কার্ড জালিয়াতি করতে গিয়ে যেভাবে ঢাকায় ধরা পড়লো ভারত থেকে পালানো তুর্কি নাগরিক

ঢাকার গুলশান থেকে ১৮ই জানুয়ারি দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যারা পুলিশের ভাষায় আন্তর্জাতিক জালিয়াত চক্রের সদস্য।
পুলিশ বলছে, জানুয়ারির দুই থেকে চার তারিখের মধ্যে ৮৫ বার দেশের বেসরকারি ব্যাংক ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড ইবিএলের বিভিন্ন এটিএম বুথে ঢুকে এই লোকেরা কার্ড স্কিমিং এর মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু ব্যাংকটির অ্যান্টি-কার্ড স্কিমিং প্রযুক্তির কারণে জালিয়াতির চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম সিস্টেমের মাধ্যমে প্রথমে ব্যাংক ও তারপর পুলিশের কাছে প্রায় সাথে সাথেই সেই তথ্য চলে আসে।
পুলিশ বলছে, এরপর মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং এর মাধ্যমে অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালিয়ে একজন সহযোগীসহ ওই তুর্কি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এনিয়ে পুলিশ একটি সংবাদ সম্মেলন করেছে ঢাকায়।
আরো পড়তে পারেন:
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার ফারুক হোসেন বলছেন, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি আন্তর্জাতিক কার্ড জালিয়াত চক্রের সদস্য, তার নাম হাকান জানবারকান।
ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, তদন্তে তারা জানতে পেরেছেন তুরস্কের নাগরিক এই লোকটি ২০১৯ সালে ভারতের আসাম রাজ্যে এক পুলিশ স্টেশনের এটিএম মেশিনে কার্ড স্কিমিংয়ের মাধ্যমে জালিয়াতি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন।
তারপর ভারতের জেলখানায় ২০ মাস কারাভোগ করেছেন তিনি। তবে এক পর্যায়ে জেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেবার সময় তিনি পালিয়ে যান।
এরপর সেখান থেকে সিকিম হয়ে তিনি চলে যান নেপাল, আর নেপাল থেকে তুরস্ক।
তুরস্কে ফিরে নতুন পাসপোর্ট নিয়ে ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে বাংলাদেশে আসেন।

পল্টনের এক হোটেলে আস্তানা গেড়ে বাংলাদেশের কয়েকজন নাগরিককে সাথে নিয়ে এটিএম কার্ড জালিয়াতির চেষ্টা চালানো করছিলেন।
কেন সফল হতে পারেনি এটিএম কার্ড জালিয়াত
বাংলাদেশে ব্যাংকের প্রচলিত লেনদেনের পাশাপাশি ডেবিট এবং ক্রেডিট কার্ড চালু এবং জনপ্রিয় হয়েছে মূলত গত দুই দশকে।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিএম বুথকেন্দ্রিক জালিয়াতিও শুরু হয় দ্রুতই।
গত কয়েক বছর যাবত বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এটিএম বুথ থেকে কার্ড ক্লোন করে গ্রাহকের তথ্য চুরি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
দেশে-বিদেশী এমন বেশ কয়েকটি জালিয়াত চক্রের সদস্যদের গত কয়েক বছরে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এমনকি মহামারির মধ্যে লকডাউন চলার মধ্যেও জালিয়াত চক্রের তৎপরতা দেখা গেছে।
কার্ড জালিয়াতির অভিযোগ যখন ক্রমেই বাড়ছিল, সেসময় অনেকটা বাধ্য হয়েই সতর্ক হতে হয় ব্যাংকগুলোকে।

ছবির উৎস, Getty Images
এবারও ব্যাংকের সতর্কতার কারণেই এটিএম বুথ থেকে ক্লোন করা কার্ড দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিতে পারেনি জালিয়াতরা।
ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের কমিউনিকেশন অ্যান্ড এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান জিয়াউল করিম বিবিসিকে বলেছেন, গ্রাহকদের সুরক্ষায় ব্যাংকটি অত্যাধুনিক নজরদারির ব্যবস্থা করেছে।
দেশজুড়ে ইবিএলের ২০০টির বেশি এটিএম বুথের সব ক'টিতেই অ্যান্টি-স্কিমিং এবং অ্যান্টি-ম্যালওয়্যার সফটওয়্যারের মাধ্যমে সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
সেই সাথে এটিএম মেশিনের সাথে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম সিস্টেমের ব্যবস্থা করা হয়েছে - আর সেখান থেকেই ব্যাংকটি প্রথম জানতে পারে এই আক্রমণের কথা।
মি. করিম জানিয়েছেন, এরপর ইবিএল সাথে সাথে পুলিশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে জানায়।
এছাড়া ডিজিটাল কর্মকাণ্ড মনিটর করার জন্য সার্বক্ষণিক একটি টিম রয়েছে ইবিএলের, ফলে প্রতারকদের জন্য কাজটি কঠিন বলে মনে করেন মি. করিম।
এদিকে, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ বলছে, কার্ড জালিয়াতি ঠেকাতে এখন বেশিরভাগ ব্যাংক এটিএম বুথে অ্যান্টি স্কিমিং মেশিন বসিয়েছে।
সেই সাথে কোন কোন ব্যাংক নিজেদের ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডে এমন ব্যবস্থা করেছে যা ক্লোন করা প্রায় অসম্ভব।
তারপরেও এটিএম বুথগুলোর নানা সীমাবদ্ধতার সুযোগ নেয় জালিয়াতরা।
বাংলাদেশে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী দেশে ঘটা সাইবার ক্রাইমের একটি বড় অংশই হয় আর্থিক খাতে, বিশেষ করে কার্ড জালিয়াতি এবং মোবাইল মানি লেনদেনের ক্ষেত্রে।








