কক্সবাজারে বন্যহাতির হামলায় একজন নিহত, সুনামগঞ্জেও হাতির পাল

হাতিরা লোকালয়ে চলে আসে মাঝে মাঝে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হাতিরা লোকালয়ে চলে আসে মাঝে মাঝে
    • Author, ফারহানা পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের কক্সবাজারের চকোরিয়া উপজেলায় পাহাড়িবিল গ্রাম আজ সোমবার এক বন্যহাতির আক্রমনে একজন মারা গেছে।

স্থানীয় প্রশাসন বলছে মৃত ব্যক্তির নাম পরিচয় এখনো জানা না গেলেও তিনি যে এলিফেন্ট রেসপন্স টিমের একজন সদস্য ছিলেন সেটা নিশ্চিত করেছেন।

চকোরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেপি দেওয়ান বলেন, ঐ এলাকায় বন্যহাতি লোকালয়ে চলে আসা নতুন কিছু না।

তিনি বলেন পাহাড়িবিল গ্রামে আজ সকাল থেকে হাতিটি কয়েকটি বাড়িঘর ভাংচুর এবং ফসলের ক্ষতি করে।

"এই ঘটনা যেহেতু সেখানে ঘটে তাই এলিফেন্ট রেসপন্স টিম কাজ করে। এই টিমের একজন প্রথমে হাতিটিকে তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। তিনি আগুন জ্বালিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু হাতিটি তার দিকে তেড়ে এসে তাকে পিষ্ট করে"।

হাতি তাড়াতে বনভূমির ভেতরেই মানুষ আগুন জ্বালিয়ে দেয়

ছবির উৎস, MOHAMMED MOSTAFA FEEROZ

ছবির ক্যাপশান, হাতি তাড়াতে বনভূমির ভেতরেই মানুষ আগুন জ্বালিয়ে দেয়

ঐ ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই মারা যান বলে জানাচ্ছেন মি.দেওয়ান।

তিনি বলেন এই হাতিগুলো বান্দরবন থেকে আসে। কারণ চকোরিয়া উপজেলা ভৌগলিকভাবে বান্দরবনের খুব কাছে।

এদিকে এই ঘটনা বাংলাদেশের অনেক গণমাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করা হয়।

সেখানে দেখা যায় হাতিটি একই স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। এক পর্যায়ে সেটি কয়েকটি গাছ উপড়ে ফেলে। আর দূরে স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন এবং সাধারণ মানুষ দাড়িয়ে আছে।

আরো পড়ুন:

চকোরিয়া বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন গাছ কেটে বন উজাড় করে ফেলার কারণে হাতিদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যহত হচ্ছে। ফলে এই ঘটনা ঘটছে।

জেপি দেওয়ান বলেন সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ( সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা) হাতিটি পাহাড়ি বিলগ্রাম এলাকায় অবস্থান করছে।

বনবিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন মানুষের আনাগোনা যখন থাকবে না তখন অন্ধকার নামলে তখন হয়তো সেটি চলে যাবে। অন্ধকার নেমে এলে মানুষজন চলে গেলে হাতিটা স্থান ত্যাগ করবে বলে তারা আশা করছেন।

শেরপুরের বনাঞ্চলে অনেক হাতি ভারতের মেঘালয় থেকে খাবারের সন্ধানে বাংলাদেশের দিকে চলে আসে।

ছবির উৎস, MOHAMMED MOSTAFA FEEROZ

ছবির ক্যাপশান, শেরপুরের বনাঞ্চলে অনেক হাতি ভারতের মেঘালয় থেকে খাবারের সন্ধানে বাংলাদেশের দিকে চলে আসে।

এদিকে গতকাল রোববার সুনামগঞ্জে তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত অতিক্রম করে সাতটি বন্য হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

রোববার সকালে হাতিগুলো উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের বড়গোপটিলা জঙ্গলে অবস্থান নেয়।

তাহিরপুর থানার ওসি আব্দুল লতিফ সরদার বলেন, রোববার সকালে সেখানকার মানুষদের কাছ থেকে খবর পান হাতির আতঙ্কে রয়েছে মানুষ। তখনি বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়িকে খবর দিয়ে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।

তিনি বলেন "এএসআই বিভিন্ন গ্রামের মসজিদের মাইকে জনগণকে হাতি না মারতে আহ্বান জানিয়েছেন। হাতির আক্রমণ থেকে বাঁচতে বাড়ির সামনে আগুন জ্বালিয়ে অবস্থানেরও কথা বলা হয়েছে"।

তাহেরপুর বন বিভাগের কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, "আমরা চাচ্ছি, হাতিগুলো স্বাভাবিক নিয়মে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তাদের আস্তানায় চলে যাক"।

হাতিরা কেন লোকালয়ে চলে আসে?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং এশিয়ান এলিফেন্ট স্পেশালিষ্ট গ্রুপের সদস্য মোহাম্মদ মোস্তাফা ফিরোজ জানান হাতি লোকালয়ে আসছে না বরং হাতির আবাসভূমিতে মানুষ ঢুকে পড়ে হাতির জায়গা দখল করছে।

সন্ধ্যা নামলে হাতিরা সমতলের দিকে আসে। তখনই তারা মানুষের হামলার মুখে পড়ে।

ছবির উৎস, MOHAMMED MOSTAFA FEEROZ

ছবির ক্যাপশান, সন্ধ্যা নামলে হাতিরা সমতলের দিকে আসে। তখনই তারা মানুষের হামলার মুখে পড়ে।

তিনি জানান, হাতিরা বংশ পরম্পরায় হাজার হাজার বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট রুট ধরেই চলাচল করে। সম্প্রতি পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন হাতির সেই সেই বিচরণক্ষেত্র পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষভাবে চিহ্নিত করেছে।

তারপরও সেই বিচরণ ক্ষেত্রে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে মানুষ বসতি গড়ে তুলছে। আবার অনেকে বন বিভাগের জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করছে।

"হাতি তার বিচরণ-ক্ষেত্রে কিছু পেলেই সেটা লণ্ডভণ্ড করে দেয়। সেখান থেকেই হাতি আর মানুষের দ্বন্দ্ব বাড়ছে। আর এভাবে এতোগুলো হাতি প্রাণ হারিয়েছে। কোথাও বিদ্যুতের ফাঁদ পেতে মারছে, কোথাও তো গুলি করেও মারা হচ্ছে," বলেন মি. ফিরোজ।

চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের বনাঞ্চলের হাতিগুলো সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। রোহিঙ্গারা যেখানে বসতি করেছে সেটা পুরোটাই হাতির বিচরণক্ষেত্র।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতি মিয়ানমার থেকে এই রুটেই টেকনাফ বনে যায়। সেই রাস্তায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প হওয়ায় হাতিগুলো একপ্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আর যেগুলো পারাপারের চেষ্টা করেছে সেগুলো মানুষের হামলার মারা পড়ছে।

অন্যদিকে শেরপুরের বনাঞ্চলে অনেক হাতি ভারতের মেঘালয় থেকে খাবারের সন্ধানে বাংলাদেশের দিকে চলে আসে। বিশেষ করে বর্ষার পরে যখন নতুন ঘাস জন্মায় এবং পাকা ধানের মৌসুমে।

এখন অনেক হাতিই এখানে থেকে যাচ্ছে, বাচ্চা প্রসব করছে।

কিন্তু গত এক দশকে বন বিভাগের বহু জমি মানুষের দখলে চলে যাওয়ায় হাতির এই বিচরণক্ষেত্র তাদের জন্য আর নিরাপদ নেই।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন: