টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট: পাকিস্তানের শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা আফগান ক্রিকেটাররা এখন যেভাবে বিশ্ব মাতাচ্ছেন

ছবির উৎস, ICC
- Author, রায়হান মাসুদ
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ওয়ানডে সিরিজে জিতলেও, টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরুর আগে বিশ্লেষক কিংবা সমর্থকদের কেউই নিশ্চিত 'ফেভারিট' তকমা দিতে পারছেন না বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে।
আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট সিরিজে মুখোমুখি হচ্ছে বৃহস্পতিবার থেকে। ঢাকার মিরপুরে হবে এই সিরিজ।
একদিকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের দুর্বলতা তো আছেই, অন্যদিকে আফগানিস্তানের ক্রিকেটাররা বিশ্বব্যাপীই একটা সমীহ আদায় করেছে এই ফরম্যাটের ক্রিকেটে।
ভারতের ক্রিকেট বিশ্লেষক জয় ভট্টাচার্যের মতে, "আফগানিস্তানের শুধু প্রয়োজন বড় দলের বিপক্ষে আরও বেশি ক্রিকেট খেলা। এই দলটা যত খেলবে ততই উৎকর্ষের দিকে যাবে।"
এই বছর কয়েক আগেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সহযোগী দেশগুলোর সাথে শক্তিমত্তার তুলনা করা হতো আফগানিস্তানের।
জনপ্রিয় ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ হারশা ভোগলে মনে করেন, "এখন আয়ারল্যান্ড, নামিবিয়া, জিম্বাবুয়ের মতো দলগুলো এখন আফগানিস্তানকে বড় দলের কাতারেই দেখে, এমনকি দেখেন বাংলাদেশও এখন আফগানিস্তানের সাথে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলার আগে বড় প্রেক্ষাপটে ছক কষে।"
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিবেচনা করলে আফগানিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে এখন পর্যন্ত বেশ এগিয়ে, মুখোমুখি হয়েছে ছয় ম্যাচ যার মধ্যে টানা চারটিতেই জয় পেয়েছে আফগানিস্তান।
বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্রিকেট কোচ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের গেম ডেভেলপমেন্টের সাবেক ন্যাশনাল ম্যানেজার নাজমুল আবেদীন ফাহিম মনে করেন, নিজেদের ক্রিকেট খেলা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন না আফগান ক্রিকেটাররা, তারা সবসময় যে পর্যায়ে আছেন তার পরের পর্যায়ে যেতে চান, এটাই তাদেরকে এখন বড় দলগুলোর কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
আক্ষরিক অর্থেই আফগানিস্তানের ক্রিকেটারদের বাজারদর এখন অনেক বেশি, বিশেষত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে আফগানিস্তান থেকে চারজন ক্রিকেটারকে নেয়া হয়েছে।
রশিদ খান তো আছেনই, নুর মোহাম্মদ, চলতি সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশের টপ অর্ডার কাঁপিয়ে দেয়া ফজল হক ফারুকী এবং মোহাম্মদ নবী খেলবেন ২০২২ সালের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ।

ছবির উৎস, Ratan Gomez
পাকিস্তানের রিফিউজি ক্যাম্পে জন্ম
আফগানিস্তানের ক্রিকেট আপাতত দৃশ্যমান হলেও আফগান ক্রিকেটারদের অনেকেই নিজ দেশে ক্রিকেটটা শেখেননি।
বিবিসি সংবাদদাতা জাফর হান্দের লেখা অনুযায়ী, "২০১৫ সালে যখন আফগানিস্তান ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলার টিকিট পেল তখন মূলত আফগানিস্তানের মূল ভূখন্ডে ক্রিকেট জনপ্রিয়তা পায়। এর আগে আফগানিস্তানে ক্রিকেটকে বিদেশি খেলা হিসেবে দেখা হতো এবং বলা হতো এটা খেলে কী ফায়দা?"
আশির দশকে আফগান ও সোভিয়েতের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় তৈরি হয় ক্যাম্প।
এমনই একটি ক্যাম্পে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলেন জাফর হান্দ, "জালোযাই ক্যাম্পে পাকিস্তানের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছিল, সময়টা ১৯৯২ সাল, পাকিস্তান ক্রিকেট বলতে পাগল, ক্যাম্পেও তার প্রভাব ছিল, সেই ক্যাম্পেই আফগানিস্তানেরও ক্রিকেট দল হতে পারে, এমন একটা স্বপ্নের জন্ম হয় যেটা বাস্তবায়িত হয় ১৯৯৫ সালে, যখন আফগানিস্তান ক্রিকেট ফেডারেশন গঠিত হয়।"
নাজমুল আবেদীন ফাহিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যে প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানের ক্রিকেট দলটা তৈরি হয়েছে তা ক্রিকেটারদের আরও শক্তিশালী করেছে মানসিকভাবে। বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের পরিচিত করার পাশাপাশি তাদের মধ্যে একটা তাড়না ছিল আফগানিস্তান দলটাকেও একটা অবস্থানে নিয়ে যাওয়া, যেটা অনেকটাই তারা করেও দেখিয়েছে।"
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post
প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তা
আফগানিস্তানের ক্রিকেটাররা এখন বিশ্বব্যাপী টি-টোয়েন্ট লিগগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।
বিগ ব্যাশ থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সুপার লিগ কিংবা ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ এসব জায়গায় আফগানিস্তানের ক্রিকেটারদের একটা কদর তো আছেই একইসাথে আফগানিস্তানের জাতীয় দলকে সরাসরি সাহায্য করে ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ আফগানিস্তানের বিপক্ষে অ্যাওয়ে সিরিজ খেলেছে ভারতের মাটিতে, দেরাদুনে।
যেহেতু আফগানিস্তানে একটা সংকট চলছে এটাকে অন্য ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলো মাথায় রাখে বলছেন নাজমুল আবেদীন ফাহিম।
যার ফলে তারা বিশ্বের নানা দেশের ক্রিকেট খেলার সুযোগ পায়।
নাজমুল আবেদীন ফাহিম মনে করেন এই জায়গায় আফগানিস্তান বাংলাদেশের চেয়েও এগিয়ে, "যেহেতু বাংলাদেশে ঘরোয়া ক্রিকেটেই মান বিচার করা হয় এক্ষেত্রে অনেক ক্রিকেটার নিজেদের যে গন্ডি তার ভেতরেই সন্তুষ্ট থাকে, তারা আর পরের ধাপটায় যাওয়া নিয়ে ভাবে না। কিন্তু আফগান ক্রিকেটাররা এখানে ভিন্ন একটা সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে। যার ফলে সামর্থ্যকে ছাড়িয়ে যান অনেকে।"
ক্রিকেটের সবচেয়ে সফল দেশ অস্ট্রেলিয়ার টি-টোয়েন্টি লিগ বিগ ব্যাশে রশিদ খানের চাহিদা দেখলেই বলে দেয়া যায় তার দক্ষতা কতখানি।
জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'বিগ ব্যাশের সর্বকালের সবচেয়ে দামি ক্রিকেটার রশিদ খান'।
রশিদ খান লেগ স্পিন করেন জোরের ওপর, তার বলে বৈচিত্র্য আছে, ব্যাট হাতেও কার্যকরী ইনিংস খেলতে পারদর্শী তিনি - এসব কিছু টি-টোয়েন্টি লিগগুলোতে তাকে অনন্য এক ক্রিকেটার করে তুলেছে।
ক্রিকেটের প্রতি নিবেদন
নাজমুল আবেদীন ফাহিম কিছুদিন আগেই শেষ হওয়া বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের রানার আপ ফরচুন বরিশালের ক্রিকেট উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।
কাছ থেকে দেখেছেন আফগানিস্তানের মুজিব উর রহমানকে।

ছবির উৎস, AFP
"আফগানিস্তানের ক্রিকেটারদের তীব্রভাবে চেষ্টা করার একটা সংস্কৃতি আছে। মুজিব সহসাই অনুশীলন মিস করেননি। বাড়তি পরিশ্রম করেছেন, বোলিং তো করেছেনই ফিল্ডিং ও ব্যাট হাতেও অনুশীলন করেছেন তিনি।"
মি. ফাহিমের মতে, "আফগানিস্তানের দলটার মধ্যে কিছু করে দেখানোর বিষয় আছে। ওদের অতীতে যেসব সংগ্রাম দেখে আসতে হয়েছে তাতে দলটা ভিন্ন আঙ্গিকে তৈরি করেছে।"
বড় আসরে ব্যর্থ কেন
আফগানিস্তানকে দেখা যায় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বাজার মাতালেও দল হিসেবে বিশ্বকাপের মতো আসরে খুব ভালো করেনি।
হারশা ভোগলে ক্রিকেট ওয়েবসাইট ক্রিকবাজের হয়ে বিশ্লেষণে বলেছেন, "ছোট ছোট অবদানগুলো এক হয়েও অনেক সময় হয় না, দলীয় সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। আফগানিস্তান যেহেতু খুব বেশি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পায় না, তাই দলটার এক হয়ে খেলা হয় না।"
টি-টোয়েন্টি লিগগুলোতে আফগানিস্তানের ক্রিকেটাররা একে অপরের বিপক্ষে খেলে, যেমন এবার আইপিএলে রশিদ খান খেলবেন আহমেদাবাদের হয়ে, নবী খেলবেন কলকাতায়।
নাজমুল আবেদীন ফাহিমের মতে, "বাংলাদেশ এই একটা জায়গায় এগিয়ে, বাংলাদেশ দল হিসেবে বড় আসরে ভালো খেলে।"
তবে তিনি মনে করেন, দ্বিপাক্ষিক সিরিজে আফগানিস্তানকে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে হারানো সহজ হবে না।

ছবির উৎস, Getty Images
রশিদ খান বিশ্বতারকা
রশিদ খানকে এখন পেতে চাইবে যে কোনও টি টোয়েন্টি দল, ইংল্যান্ডে সাসেক্সের হয়ে খেলছেন তিনি, অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশে অ্যাডেলেইড স্ট্রাইকার্সের বড় তারকা তিনি।
এই ২০২১-২২ মৌসুমেও ১১ ম্যাচে ২০ উইকেট নিয়েছেন রশিদ খান, এক ম্যাচে ১৭ রান দিয়ে ৬টি উইকেট নিয়েছেন তিনি।
পাকিস্তান সুপার লিগে এই মৌসুমে খেলেছেন লাহোর কালান্দার্সের হয়ে, এমনও শোনা গেছে তার পিএসএল দলটি তাকে ফাইনালে লাহোরে পাওয়ার জন্যও তদবির করেছে।
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post
শেষ পর্যন্ত রশিদ খান টুইট করে জানিয়েছেন যে তিনি যাচ্ছেন না।
এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ- এসব দেশের ক্রিকেট লিগেও রশিদ খান জনপ্রিয় তারকা।
এছাড়া মুজিব উর রহমান ব্রিজবেন হিটের হয়ে খেলেন বিগ ব্যাশে।









