উল্লুক: বাংলাদেশে যেভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে লেজবিহীন এই প্রাণীটি

ছবির উৎস, Sabit Hasan
- Author, সায়েদুল ইসলাম
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
চার দশক আগেও বাংলাদেশের বনে বসবাসকারী উল্লুকের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। কিন্তু সেখান থেকে এখন সেটি মাত্র কয়েকশো প্রাণীতে এসে ঠেকেছে।
মানুষের মতো পরিবার প্রথায় অভ্যস্ত এই প্রাণীটি বিশ্বজুড়েই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রাণীদের লাল তালিকায়ও রয়েছে এই প্রাণীটি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, বাংলাদেশের বনগুলোতে থাকা উল্লুক এখন বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে অনেকটা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। দেশে গত চার দশকে ওয়েস্টার্ন হোলক গিবন বা পশ্চিমা উল্লুকের সংখ্যা আশি শতাংশ কমে গেছে।
এই বিষয়ে সাম্প্রতিক একটি গবেষণার প্রধান, ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুন নাহার বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''দেশের ২২টি বনাঞ্চলে নিবিড় গবেষণা করে আমরা ওয়েস্টার্ন হোলক গিবন বা পশ্চিমা উল্লুক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেয়েছি। তাতে দেখা গেছে, সরকারিভাবে সুরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোয় এই প্রাণীটি সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। আবার আগে কয়েকটি বনাঞ্চলে প্রাণীটি আগে দেখা গেলেও সুরক্ষার অভাবে সেখান থেকে হারিয়ে গেছে।''
ওয়েস্টার্ন হুলক গিবন বা পশ্চিমা উল্লুক সম্পর্কে যা জানা যায়
মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া চিন্দুইন নদীর পশ্চিম পাশেই এই উল্লুকগুলোকে দেখা যায় বলে এর নাম ওয়েস্টার্ন হোলক গিবন।
মানুষের সঙ্গে এই প্রাণীগুলোর জীবনযাপন ধরনের অনেক মিল রয়েছে। এরাও পরিবার আকারে থাকতে পছন্দ করে। একবার কারো সঙ্গে জুটি তৈরি করলে আজীবন তার সঙ্গেই থেকে যায়।
বানরের সঙ্গে উল্লুকের বড় পার্থক্য হলো, এই প্রাণীটির যার লেজ নেই। পুরুষ উল্লুক কালো আর স্ত্রী উল্লুক ধুসর লোমের হয়ে থাকে।
বানর প্রজাতির লেজবিহীন প্রাণীগুলোকে ইংরেজিতে বলা হয় 'এপ'। গরিলা, ওরাং-ওটাং- এসব প্রাণীও 'এপ'-এর অন্তর্ভূক্ত, এবং উল্লুক হচ্ছে সবচেয়ে ছোট জাতের 'এপ'।
বিশ্বে ১৯ ধরণের উল্লুক থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় তিনটি প্রজাতি দেখা যায়।
বাংলাদেশে ওয়েস্টার্ন হোলক গিবন বা পশ্চিমা উল্লুক দেখা যায়।
২০১৯ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু করে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের ২২টি বনে গবেষণা করে ৪৬৮টি উল্লুকের দেখা পেয়েছেন গবেষকরা। সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে মৌলভীবাজারের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে।
ইউএস ফিশ এন্ড ওয়ার্ল্ডলাইফ সার্ভিসের অর্থায়নে এই গবেষণাটি করা হয়েছে।

ছবির উৎস, Sabit Hasan
প্রধান গবেষক এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুন নাহার বলছেন, ''পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য এই প্রাণীটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এরা ফলের বীজ বনাঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। যার মাধ্যমে অরণ্যের বিস্তারে সহায়তা হয়।''
উল্লুকগুলো মূলত বড় আকারের গাছের মগডালে বসবাস করে। চলাফেরার জন্য তারা এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফ দিয়ে বিচরণ করে। এসব প্রাণী খুব একটা মাটির কাছাকাছি নেমে আসে না।
খাবারের জন্যও বিভিন্ন গাছের ফলমূল, ফুল, কচি পাতা খেয়ে থাকে। এছাড়া পাখির ডিম ও ছোট আকারের পোকামাকড়ও খেয়ে থাকে।
এই প্রাণীটি পরিবার তৈরি করে ছোট ছোট দলে বাস করে। দলে দুইটি থেকে পাঁচটির বেশি থাকে না।
বাংলাদেশে প্রথমবার এই প্রাণীটি নিয়ে গবেষণা করা হয় আশির দশকে। সেই সময় ধারণা করা হতো, দেশে প্রায় তিন হাজার উল্লুক রয়েছে।
তবে নব্বইয়ের দশকে যে গবেষণা করা হয়েছিল, সেখানে দেশে ২০০ উল্লুক আর ২০০০ সালের দিকে করা গবেষণায় ২৮২টি উল্লুকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল।
এই বিষয়ে প্রথম গবেষণা করেছিলেন চট্টগ্রাম প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ ফরিদ আহসান।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''সেই সময় গবেষণায় আমরা তিন হাজার উল্লুক পেয়েছিলাম। তবে যে মেথডে আমরা গবেষণা করেছিলাম, এই প্রাণীটির ওপর সেই মেথড আসলে যায় না। কারণ এটি যেহেতু পরিবার হিসাবে থাকে, সেক্ষেত্রে এটিকে পরিবার ধরে গবেষণা করা উচিত। এখন সেটাই করা হয়েছে।''
তিনি এই বিষয়েই পিএইচডি গবেষণা করেছেন।

ছবির উৎস, Sabit Hasan
সেই গবেষণার সময় পশ্চিমা উল্লুকের বাসস্থান হিসাবে ১৪ বনকে শনাক্ত করা হয়েছিল।
তবে সর্বশেষ গবেষণায় সিলেট ও চট্টগ্রাম এলাকার ২০৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ২২টি বনাঞ্চলের ওপর জরিপ করা হয়। সেখানে কিছু কিছু বন থেকে উল্লুক হারিয়ে গেছে বলে দেখা গেছে। আবার মৌলভীবাজারের রাজকান্দি, পাথারিয়া ও লাউয়াছড়া বনাঞ্চলে অনেক উল্লুক বাস করতে দেখা গেছে।
অধ্যাপক ড. মোঃ ফরিদ আহসান,''অনেক বন থেকে উল্লুক নাই হয়ে গেছে। সার্বিকভাবে বলা যায়, আগের তুলনায় উল্লুকের সংখ্যা কমেছে।''
যেভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে উল্লুক
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে এই প্রজাতির ২৬০০ উল্লুক রয়েছে, যার বেশিরভাগই আসামে। মিয়ানমারে কিছু রয়েছে, যার সংখ্যা পরিষ্কারভাবে জানা যায় না। বাংলাদেশে রয়েছে সাড়ে চারশোর মতো উল্লুক। সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে প্রাণীটি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং প্রধান গবেষক হাবিবুন নাহার বলছেন, ''এর আগে উল্লুক ছিল, এরকম উখিয়া, সাজেক ভ্যালি, চুনাতির মতো কয়েকটি বন থেকে এই প্রাণীটি হারিয়ে গেছে। আবার কিছু সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রাণীটির সংখ্যা বাড়তে দেখা গেছে।''
তিনি বলছেন, বনাঞ্চলে বড় বড় গাছ কেটে ফেলা, খাদ্য সংকট, অবৈধভাবে উল্লুক শিকারের কারণে বনগুলো থেকে এই প্রাণীর সংখ্যা কমছে।
''উল্লুক যেহেতু বড় বড় গাছের মগডালে থাকে, লাফ দিয়ে যাতায়াত করে। সেখানে এরকম গাছ কেটে ফেলা হলে তাদের বাসস্থানের পরিবেশে নষ্ট হয় যায়, চলাফেরা সীমিত হয়ে যায়। আবার তারা যেসব খাবার খায়, সেই গাছগুলো কেটে ফেলা হলে খাবারের জন্যও সংকট তৈরি হয়। ফলে অনেক বন থেকে প্রাণীটি হারিয়ে গেছে,'' তিনি বলছেন।
অনেকে পোষার জন্য বেআইনিভাবে উল্লুক আটকে রাখে। কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এই প্রাণীটি খাবার হিসাবেও খায়।

ছবির উৎস, Sabit Hasan
অধ্যাপক হাবিবুন নাহার বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের বনে যতগুলো উল্লুক রয়েছে, এখনো ব্যবস্থা নিলে এগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
''বনাঞ্চলের যেকোনো গাছ কাটার আগে বা পরিবর্তন আনার আগে বিবেচনায় নেয়া উচিত যে, বনের কোন প্রাণী এসব গাছের ওপর নির্ভরশীল কিনা। এছাড়া এসব প্রাণীর পরিবেশ যাতে কোন কারণেই বিঘ্নিত না হয়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। পাচার, শিকার বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।'' তিনি বলছেন।
তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, উল্লুকের বিচরণের সুবিধার জন্য গাছ লাগিয়ে দিয়ে একেকটি বন থেকে আরেকটি বনের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে দেয়া যায়। তাহলে তাদের যাতায়াত সহজ হবে।
মানুষের মতো পরিবার উল্লুকের
গবেষক হাবিবুন নাহার বলছেন, ''মানুষের জীবনাচরণের সঙ্গে এদের বেশ মিল রয়েছে। ওদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ওরা মানুষের মতোই একত্রে পরিবার তৈরি করে থাকে। এদেরকে অনেক সময় আমরা ছোট বনমানুষ বলি।
তিনি জানান, এই প্রাণীটি যদি একবার জোড়া বাধে, সেটি সারা জীবনের জন্য জোড়া তৈরি করে। এমনকি তাদের একটি যদি মারা যায়, তাহলে অন্যটি আর কারও সঙ্গে নতুন করে জোড়া তৈরি করে না।
মানুষের মতোই উল্লুকগুলো ছোট ছোট পরিবার তৈরি করে। স্বামী-স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে তারা ছোট ছোট পরিবার আকারে বাস করে।
বনের লম্বা গাছের উপরের দিকের ডালে এসব প্রাণী বাস করে।

ছবির উৎস, Sabit Hasan
উল্লুকের একবারে একেকটি বাচ্চা হয়। সাধারণত একেকটি উল্লুকের বাচ্চা হতে ৬/৭ মাস সময় লাগে। পাঁচ-ছয় বছরের দিকে একেকটি বাচ্চা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠলে পরিবার থেকে বেরিয়ে যেতে হয়।
বাচ্চাটি পুরুষ হলে বড় হওয়ার পর বাবা তাকে তাড়িয়ে দেয়। আবার মেয়ে বাচ্চা প্রাপ্তবয়স্ক হলে মা তাকে তাড়িয়ে দেয়।
প্রাপ্তবয়স্ক এসব উল্লুক তখন পরিবার থেকে বেরিয়ে আরেকটি নারী বা পুরুষ উল্লুকের সঙ্গে জোড়া তৈরি করে নতুন পরিবার তৈরি করে।
উল্লুক পরিবার আলাদা আলাদা গাছে থাকে। একটি পরিবার যে এলাকায় থাকে, সেটাকে নিজের বলে মনে করে। সেই এলাকায় অন্য উল্লুকের প্রবেশ তারা সহ্য করে না। বাইরের উল্লুক ঢুকলে তারা চিৎকার করতে শুরু করে।








