে দেশটি।
তবে প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও ভ্লাদিমির পুতিন যে কোন পরিস্থিতিতে নিজেদের মধ্যে কথা বলেছেন।
আবার তুরস্ক রাশিয়া ও ইউক্রেনে ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণে নজর দিয়েছিলো। এছাড়াও রুশ পর্যটকদের জন্য তুরস্ক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিলো। রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাসও আমদানি করে তুরস্ক।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তুরস্কের অর্থনীতি- সেটিও বিবেচনায় নিয়েছেন মিস্টার এরদোয়ান।
এসব কারণে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়াকেই হয়তো জরুরি বলে বিবেচনা করেছেন তিনি।

ছবির উৎস, Corridor
পুতিন-জেলেনস্কি বৈঠকই টার্গেট?
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইতোমধ্যেই বলেছেন যে তিনি সরাসরি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে আলোচনা করতে চান।
ওদিকে বৃহস্পতিবার আন্তালিয়া শহরে বৈঠকের পর রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন যে এ ধরনের বৈঠক নির্ভর করবে আলোচনায় যারা আছেন তারা সেজন্য কতটা প্রস্তুতি নিতে পারেন তার ওপর।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলছেন, ইউক্রেন সঙ্কটের সমাধানের ব্যাপারে তার দেশ "সিরিয়াস আলোচনা" চায়।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে এই শান্তি আলোচনার পর তুর্কী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসলু এই বৈঠকটিকে "গুরুত্বপূর্ণ সূচনা" বলে উল্লেখ করেছেন।
তুর্কী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও, আমি বলবো একটি ভালো বৈঠক হয়েছে। আমরা মানবিক করিডোর খোলা রাখার ওপর জোর দিয়েছিলাম।"
যদিও এ বৈঠকে যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ছবির উৎস, Getty Images
আবার বৈঠকের পর ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্র কুলেবা বলেছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেসব দাবি তুলে ধরেছেন সেগুলো মানা হলে সেটা হবে তাদের কাছে আত্মসমর্পণের সামিল।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলছেন, "এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন এটি চায়। রাশিয়া সেটি বাতিল করে দেয়নি। বরং আমি মনে করি তুরস্কের মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত এটিও হতে পারে। সে সুযোগ আছে।"
তবে সব মিলিয়ে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি আর রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে আলোচনায় বসানোর সুযোগ তুরস্কের আছে এবং সেটি করতে পারলে বিশ্ব রাজনীতিতে দেশটির অবস্থান যে আরও সংহত হবে তা নিয়ে কোন সংশয় নেই কারও মধ্যেই।
এবিষয়ে ইসরায়েলের দিক থেকে কিছুটা তৎপরতা দেখা গেলেও সেটি খুব বেশি অগ্রসর হওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ডঃ মৃদুলা ঘোষ ও হুমায়ুন কবির।
মিস্টার কবির বলছেন, "সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে ইসরায়েলের সেই গ্রহণযোগ্যতা নেই যা তুরস্কের আছে।"
মৃদুলা ঘোষ বলছেন, "ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ইহুদি বলে হয়তো ইসরায়েল আগ্রহ দেখাচ্ছে, কিন্তু এ ধরনের সংকটে ভূমিকা রাখার প্রভাব প্রতিপত্তি তুরস্কেরই বেশি।"








