'ভুল দেহে' জন্ম নিয়ে লিঙ্গ ও যৌন পরিচয়ের বিড়ম্বনায় নিশাত

    • Author, মুন্নী আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

ধরে নেই, তার নামটি নিশাত। নিরাপত্তার কারণেই এখানে তার নামটি পাল্টে দেয়া হলো। বাংলাদেশেরই কোন একটি জেলার গ্রামে তার জন্ম। বেড়ে ওঠাও সেখানেই।

জৈবিক গঠন অনুযায়ী নিশাত এখন একজন যুবক। তবে মন, আবেগ আর যৌন পরিচয়ের দিক থেকে নিজেকে একজন নারী হিসেবে অনুভব করেন তিনি।

নিশাতের এই পরিবর্তনটি একটু একটু করে ধরা পড়তে থাকে বেশ আগে। তখন সবে মাত্র প্রাইমারির গণ্ডি পেরিয়েছে সে। ওই বয়সেই নিশাত বুঝতে শুরু করে সে তার অন্য সহপাঠীদের মতো নয়।

কিন্তু এই আলাদা লিঙ্গ আর যৌন পরিচয়ের কারণে কতটা হয়রানি আর ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে নিশাতকে?

'ছোট থেকেই বুলিয়িংয়ের শিকার'

সুযোগ পেলেই মায়ের শাড়ি আর গয়না দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে তোলা ছিল নিশাতের পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে একটি। শৈশব পেরিয়ে মাধ্যমিকের গণ্ডি শুরু হওয়ার পর যখন কৈশোরে পা রাখেন নিশাত, তখন তার দৈহিক অবয়বেও ফুটে ওঠে তার আলাদা হওয়ার নানা বৈশিষ্ট্য।

মেয়েদের মতো কথা বলা, হাঁটা, দাঁড়ি না ওঠা আর আচরণের কারণে নিজের বন্ধুরাই তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতে শুরু করে।

নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া সেই সব স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে ভারী কণ্ঠে নিশাত বলেন, "আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম, তখন আমার ক্লাসের কয়েক জন ফ্রেন্ড ছিল, ওরা আমাকে হাফ লেডিস বলে ডাকতো। এটা আমার গায়ে কাঁটার মতো বিঁধতো।"

"ওরা আমার গায়ে-টায়ে হাত দিতো। আমি খুব ইতস্তত বোধ করতাম।"

এসব ঘটনার জের ধরে স্কুলের প্রতি আতঙ্ক তৈরি হয় তার। বাড়িতে জানালে স্কুল পরিবর্তন করে দেয়া হয়।

তবে স্কুল পরিবর্তন হলেও অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি নিশাতের। সেখানেও নানা রকম হয়রানি বা বুলিয়িং এর শিকার হতে হয়েছে তাকে। পরিস্থিতি অপরিবর্তিত ছিল কলেজে পড়ার সময়ও।

আরো পড়ুন:

নিশাত বলেন, "খুব ভাল ছাত্র ছিলাম। এজন্য কলেজে সামনে কেউ না বললেও পেছনে আমাকে নিয়ে রসিকতা, গুঞ্জন, খারাপ কথা, হাসা-হাসি - এগুলো হতোই।"

"দু'এক জন ছাত্র-ছাত্রী আমাকে ইনডিরেক্টলি হাফ লেডিস, হিজড়া - এগুলো বলতো। একটা সময় খুব ভেঙ্গে পড়েছিলাম।"

'ভুল দেহে জন্ম‌'

নিশাত বলেন, "ক্লাস এইটে পড়ার সময় একটি ছেলেকে ভাল লাগতো। আমার লাইফে কখনো কোন মেয়েকে ভাল লাগেনি। কোন মেয়ের প্রেমেও পড়িনি।"

নিশাত মনে করেন, ভুল দেহে জন্ম হয়েছে তার। ছোট বেলা থেকেই নারী হতে চেয়েছেন তিনি। তবে সমাজ আর পরিবারের ভয়ে সব সময়ই নিজেই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন।

"ভয়ে আমি সব সময় ছেলে মানুষের মতো থেকেছি, ছেলে মানুষের মতো কাপড়-চোপড় পরেছি।"

"আমার কথা বলা, হাঁটা-চলা - সবকিছুতেই মেয়েলি ভাব আছে। কিন্তু বাসে, রাস্তা-ঘাটে চলতে গেলে আমাকে অনেক চেপে চলতে হয়। আমার হাঁটা-টা আমি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারি না। আমাকে স্ট্রেইট হাঁটতে হয়। আমি মেয়েদের মতো কথা বলি বলে আমি স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে পারি না। কারণ মানুষ এগুলো শুনে হাসে।"

পুরুষের প্রতি আকর্ষণ

শিক্ষাজীবন ছাড়িয়ে এখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছেন নিশাত। একই ধরণের হয়রানির মুখোমুখি সেখানেও হতে হয় তাকে। তবে ইদানীং নতুন করে আরেক সমস্যার মুখে পড়েছেন তিনি।

নিশাতের পরিবারের সদস্যরা তাকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। এরইমধ্যে বিয়ের জন্য পাত্রীও দেখা হচ্ছে। কিন্তু নিশাত জানান, পুরুষ হলেও নারীদের প্রতি কোন ধরণের আকর্ষণ বোধ করেন না তিনি। বরং পুরুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন।

সমাজ আর পরিবারের ভয়ে নিজের এই অবস্থার কথা কোন ভাবেই প্রকাশ করতে পারছেন না।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

একই সাথে তিনি চান না যে, বিয়ে করে তার সাথে কোন একটি মেয়েকে জড়িয়ে তার জীবনও দুর্বিসহ হয়ে উঠুক।

"আমার বাবা-মা আন-এডুকেটেড (শিক্ষিত নয়)। তারা এ বিষয়ে কোন ধারণাই রাখে না। শিক্ষিত সমাজই যখন এটা মানতে পারে না, সেখানে তারা কিভাবে এটাকে নেবে?"

শঙ্কিত হয়ে নিশাত জানান, তার এই পরিচয় যদি পরিবার বা সমাজের সামনে আসে তাহলে তার প্রাণ সংশয় দেখা দিতে পারে।

"এক সময় ওদের খারাপ কথার জন্যই দেখা যাবে যে আমাকে গলায় দড়ি দিতে হবে," বলেন তিনি।

আর এটাকেই সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন নিশাত। তিনি বলেন, "না পারছি আমি নিজের মতো বাঁচতে, না পারছি নিজেকে প্রকাশ করতে।"

সর্বস্তরে ঘৃণা

বাংলাদেশে সমকামিতা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এজন্যে সমকামী নারী ও পুরষকে গোপনে তাদের জীবন যাপন করতে হয়।

অনেকে সাধারণ একটি পরিবারের ভেতরে থেকেও দ্বৈত জীবন যাপন করেন।

এ বিষয়ে নিশাত বলেন, সমাজ ব্যবস্থাটা এরকম যে, সেখানে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা অন্যরকম কিছু দেখলেই সেটাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করে। আর এ কারণেই যারা জন্মগতভাবে আলাদা তাদেরকে সারা জীবনই সংগ্রাম করে যেতে হয়।

উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি নিজের করা একটি ফেসবুক পোষ্টের কথা তুলে ধরেন নিশাত। যেখানে নিজের অবস্থা বর্ণনা করে সমাধান চেয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি।

তবে সেই পোষ্টে এতো বেশি নেতিবাচক কমেন্ট আসতে থাকে যে মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর সেটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হন তিনি।

নিশাত বলেন, "ফেসবুকের পোস্টে কমেন্ট দেখলে আপনি নিজেই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তো ওই কমেন্টগুলো কারা করে? তারা তো শিক্ষিত তাই না? তাহলে বোঝেন সমাজ কোথায় আছে?"

'এ জীবন আর চাই না'

এলজিবিটিকিউ কমিউনিটি নিয়ে কাজ করে এমন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কের নয়া সেতু। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা জয়া শিকদার বলেন, যারা এলজিবিটিকিউ এর সদস্য তাদের সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গাটা হচ্ছে তারা কখনো আত্মপ্রকাশ করতে পারে না।

তিনি বলেন, "তার লাইফের যে গল্প সেটাই সে কাউকে বলতে পারে না। সমাজে সে মুভ (চলাফেরা) করতে পারে না।"

শুধু সমাজ নয় বরং রাষ্ট্রও তাকে স্বীকৃতি দেয় না বলে অভিযোগ করেন মিজ শিকদার। কিন্তু এসব মানুষের সমাজে অস্তিত্ব রয়েছে।

তিনি বলেন, "একসময় গিয়ে এ ধরণের মানুষ মনে করে যে, এতো অবজ্ঞা, অবহেলা- একটা সময় গিয়ে ভাবে যে এ জীবন আর চাই না"।

সংগ্রামের শুরু ঘর থেকে

নৃবিজ্ঞানী এবং লিঙ্গ বৈচিত্র্যের বয়ান নামে একটি বইয়ের লেখক জোবাইদা নাসরীন বলেন, এলজিবিটিকিউ এর যারা সদস্য তাদের সংগ্রামটা শুরু হয় পরিবার থেকেই।

লিঙ্গ এবং যৌন পরিচয়ের ক্ষেত্রে বাইনারির বাইরে কোন পরিচয় হলে পরিবারই তাকে মানতে পারে না।

এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরাই তাদের স্বীকৃতি দিতে ভয় পায়, লজ্জা বোধ করে।

পরিবার এমন সদস্যদের লুকিয়ে রাখতে চায় শুধু তাই নয়, বরং তাকে বিভিন্নভাবে হেয় করা এমনকি মারধরও করা হয়।

এছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে যাতে মিশতে না পারে সেজন্য তাদের বাড়ির মধ্যেই আলাদা কক্ষে রাখা হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

"এই যে পরিবারের অনাদর, অস্বীকৃতি প্রথমতো তাকে এক ধরণের বিষণ্ণতায় নিয়ে যায়।"

মিজ নাসরীন বলেন, এই সদস্যদের সাথে কিভাবে আচরণ করতে হবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে বিষয়টি পরিবারের সদস্যরা জানেনই না। তার সব ধরণের অধিকার যেমন শিক্ষা, বাসস্থান, সম্পত্তির অধিকার- এসব কিছু থেকেই তাকে বঞ্চিত করা হয়।

"সমকামী হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদেরকে বাইনারি ওয়ার্ল্ডের এক ধরণের বক্সে ফিট করার চেষ্টা করা হয়।"

তার মতে, পরিবারের এমন আচরণের পেছনে সমাজের ভয় কাজ করে প্রবলভাবে। কারণ সমাজ তাদের ক্ষেত্রে এক ধরণের ঘৃণা সৃষ্টি করে।

এ বিষয়ে জানা-শোনা এখনো অনেক সীমিত হওয়ার কারণে লিঙ্গ বা যৌন পরিচয়ের বিষয়টি এখনো ট্যাবু হিসেবেই রয়ে গেছে। এ নিয়ে সমাজে রয়েছে স্টিগমাও। আর এ কারণেই আগ্রহ থাকলেও অনেকে সামনে এসে এ বিষয়ে কথা বলতে বা বিষয়গুলো নিয়ে জানতে পদক্ষেপ নেয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, সমকামীদের পরিচয় প্রকাশ হওয়ার পর মানুষ তাদের সাথে মিশতে চায় না। এড়িয়ে চলে। তাদেরকে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করে।

আর এই সব ধরণের নেতিবাচক বা 'না'-বোধক আচরণ তাদেরকে সুইসাইডাল টেনডেন্সি বা আত্মহত্যা-প্রবণ হওয়ার দিকেই ঠেলে দেয় বলে মনে করেন মিজ নাসরীন।

উল্টো জীবন যাপন

একটা সময় মনে করা হতো সমকামিতা একটি অসুখ। তাই সেটি সারিয়ে তোলার নানা পদ্ধতি বিভিন্ন সমাজে অবলম্বন করা হয়েছে।

বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরা এখন একমত যে, একজন মানুষ কোন ধরনের যৌনতার প্রতি ঝুঁকবেন, তিনি একই লিঙ্গের কারোর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করবেন নাকি বিপরীত লিঙ্গ বা উভয় লিঙ্গের প্রতি সেটি চাইলেই বদলে দেয়া যায়না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমকামিতাকে মানসিক রোগের তালিকা থেকে সরিয়ে নেয় ১৯৯০ সালে।

আর যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৩ সালে সমকামিতাকে মানসিক রোগের তালিকা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিলো।

তবে বাংলাদেশে এখনো অনেক ক্ষেত্রে সমকামিতাকে রোগ হিসেবেই মনে করা হয় বলে জানান সম্পর্কের নয়া সেতুর প্রতিষ্ঠাতা জয়া শিকদার।

এ বিষয়ে মিজ শিকদার বলেন, কেউ যদি নিজেকে প্রকাশ করে তখন পরিবার ও সমাজ থেকে তাকে মনোবিদের কাছে পাঠানো হয়।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যেটি হয় যে, যে ব্যক্তি যে ধরণের জীবনযাপন করেন, মনোবিদ তাকে তার উল্টো জীবনযাপনের পরামর্শ দেয়।

"কেউ যদি নারী হয়ে নারীকে পছন্দ করেন তাকে যদি বলে যে পুরুষের সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। ভাল হয়ে যাবে। এটা সম্ভব বলেন?"

একই বিষয়গুলো ছেলেদের ক্ষেত্রেও ঘটে বলে তিনি জানান। এসব ক্ষেত্রে শুধু ওই নারী বা পুরুষের জীবন নয় বরং তাদের সাথে বিয়ের মাধ্যমে যারা যুক্ত হন, তাদের জীবনও দুর্বিসহ হয়ে উঠে।

তিনি বলেন, "সমাজের এগুলো বুঝতে হবে, পরিবারকে এগুলো জানতে হবে" ।

রাষ্ট্রের উচিত এই মানুষগুলোকে স্বীকৃতি দেয়া এবং তাদের সাথে যাতে কোন ধরণের বৈষম্যমূলক আচরণ না হয় তার ব্যবস্থা করা।