ব্যবসা: নারী উদ্যোক্তা বেড়েছে, কিন্তু পরিবেশ কতটা অনুকূল হয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে সরাসরি কিংবা অনলাইন- দু ধরণের ব্যবসাতেই নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা অনেক বাড়লেও উদ্যোক্তারা বলছেন নারী হিসেবে ব্যবসা করা কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বাধাও বাড়ছে।
দেশটিতে সম্প্রতি কর্তৃপক্ষ ই-কমার্সের ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক নজরদারি এবং নিরাপত্তা আমানত রাখার সিদ্ধান্ত নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য হয়রানির ক্ষেত্র বাড়িয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন কয়েকজন নারী উদ্যোক্তা।
তবে সরকারের দিক থেকে আগেই বলা হয়েছে যে ই কমার্সের ক্ষেত্রে মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাজের সুযোগ করে দিতেই এসব কার্যক্রম নেয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ আসার পর কর্তৃপক্ষ এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো।
এর আগে চলতি বছর বাজেটে নারীরা মালিক এমন প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লেনদেন ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি ব্যাংক থেকেও ঋণ দেয়ার জন্যও বিশেষ প্রকল্প চলমান আছে।
তবে প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা আচিয়া খালেদা বলছেন, এসব সুবিধা কিংবা ঋণ এখন তাদের ভাগ্যেই জোটে যাদের সুপরিচিত বাবা বা স্বামী আছেন।
"মেয়েরা টেকনোলজি খাতে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাবে-এটা আগেও যেমন অনেকে মেনে নিতে পারতো না, এখনো অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি তাই আছে। ব্যবসার সংশ্লিষ্ট কাজে অনেক সরকারি দফতরেও তাই নিজের কাজের জন্য পুরুষ কাউকে পাঠাতে হয়," বলছিলেন তিনি।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
চলতি বছরেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস জানিয়েছিলো যে এক দশকের ব্যবধানে নারী উদ্যোক্তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির হোলসেল অ্যান্ড রিটেইল ট্রেড সার্ভে-২০২০ এর জরিপ ফল প্রকাশ করে বলা হয়েছিলো যে, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ছিলো দু লাখেরও বেশি যা ২০০২-০৩ অর্থ বছরে ছিলো মাত্র ২১ হাজার।
এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন আরও কয়েক লাখ উদ্যোক্তা।
যদিও একজন উদ্যোক্তা বলছেন ব্যবসা বড় হলে সংকট বাড়ে কারণ এলসি খুলতে, নগদ সুবিধা পাওয়া কিংবা জিএসপি সনদ পাওয়া ও নবায়ন করতে নারীদের অনেক বেশি অর্থ ও সময় দিতে হয়।
চামড়াজাত পণ্যের ব্যবসায়ী ও গুটিপার কর্ণধার তাসলিমা মিজি বলছেন, এমনিতে বৈশ্বিক কারণে ব্যবসা নিয়ে চাপের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা, তার মধ্যে নারী হিসেবে সবসময় মোকাবেলা করতে হয় প্রতিকূল দৃষ্টিভঙ্গির একটি পরিবেশ।
"বাজারে এসে শুরুতে যেসব নেতিবাচক কথা শুনেছি তার কোন উন্নতি হয়নি। আগে যেসব সমস্যা হতো তার কোনটিই এখনো চলে যায়নি,"বলছিলেন তিনি।

ছবির উৎস, KOLPOTORU FACEBOOK PAGE
আচিয়া খালেদা বলছেন, এখন নারীরা বেশি আসছে এটি সত্যি কিন্তু আসার পর কেউ ফাইট করছে টিকে থাকার জন্য আবার কেউ ফাইট করছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।
"নারী কি বোঝে আইটি, লেদার বা টেকনোলজির- এ প্রশ্ন হরহামেশাই কানে আসে। অর্থাৎ আস্থার সঙ্কট কাটেনি। তবে আমার অভিজ্ঞতা বলছে যে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে স্থানীয় বাজারেই নারী উদ্যোক্তাদের বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে"।
আচিয়া খালেদার প্রতিষ্ঠান দেশের ও বিদেশে সফটওয়্যার সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ করে থাকে।
আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকের মাধ্যমে কাজ করছেন অসংখ্য নারী উদ্যোক্তা।
ঢাকার বাইরে রংপুরে কাজ করছেন জুঁই সরকার। তিনি দেশে ও বিদেশে বেডশিট বিক্রি করছেন মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে।
তার মতে প্রতিটি ক্ষেত্রেই জটিলতা বরং আগের চেয়ে বেড়েছে।
"ফেসবুকে আগের মতো বেশি লোককে রিচ করতে পারি না। করতে হলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। আবার দেশেও চালু হয়েছে ভ্যাটসহ নানা কিছু। বিদেশে পণ্য পাঠানো কিংবা সরকারি দপ্তরে ব্যবসা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র- কোথায় বাধা নেই ?" প্রশ্ন করছিলেন তিনি।
ক্রেতারা যা বলছেন
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইশরাত জাহান বলছেন, গত দু বছর ধরে তিনি শাড়ী কিনছেন এমন কয়েকজনের কাছ থেকে যারা গত কয়েক বছরে ই-কমার্স সাইট ব্যবহার করে ব্যবসা শুরু করেছেন।
"শাড়ী বা নানা গিফট আইটেম বা বাচ্চাদের খেলনাসহ নানা জিনিস সহজে ই তো নারী উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে পাচ্ছি। দু একটি ক্ষেত্রে পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও খুব বেশি ঠকিনি," বলছিলেন তিনি।
হোসনে আর বেগম বেসরকারি চাকুরি করেন। তিনি বলছেন কোন কিছু কেনার ক্ষেত্রে তিনি এখন নারী উদ্যোক্তাদেরই প্রাধান্য দেন।
"খাবার, পোশাক , প্রসাধন সামগ্রী-যাই হোক না কেন আমি চেষ্টা করি নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে কেনার জন্য। আমি জানি কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে তাদের থাকতে হয়। তবে উদ্যোক্তাদেরও উচিত সততার সাথে ব্যবসা করা," বলছিলেন তিনি।








