প্রতিদিন দশ ঘন্টা করে বিমান ওঠানামা বন্ধ, যে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীদের

ছবির উৎস, মোয়াজ্জেম হোসেন
- Author, ফারহানা পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে ১০ ঘণ্টা করে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তির মুখে পড়ছেন যাত্রীরা।
এছাড়া তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ কাজের অংশ হিসাবে ডিসেম্বরের ১০ তারিখ থেকে আগামী তিনমাস রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত রানওয়ে বন্ধ থাকছে।
এর ফলে বাংলাদেশের প্রধান এই বিমানবন্দর ব্যবহারকারী এয়ারলাইন্সগুলোকে তাদের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে। যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, স্বল্প সময়ে বেশি ফ্লাইটের চাপ থাকায় তারা ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এ ব্যাপারে বিমানবন্দরের কর্তৃপক্ষ বিবিসিকে বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের আপাতত আর কিছু করার নেই।
ঢাকার বিমানবন্দরে যাত্রীদের ভোগান্তি,যা দেখলেন বিবিসির সাংবাদিক
হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিস্থিতির এ চিত্র ধরা পড়েছে বিবিসির একজন সাংবাদিকের চোখেও।
নভেম্বরের ২৬ তারিখে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন বিবিসি বাংলার মোয়াজ্জেম হোসেন।
মি. হোসেন টার্কিশ এয়ারলাইন্সের রাত সাড়ে এগারোটার একটি ফ্লাইট ধরার কথা ছিল। বেশ কিছুটা সময় হাতে নিয়ে তিনি রাত আটটার আগেই বিমানবন্দরে পৌঁছান।
দেখা যায়, সেখানে তখন চলছে চরম বিশৃঙ্খলা। বহির্গামী যাত্রীদের যে কোভিড টেস্ট করাতে হয়, সেই পরীক্ষার কোভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেটটি নিয়ে বিমানবন্দরের হেলথ ডেস্কে লাইনে দাঁড়াতে হয়।
একজন কর্মকর্তা একটি স্ক্যানারে সার্টিফিকেটের কিউআর কোড স্ক্যান করে তাতে একটি সীল দেবেন। কাজটি করতে ১৫ সেকেন্ডের বেশি সময় লাগার কথা নয়।
বিমানবন্দর কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, বিমানবন্দরে মোট আটটি হেলথ ডেস্ক রয়েছে।
তবে মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, ২৬ নভেম্বর সেই সময়টায় একটি ডেস্কে একজন মাত্র লোক কাজ করছিলেন। আর লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন ৬০/৭০ জন যাত্রী।
কিন্তু ডেস্কে থাকা কর্মকর্তাটি অনবরত ফোনে কথা বলে যাচ্ছিলেন। তার এক একটি ফোন কল ছিল প্রায় ১০/১৫ মিনিটের। এদিকে লাইন আরও দীর্ঘ হচ্ছিল। এক পর্যায়ে ঐ একটি ডেস্কের সামনেই কয়েকটি লাইন হয়ে যায় এবং যাত্রীদের তুমুল হট্টগোল শুরু হয়।
বিবিসির মোয়াজ্জেম হোসেন এই কর্মকর্তার একটি ভিডিও রেকর্ড করেছেন, তাতে দেখা যায়, তার মুখের মাস্ক খুলে একপাশে ঝুলছে, আর তিনি টেলিফোনে কথা বলে যাচ্ছেন। সামনে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা অধৈর্য হয়ে এর প্রতিবাদ করছেন, কিন্তু ঐ কর্মকর্তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

ছবির উৎস, মোয়াজ্জেম হোসেন
মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন - "এই একটি লোকের কারণেই সেদিন আমি সহ আরও বহু যাত্রীর ৩০/৪০ মিনিট সময় নষ্ট হয়েছে। এবং এর ফলে আমাদের এর পরের ধাপগুলো সারতেও অনেক সময় লেগেছে।"
"আমি যখন ইমিগ্রেশনে গিয়ে লাইনে দাঁড়াই, সেখানেও দেখি চরম বিশৃঙ্খলা। বহু যাত্রী লাইনে দাঁড়িয়ে, লাইন আগাচ্ছে খুবই ধীরে। এর মধ্যে একজন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা এসে কিছু ফ্লাইটের যাত্রীদের ডেকে ডেকে লাইন ভেঙে সামনে ঠেলে দিচ্ছিলেন। ঐ সব ফ্লাইট এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।"
আরো পড়ুন:
"এভাবে পেছনের যাত্রীরা আমাদের আগে চলে যাওয়ার কারণে আমরা লাইনে এক জায়গাতেই ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম দীর্ঘ সময়। একারণে পরে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটিও ঢাকা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছিল।"
মোয়াজ্জেম হোসেন বলছেন, কোভিডের কাগজপত্রসহ অন্যান্য কাজ সারতে ঢাকা বিমানবন্দরে তার কয়েক ঘণ্টা লেগেছে। সেই একই আনুষ্ঠানিকতা সারতে তার তুরস্কের বিমানবন্দরে লেগেছিল ১৫ মিনিট এবং লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে মাত্র ৫ মিনিট।
বোর্ডিং ব্রিজ থেকে হেলথ ডেস্ক পর্যন্ত আসতে দেড় ঘণ্টা
অন্য আরো কিছু যাত্রীর সাথে বিবিসির কথা হয় - যারা একই রকম বিশৃঙ্খলা ও ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেন।
গতকাল রবিবার কাতার থেকে দুবাই হয়ে বাংলাদেশে ফিরেছেন হাফিজুর রহমান। দোহা এবং দুবাই বিমানবন্দরে তিনি কোন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েননি।
কিন্তু বিপত্তিতে পড়ছিলেন যখন কাতার এয়ারওয়েজের একটা ফ্লাইটে তিনি বাংলাদেশে আসেন।
তিনি বলেন, বোর্ডিং ব্রিজ থেকেই ভোগান্তির মধ্যে পড়েন। তিনি একজন আনসার সদস্যকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি জানান, "ভিতরের অবস্থা আরো খারাপ, এখানেই থাকেন"।
"অনেক মানুষ । লাইন ধরে কোভিডের জন্য হেলথ ডেস্কে আসতে দুই ঘণ্টা লাগে। সেখানে কাজ সেরে ইমিগ্রেশনে আসতে আরো এক ঘণ্টা লাগলো। এত বিশৃঙ্খল অবস্থা যে আমি যখন লাগেজ নেয়ার জন্য গেলাম সেখানে কোন ট্রলি নেই"।
"ঐ সময় আরো চার থেকে পাঁচটি ফ্লাইটের যাত্রী অপেক্ষা করছে। এক একটা লাইনে দেড়শ'র মানুষ। একদম মাছের বাজারের মত অবস্থা"।
তিনি বলেন, ফ্লাইট ল্যান্ড করার পর থেকে সব কাজ সম্পূর্ণ করে বের হতে সময় লেগেছে তিন ঘণ্টার মত।

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি বলেন, দোহা এবং দুবাই বিমানবন্দরে এই চিত্র একদম ব্যতিক্রম। "প্রক্রিয়াটা ছিল খুব সহজ ছিল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই এয়ারপোর্টেই সব কাজ শেষ হয়।"
মি. রহমান বলেন এটাও উল্লেখ করেন যে দেশ থেকে কাতার যাওয়ার সময় আরো বেশি ভোগান্তিতে পড়েছিলেন তিনি।
কী বলছে কর্তৃপক্ষ:
ট্রাভেল এজেন্সিগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে দূরপাল্লার বড় বড় এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত মধ্যরাতে বা ভোর রাতে তাদের বিমান পরিচালনা করে।
কিন্তু ঠিক সে সময়টাতেই শাহজালাল বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় তাদের ফ্লাইটগুলো দিনের বেলায় নিয়ে আসতে হয়েছে।
ফলে একই সময়ে অনেক যাত্রীর চাপ পড়েছে বিমানবন্দরে।
এছাড়াও কিছু কিছু দেশে যাওয়ার আগে কোভিড-১৯ টেস্টের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেখানেও তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ বিড়ম্বনার।
পিসিআর টেস্টের কাগজ পরীক্ষা, চেকিং, স্বাস্থ্য, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন বা বোর্ডিং পাস সংগ্রহের ক্ষেত্রেও লম্বা লাইন তৈরি হচ্ছে। এমনকি ট্রলি সংকটেও পড়ছেন যাত্রীরা।
তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএম তৌহিদ-উল আহসান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এখন যে অবস্থায় পরিচালনা করা হচ্ছে তাতে এর থেকে বেশি কিছু করার উপায় তাদের হাতে নেই।
মি. আহসান বলেন "কোভিডের জন্য অতিরিক্ত ডেস্ক বসানোর জায়গা এখানে নেই। আমরা বিষয়টা প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করছি। সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু আপতত কিছু করার নেই বলে মনে হচ্ছে"।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গড়ে প্রতিদিন ২৭টি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা করে।
আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রতিদিন ১০০টি ফ্লাইট ওঠানামা করে এবং সব মিলিয়ে প্রতিদিন ১০ হাজারের বেশি যাত্রী আসা যাওয়া করে।








