হিন্দুদের ওপর হামলা: সহিংসতার প্রতিবাদ কালী পূজায়, দীপাবলি উৎসবে কাটছাঁট

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে সম্প্রতি যেসব এলাকায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন ও প্রতিমা ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ঘট-পূজা হবে এবং অন্যান্য স্থানে প্রতিমা পূজা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ।
শুক্রবার ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন সিদ্ধান্তের কথা জানান বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জী।
আগামী ৪ঠা নভেম্বর হিন্দু সম্প্রদায়ের কালী পূজা ও দীপাবলি উৎসবকে ঘিরে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এবারের কালী পূজা বা শ্যামাপূজা সংশ্লিষ্ট মন্দির কর্তৃপক্ষের ইচ্ছানুযায়ী প্রতিমা বা ঘটে করা হবে।
অন্যান্যবারের মতো এবারে আর একাধিক দিনের অনুষ্ঠান আয়োজন হবে না।
এবারের কালী পূজায় দীপাবলি উৎসবে গানের অনুষ্ঠান, আতশবাজি পোড়ানোর মতো আয়োজন বর্জন করা হবে।
সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১৫ মিনিট কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে দর্শনার্থী ও ভক্তরা স্ব স্ব মন্দিরে নীরবতা পালন করবেন।
মন্দির/মণ্ডপের দরজায় কালো কাপড়ে সহিংসতাবিরোধী শ্লোগান 'সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াও' সংবলিত ব্যানার টানিয়ে দিতে হবে।

তবে দুর্গাপূজা চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানের পূজামণ্ডপে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় এবার মাগুরা, দিনাজপুর, ঝিনাইদহসহ কয়েকটি জেলায় ঐতিহ্যবাহী কাত্যায়নী পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণেই এবার কাত্যায়নী পূজা হবে না, সেখানেও শুধু ঘট-পূজার আয়োজন করা হবে।
ওই সব জেলার পূজা উদযাপন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে পূজা উদযাপনের কোন পরিবেশ নেই, সেইসাথে নিরাপত্তাহীনতার কারণে তার শত বছরের পুরনো এই পূজার আয়োজন থেকে সরে আসার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ তাদের সেই সিদ্ধান্তের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছে।
সাধারণত প্রতিবছরের কার্তিক মাসে ওই অঞ্চলগুলোয় ব্যাপক উৎসব আয়োজনে কাত্যায়নী পূজা হয়ে থাকে।
দেশ-বিদেশের লাখ লাখ দর্শনার্থী এই পূজা উপভোগ করতে ওইসব জেলায় ভিড় করেন। তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে জেলা কমিটি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার সঙ্গে একমত পোষণ করেছে পূজা উদযাপন কমিটি।
তবে সারা দেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে তারা আহ্বান জানিয়েছেন তারা যেন আসন্ন কালী পূজা ও দীপাবলিতে পূজা উদযাপন করেন।
এ ব্যাপারে নির্মল কুমার চ্যাটার্জি বিবিসি বাংলাকে জানান, "সাম্প্রদায়িক অপশক্তি চায় আমরা এসব ঘটনায় ভয় পেয়ে পূজা উদযাপন বন্ধ করে দেই। অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে বাংলাদেশে আর কখনও পূজা হবে না। সবাইকে আহ্বান জানাবো এসব অপপ্রচার আর সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।"
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
৮ দফা দাবী
এদিকে, সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনকালে 'সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, হত্যা, নির্যাতনের' ঘটনায় কঠোর নিন্দা ও গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ।
এসময় তারা ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ, হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ৮ দফা দাবি তুলে ধরেন।
দাবিগুলো হল:
- ক্ষতিগ্রস্ত সব মন্দির, বাড়িঘর সরকারি খরচে পুনর্নির্মাণ করে দিতে হবে। গৃহহীনদের দ্রুত পুনর্বাসন করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
- নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে।
- দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে প্রকৃত দোষীদের বিচারের পদক্ষেপ নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনও ক্ষেত্রেই নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা যাবে না।
- সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে এবং তদন্ত কমিশনের প্রকাশিত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
- হিন্দু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে তা প্রতিবিধানে সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য ও পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি করছি।
- ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক ঘটনাসমূহের ওপর তদন্ত সম্পর্কিত সাহাবউদ্দিন কমিশন রিপোর্টের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
- একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় নৃগোষ্ঠীর বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, অর্পিত সম্পত্তি প্রকৃত স্বত্বাধিকারীর কাছে ফেরত দেওয়া, সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আইনের অবসানসহ ইশতেহারে ঘোষিত অন্যান্য প্রতিশ্রুতিগুলোও সরকারের এই মেয়াদে বাস্তবায়ন করতে হবে।
- সংবিধানে বিরাজমান অসংগতি দূর করে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ১৯৭২ এর সংবিধান পূর্ণবাস্তবায়ন করতে হবে।








