আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বাংলাদেশে একুশে পদক কে কে পাবেন তা কীভাবে নির্ধারিত হয়, কারা করেন
- Author, শাহনাজ পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
একুশে পদককে বাংলাদেশের বেসামরিক নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেয়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আজীবন কৃতিত্ব ও অবদানের জন্য এই সম্মাননা দেয়া হয়ে থাকে। এ বছর ২৪ জনকে একুশে পদক দেয়া হয়েছে।
যেভাবে শুরু
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একুশে পদক দেয়া শুরু হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর প্রবর্তন করেন।
সবচেয়ে প্রথম এই সম্মাননা পেয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। একই বছর কবি জসীম উদ্দিন এবং বেগম সুফিয়া কামাল এই সম্মাননা পেয়েছিলেন। সে বছর শুধুমাত্র সাহিত্য, শিক্ষা এবং সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য এই সম্মাননা দেয়া হয়েছিল।
এর পরের বছর সঙ্গীত ও চারুকলা যোগ হয়েছিল এবং উনিশশ' আশি ও নব্বই-এর দশকের দিকে এই ক্ষেত্রগুলোই প্রাধান্য পেয়েছে। এর পরে ধীরে ধীরে অন্যান্য নানা ক্ষেত্র যুক্ত হতে থাকে।
বর্তমানে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিল্পকলা, শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ মোট ১২ টি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য এই সম্মাননা দেয়া হয়।
প্রথম দু'দশকের কিছু বেশি সময় এই সম্মাননা দেয়া হতো শুধু ব্যক্তিদেরকে তাদের কৃতিত্ব বা অবদানের জন্য। এখন গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানকেও একুশে পদক দেয়া হচ্ছে।
কারা কিভাবে নির্বাচন করেন?
একুশে পদক সংক্রান্ত একটি নীতিমালা তৈরি হয় ২০১৯ সালের শেষের দিকে । নীতিমালা অনুযায়ী পাঁচজন সদস্যের একটি সাব-কমিটি রয়েছে।
যার সদস্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অথবা প্রতিমন্ত্রী, একই মন্ত্রণালয়ের সচিব, তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের একজন যাকে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদা সম্পন্ন বা তার উপরে হতে হবে।
যখন যে কর্মকর্তা এই পদে থাকেন - পদাধিকার বলে তারা প্রতি বছর একুশে পদকের বাছাই কমিটিতে থাকেন। এই কমিটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থা, সকল মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকদের কাছে নাম প্রস্তাবের আহবান জানায়।
অর্থাৎ যারা নাম প্রস্তাব করেন, তারাও মূলত সরকারি কর্মকর্তা। এছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং এর আগে স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কেউ নাম প্রস্তাব করতে পারবেন।
নাম প্রস্তাব করতে হলে ব্যক্তি সম্পর্কে ৩৫০ শব্দের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত দিতে হয়। জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাছাই কমিটি নাম চূড়ান্ত করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠায়।
প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে পদকপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করার কথা।
পদক ছাড়াও আর কি দেয়া হয়?
সম্মান ও কাজের স্বীকৃতি ছাড়াও পদকপ্রাপ্তরা আর কী পান - সেনিয়ে অনেকের কৌতূহল রয়েছে।
পদকটি তৈরি হয় আঠারো ক্যারাট ও পঁয়ত্রিশ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ দিয়ে তৈরি। সাথে দেয়া হয় চার লাখ টাকা এবং পদকের একটি রেপ্লিকা।
যোগদানকারী যদি দুরে বা বিদেশে থাকেন, পদক বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য যে ধরনের যানবাহনে তিনি আসবেন - তাকে সেই যানবাহনের প্রথম শ্রেণীর যাতায়াত ভাড়া দেয়া হয় । তিন দিনের ভাতাও পেয়ে থাকেন।
বিবিসি বাংলায় সম্পর্কিত আরো খবর:
মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন
তবে স্বাধীনতা পদক বা একুশে পদকের মত রাষ্ট্রীয় পদক বা সম্মাননা কারা পাবেন, বা যে কমিটি তা নির্বাচন করে - সেই মনোনয়নের প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশে ২০২০ সালে স্বাধীনতা পুরষ্কারের জন্য সাহিত্য ক্যাটাগরিতে একজনের নাম ঘোষণা করার পর এর তুমুল সমালোচনা হয়েছিল।
অনেকেই তখন সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেন যে তারা পুরস্কৃত ব্যক্তির নাম শোনেননি কিংবা তার সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা নেই।
তাদের একজন ছিলেন বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। তিনি ফেসবুকে এক পোস্টে লেখেন: "এবার সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার পেলেন রইজউদ্দীন, ইনি কে? চিনি না তো। কালীপদ দাসই বা কে! হায়! স্বাধীনতা পুরস্কার!"
এ নিয়ে তুমুল বিতর্কের মুখে সপ্তাহ তিনেক পর সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি পরিবর্তিত নতুন তালিকা প্রকাশ করে। এই পরিবর্তনের ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কোন ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়নি।
আমলা-রাজনীতিবিদরাই কেন বাছাই করেন?
যে কমিটি একুশে পদকের জন্য নাম নির্বাচন করে তাতে রয়েছেন সরকারি আমলারা, যাদের কিছুদিন পরপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কর্মসূত্রে বদলি করা হয়ে থাকে।
ভাষা, সাহিত্য, অর্থনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সঙ্গীত, নৃত্য, চারুকলার মতো বিষয় তারা কতটা বোঝেন, এসব ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির অবদান বিচার করার কি যোগ্যতা তারা রাখেন - বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে সেই প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন - যিনি নিজেও একুশে পদকপ্রাপ্ত একজন ইতিহাসবিদ।
তিনি বলছেন, "আমলা হোক, মন্ত্রী হোক সবার প্রতি সম্মান রেখে বলছি, যার যে যোগ্যতা নেই - তাকে সেই দায়িত্ব দেয়া ঠিক নয়। যিনি বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের জন্য স্বীকৃত হবেন, তাদের নির্বাচন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেন এমন কাউকেই করতে হবে।"
আমলা ও রাজনীতিবিদেরাই কেন বাছাই-এর দায়িত্বে থাকেন সে নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক হোসেন। তিনি বলছেন, নিজে একুশে পদক পেয়েছেন - এটি বলতে তিনি রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করেন।
তার মতে, কোন পদকের জন্য কোন ব্যক্তিকে নির্বাচন করার জন্য সমান যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরই দায়িত্ব দিতে হবে।
"ধরুন কথার কথা একজন শিল্পীকে যদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন, অথবা একজন সাহিত্যিককে কৃষি মন্ত্রণালয়, তিনি কি সেটি করতে পারবেন? যারা বাছাই কমিটিতে আছেন - তারা ভাল সরকারি কর্মকর্তা হতে পারেন, কিন্তু তারা সবাই কি ভাষা, সাহিত্য, শিল্পকলায় দক্ষ? তারা এসব কাজের মান কিভাবে বুঝবেন? মাঝে মধ্যে যোগ্য মানুষ দেখা যায়। কিন্তু সিংহভাগ ক্ষেত্রে অযোগ্য মানুষ পায়।"
বিবিসি বাংলায় সম্পর্কিত আরো খবর:
রাজনীতিকীকরণের অভিযোগ
এই পদকটিকে "রাজনীতিকীকরণ" করা হয়েছে বলেও অতীতে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলের পছন্দের না হলে পদকটি পাওয়া যায় না বলেও মনে করেন অনেকে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ও বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন বলছেন, "একটি সময় ছিল যখন একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, বাংলা একাডেমি পদক খুব প্রেস্টিজিয়াস বিষয় ছিল এবং যারা পেতেন তাদের নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠত না। কিন্তু বেশ কিছু বছর ধরে আমরা দেখছি এমন অনেককে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পের সাথে জড়িত বলে এই পদক দেয়া হচ্ছে যাদের নাম আমরা হয়ত এই প্রথম শুনলাম। হতে পারে যে আমার পাঠক হিসেবে দুর্বলতা রয়েছে তাই পড়িনি, কিন্তু পদক পাওয়ার পর যখন লেখা পড়তে গেলাম তখন মনে হয় যথাযথ জায়গায় সম্মাননাটা যায়নি।"
কাবেরী গায়েন বলছেন, "আমরা বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় দেখেছি, যার যে দলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে মনে হয়, যারা ওই ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী তাদের পদক পাওয়ার সুযোগ বেড়ে যায়। এমন অনেককে দেয়া হয়েছে যাদের দিকে অনেকেই আঙুল তুলে বলেছেন ওই সরকারের যে রাজনৈতিক মতাদর্শ তার সাথে সম্পর্কিত বলে তাকে এই পদক দেয়া হয়েছে। এই যে প্রশ্নগুলো উঠছে, এসব কারণে সাধারণ মানুষজনের মধ্যে এই পদক কে পেল - সে সম্পর্কে আগ্রহও চলে গেছে।"
এসব অভিযোগ সম্পর্কে সাব-কমিটির সকলের সাথে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে বিবিসি বাংলা। কিন্তু কারো দিক থেকেই জবাব পাওয়া যায়নি।