ইয়াসির আলী রাব্বি: অভিষেক টেস্টের মাঝখানেই কেন বিদায় নিতে হল, বদলি খেলোয়াড় নুরুল হাসান সোহান কী করতে পারবেন

    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

অভিষেক ম্যাচে খেলতে নেমেছিলেন ইয়াসির আলী রাব্বি, দীর্ঘদিন বাংলাদেশ দলে রিজার্ভ ক্রিকেটার হিসেবে ছিলেন টানা অনেক সিরিজে। এই প্রথম বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামেন রাউজানের রাব্বি, কিন্তু পুরো শেষ করে আসতে পারলেন না।

৩০তম ওভারে শাহীন শাহ আফ্রিদির বল ইয়াসির আলীর হেলমেটে আঘাত হানে।

এরপর তৎক্ষণাৎ কনকাশন আইনে পরীক্ষা করা হয় ইয়াসির আলীর, প্রথমে সুস্থ মনে হলেও এক ওভার পর ইয়াসীর আলী খারাপ বোধ করায় তিনি মাঠ ছেড়ে চলে যান।

তার আগে ইয়াসির আলী ৭২ বলে ৩৬ রান তোলেন তিনি, স্কোরকার্ডে তার নামের পাশে লেখা রিটায়ার্ড হার্ট।

তার বদলি হিসেবে ম্যাচে ঢোকেন নুরুল হাসান সোহান।

নিয়মিত কিপার হলেও এই ম্যাচে নুরুল হাসান সোহান উইকেটের পেছনে দাঁড়াতে পারবেন না।

ক্রিকেটের বদলি আইনে "লাইক ফর লাইক সাবস্টিটিউট" ব্যবস্থায় যেই খেলোয়াড়কে বদলি করা হয় তিনি যা যা করেছেন ঠিক তা-ই করতে হয় বদলি ক্রিকেটারকে।

ইয়াসির আলীকে হাসপাতাল নেয়া হয়েছে সেখানে সিটি স্ক্যানে আপাতত কোনও ক্ষতি পাওয়া যায়নি, তবে ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে পর্যবেক্ষণ করা হবে তাকে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে ২০১৯ সালে ভারত সফরে দুজন ক্রিকেটারকে কনকাশন সাবস্টিটিউট করা হয়।

ক্রিকেট নিয়ে বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ক্রিকেটে বদলি আইন

ক্রিকেটে মাঠে আহত ক্রিকেটারের পরিবর্তে আরেকজন নামতে পারবেন এই আইন করা হয় ২০১৯ সালের জুলাই মাসে।

পহেলা অগাস্ট থেকে চালু হয়েছে এই আইন যে নারী ও পুরুষ ক্রিকেটে একজন মাথায় বা ঘাড়ের মতো স্পর্শকাতর আহত ক্রিকেটারের জায়গায় একই ভূমিকা পালন করা আরেকজন নামতে পারবেন।

তবে এই আইনে বলা আছে অবশ্যই চোট খেলা চলাকালীন অবস্থায় পেলেই বদলি ক্রিকেটার নামাতে পারবে কোনও দল এবং চোট হতে হবে ঘাড়ে বা মাথায়।

আঘাত লাগার পর আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা করা লাগবে।

এই পরীক্ষা 'কনকাশন টেস্ট' হিসেবে পরিচিত।

এরপর ম্যাচ রেফারির অনুমতি নিয়ে ক্রিকেটার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে দল।

মাথায় বল লাগলে যা যা করতে হয়

'আমরা কোন শহরে আছি', 'দিনের কোন সময় এখন চলছে', শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এই ধরণের প্রশ্নই করা হয় মাথায় আঘাতজনিত চিকিৎসার খাতিরে।

ক্রিকেটের মাঠে মাথায় বল লাগার পর ব্যাটসম্যান খেলা চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় আছেন কি না সেটা যাচাই করতেই এসব প্রশ্ন করা হয়।

মাথা স্বাভাবিকভাবেই শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের একটি, যেখানে কোনো ধরণের আঘাত বেশ প্রভাব ফেলে শরীরে ও মনে।

কখনো কখনো বাইরে থেকে আঘাতের তীব্রতা বোঝা যায় না, কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।

২০১৪ সালের ২৭শে নভেম্বর অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ফিলিপ হিউজ মারা যান, যার দুইদিন আগে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটের একটা খেলায় মাথায় বল লাগার পর লুটিয়ে পড়েন মাটিতে।

ক্রিকেট বিশ্বে এই ঘটনা বেশ আলোড়ন ফেলে।

যার ফলশ্রুতিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল মাথায় বল লাগার ক্ষেত্রে নানা ধরণের সিদ্ধান্ত নেয়, যার মধ্যে অন্যতম বদলি ক্রিকেটার মাঠে নামানো।

২০১৯ সালের ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার কলকাতা টেস্টে মাথায় বল লাগার পর একজন নয়, দুজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে বদলি করা হয়। ক্রিকেটে যা একটি বিরল ঘটনা।

একে ক্রিকেটে 'কনকাশন বদলি' বলে, কনকাশনের আভিধানিক অর্থ হলো প্রচন্ড ধাক্কা।

ক্রিকেটে বলের ভর সাধারণত ১৫৬ থেকে ১৬৩ গ্রাম হয়ে থাকে, যা ১৩০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার গতিতে মাথায় লাগলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে।

বল যদি সরাসরি মাথায় আঘাত হানে, বিশেষত ফাস্ট বোলারদের বল সেটা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলার সামর্থ্য রাখে।

যে কারণে ক্রিকেট মাঠেই মাথায় বল লাগার পর যতটা দ্রুত সম্ভব ফিজিও দৌঁড়ে মাঠে আসেন এবং ক্রিকেটারকে যাবতীয় পরীক্ষা ও প্রশ্ন করেন।

প্রশ্নগুলো হয়ে থাকে এমন:

  • আমরা কোন শহরে আছি।
  • দিনের কোন সেশনের খেলা চলছে।
  • এই মুহূর্তে বোলিংয়ে কোন দুজন বোলার আছেন।

এছাড়া দূরবর্তী সাইনবোর্ডের লেখাও পড়তে বলা হয় ক্রিকেটারদের।

মাথায় আঘাত কেন এতোটা গুরুত্ব পাচ্ছে

কনকাশন বা মাথায় যেই আঘাত পায় ক্রিকেটারররা সেটা শরীরের অন্যান্য প্রত্যঙ্গের আঘাত নির্ণয়ের মতো সোজাসাপ্ট নয়।

অনেক সময় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয় না, কিন্তু মস্তিষ্কের যে স্বাভাবিক কাজ সেখানে এটা প্রভাব ফেলার সামর্থ্য রাখে।

যেটা ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই একজন ক্রিকেটার যার মাথায় আঘাত লেগেছে, তাকে তৎক্ষণাৎ একটি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা বল লাগার পর ক্রিকেটারের মানসিক অবস্থার সম্পর্কে ধারণা দেয়।

কিন্তু কখনো কখনো ক্রিকেটাররা বাড়তি সাহস দেখান ও মাঠে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল এখন বেশ কড়া একটি অবস্থান নিয়েছে।

যেখানে লক্ষণ বা অসুস্থতার কোনো চিহ্ন তেমন দৃশ্যমান নয় সেখানে ক্রিকেটারদের মাঠ থেকে বের করতে রাজি করানো কখনো কখনো কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বলছে, ক্রিকেট যেহেতু ১১ জনের খেলা অনেক খেলোয়াড় চাইবেন না তার দল ১০ জনের হয়ে যাক। সেজন্যই ক্রিকেটে এসেছে 'বদলি' ক্রিকেটারের নিয়ম।

মাথায় বল লাগলে যা যা হতে পারে

  • বমি বমি ভাব
  • মাথা ঘোরানো
  • ঝাপসা দেখা
  • অসংলগ্ন লাগা
  • ভারসাম্য রাখতে না পারা
  • দ্বিধা
  • কখনো কখনো সাময়িক স্মৃতিভ্রমও হতে পারে।

ক্রিকেট মাঠে বলের আঘাতে মৃত্যুর ঘটনা

১৯৯৮ সালে ভারতীয় ক্রিকেটার রমন লাম্বা মারা যান ফিল্ডিং করার সময়, ঢাকার লিগে মেহরাব হোসেন অপির ব্যাট থেকে বল ছুটে যায় শর্ট লেগে দাঁড়ানো লাম্বার মাথায়।

২০০৯ সালে সোয়ানজিতে অ্যালকিন জেনকিনস নামের এক আম্পায়ারের মাথায় বল লাগে। তাৎক্ষনিকভাবে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে মাথায় বল লাগার পর মারা যান অস্ট্রেলিয়াস ক্রিকেটার ফিলিপ হিউজ, এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা।

২০১৭ সালে সর্বশেষ মারা যান জুবাইর আহমেদ, যিনি একজন পাকিস্তানি ক্রিকেটার।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: