ই-কমার্স: আলেশা মার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর, 'গুজব' বলছে প্রতিষ্ঠানটি

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলেশা মার্টের প্রধান কার্যালয় এবং কর্পোরেট অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, এমন একটি খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুক পাতায় একটি পোস্ট করে খবরটিকে 'গুজব' বলে দাবি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফেসবুক পোস্টে আলেশা মার্ট আরো বলছে, তাদের কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং তাদের দুইটি কার্যালয়ই খোলা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বুধবার একটি সংবাদ সম্মেলন করা হবে বলে জানিয়েছে আলেশা মার্ট।
গ্রাহকের পাওনা না মিটিয়ে দিয়েই আলেশা মার্টের অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, সোমবার রাত থেকে এমন একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর সকালে অনেক গ্রাহক প্রতিষ্ঠানটির বনানী কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূর-এ আযম বিবিসিকে জানিয়েছেন, সকালে নির্ধারিত সময়ে অফিস খোলার আগেই ভিড় জমে গিয়েছিল, কিন্তু অফিস খোলার পর মানুষজন শান্ত হয়।
তবে এখনো পর্যন্ত কোন গ্রাহক মামলা করেছেন এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশে ই-ভ্যালি থেকে শুরু করে একের পর এক বড় বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা যখন প্রতারণার অভিযোগে আটক হচ্ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যত তালা পড়ছিল, তখনও আলেশা মার্টকে দেখা গেছে ব্যাপকভিত্তিক বিপণন প্রচারণা চালাতে।
প্রতিষ্ঠানটি এমনকি নানারকম কার্ডের প্রচলন করে, যেগুলো বয়স্ক, মুক্তিযোদ্ধাসহ নানা জনগোষ্ঠীকে লোভনীয় সব ডিসকাউন্ট দিচ্ছিল।
অবশ্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা অভিযোগ যখন সামনে আসতে শুরু করেছিল সম্প্রতি তখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মত আলেশা মার্টকেও নজরদারিতে রেখেছিল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান।

ছবির উৎস, আলেশামার্টের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ
বন্ধের খবরের সূত্রপাত যেভাবে
প্রতিষ্ঠানটির একাধিক বিভাগের কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে আলেশা মার্ট যথাসময়ে গ্রাহকদের অর্ডার ডেলিভারি দিতে পারছিল না।
এই গ্রাহকদের কাছ থেকে পণ্যের জন্য আগাম অর্থ গ্রহণ করা হয়েছিল।
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নিয়ে সরকারের নেয়া সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর একটি হচ্ছে, কোন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অর্ডারকৃত পণ্যের জন্য অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করতে পারবে না।
আলেশা মার্টের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওই ঘোষণার পর থেকেই কয়েকটি মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠান আলেশা মার্টকে আর পণ্য সরবারহ করতে চাইছে না।
এদের মধ্যে একটি ভারতীয় মোটরসাইকেল নির্মাতা ও সরবারহকারী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
আর এই কারণে গ্রাহকের পণ্য ডেলিভারি দিতে পারছে না আলেশা মার্ট।
সে কারণেই গত প্রায় একমাস ধরে প্রতিষ্ঠানটির বনানী কার্যালয়ে গ্রাহকের ভিড় বাড়ছিল।
এই ভিড় নিয়ন্ত্রণে আলেশা মার্টের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে কয়েকবার ঘোষণা দেয়া হয় যে, কার্যালয়ে এলে যেন কেবলমাত্র গ্রাহকই আসেন, সাথে অন্য কাউকে না নিয়ে আসা হয়।
এজন্য গ্রাহকদের নিজস্ব পরিচয়পত্র এবং আলেশামার্টের রেজিস্ট্রেশেনের প্রমাণপত্র সাথে নিয়ে আসার নির্দেশনা দেয়া হয়।
এর মধ্যে নভেম্বরের সাত তারিখে আলেশা মার্টের ফেসবুক পেজে প্রতিষ্ঠানটি একটি 'জরুরি ঘোষণা' দেয়, যেখানে বলা হয়, আলেশা মার্টের ভাষায়: "বনানী এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ দুর্যোগ-এর কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বিবেচনায় নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের কাস্টমার কেয়ার (২৪/৭) সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।"
এই ঘোষণার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গ্রাহকের ভিড় বাড়তে থাকে।
তখন আবার ঘোষণা দেয়া হয়, যে বনানী কার্যালয় বন্ধ থাকবে কিন্তু তেজগাঁওয়ের নাসরিন টাওয়ার ভবনে যেখানে আলেশা মার্টের মূল প্রতিষ্ঠান আলেশা হোল্ডিংস লিমিটেড-এর কর্পোরেট কার্যালয়, সেটি খোলা থাকবে।

ছবির উৎস, Getty Images
আলেশা হোল্ডিংস এর একজন কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রেখে জানিয়েছেন, তেজগাঁও কার্যালয়ে গ্রাহকদের অর্ডার ডেলিভারি কিংবা অর্থ ফেরত দেয়ার নির্দেশনা দেয়া ছিল না।
"এ কারণে গ্রাহকদের অনেকে অসন্তুষ্টি নিয়ে ফিরেছেন। হয়ত গুজবের এটাই কারণ," তিনি বলেন।
কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
গ্রাহকের পণ্য ডেলিভারিতে বিলম্ব এবং শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পার হলে গ্রাহকের অর্থ ফেরত দেয়া নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য জানার জন্য কয়েক দফায় যোগাযোগ করা হয় বিবিসির পক্ষ থেকে।
আলেশা মার্ট এবং আলেশা হোল্ডিংস এর একাধিক কর্মকর্তা কথা বললেও পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোঃ মঞ্জুর আলম শিকদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে বিবিসি।
মি. শিকদারের মোবাইল ফোনে বারবার কল এবং এসএমএস পাঠানোর দুই ঘণ্টা পরেও ও প্রান্ত থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে জমকালো আয়োজনে যাত্রা শুরু করে আলেশা মার্ট। এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪৫ হাজার গ্রাহক রয়েছে।
বছরের মাঝামাঝি দেশের কয়েকটি আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তখন ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ এবং ধামাকাসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বিবিসির অন্যান্য খবর:
এরপরই জুলাই মাসের শুরু সরকার প্রথমবারের মত ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা জারি করে।
তাতে বলা হয়, অনলাইনে পণ্য কেনার জন্য গ্রাহক মূল্য পরিশোধ করার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরবরাহকারীর কাছে পণ্য পৌঁছে দেবে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান।
এরপর তা ক্রেতাকে মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে জানিয়ে দিতে হবে।
ক্রেতা-বিক্রেতার অবস্থান একই শহরে হলে অর্ডার করার পাঁচদিনের মধ্যে, আর ক্রেতা-বিক্রেতার অবস্থান ভিন্ন শহরে হলে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হবে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি মোবাইল মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান বিকাশ সাময়িকভাবে ১০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বন্ধ করে, যার মধ্যে ইভ্যালির সাথে আলেশা মার্টও ছিল।
এরপর সেপ্টেম্বরে সরকার জানিয়েছিল, আর্থিক লেনদেন মনিটর করার জন্য সরকারের নজরদারিতে রয়েছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যার অন্যতম ছিল আলেশা মার্ট।








