হিন্দুদের ওপর হামলা: চৌমুহনীর মণ্ডপ-মন্দিরগুলো সহিংসতার নীরব সাক্ষী, আতঙ্কে হিন্দুরা, প্রশ্নের মুখে পুলিশ-প্রশাসন

- Author, কাদির কল্লোল
- Role, চৌমুহনী, নোয়াখালী
নোয়াখালীর চৌমুহনীর পূজামণ্ডপে তাণ্ডবের চারদিন পরও এখানকার মণ্ডপ আর মন্দিরগুলি হামলা, ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগের ক্ষতচিহ্ন বুকে ধরে রেখেছে।
শহরের হতবিহবল হিন্দু সম্প্রদায়-সহ অনেক মানুষের একটাই প্রশ্ন - এ রকম একটি ঘটনা ঘটতে পারলো কীভাবে?
ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য যথেষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না, অভিযোগ করলেন তারা। অনেক যোগাযোগ করেও পুলিশের কোন সাহায্য পাননি বলেও তাদের ক্ষোভ।
কুমিল্লায় একটি পূজামণ্ডপে কোরআন পাওয়াকে কেন্দ্র করে সহিংসতার দু'দিন পর ১৫ই অক্টোবর চৌমুহনীর মণ্ডপ আর মন্দিরে যে হামলা হয়েছে, তাতে জীবন গেছে দু'জন মানুষের।
হামলার শিকার ব্যক্তিরা আমার কাছে বর্ণনা করছিলেন, শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর থেকে কীভাবে চৌমুহনীর পূজামণ্ডপ এবং মন্দিরগুলোকে লক্ষ্য করে একের পর এক আক্রমণ চালানো হয়।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
চৌমুহনীর ইসকন মন্দিরে কী ঘটেছিল?
সেদিনের হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসকনের একটি মন্দির। সেই মন্দিরের ভেতরের লাইব্রেরি থেকে শুরু করে সব জায়গায় হামলার চিহ্ন।
ভাঙা আসবাবপত্র, কাঁচের টুকরো, উত্তরীয়, রুদ্রাক্ষের জপমালা - এসব তখনও পড়ে রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
দালানের গায়ে মিললো অগ্নিসংযোগের প্রমাণ।
এখানেই হামলায় প্রাণ হারান দুই ব্যক্তি।
এর মধ্যে প্রান্ত দাশ নামের ২২-বছর বয়সের একজন যুবকের মৃতদেহ পাওয়া যায় সেখানকার একটি পুকুরে, ঘটনার একদিন পর।

প্রান্ত দাশের বাবা-মা নোয়াখালীর আরেকটি এলাকা চাটখিল থেকে এসে ছেলের মৃতদেহ শনাক্ত করেন।
ঘটনার চার দিন পর সন্তানহারা পরিবারটি ওই মন্দিরেই ছিলেন, আর সেখানে কথা হয় মা বনলতা দাশের সাথে।
ছেলের মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, ছেলের মৃতদেহে তিনি ধারালো অস্ত্রের অনেকগুলো আঘাত দেখতে পেয়েছেন।
"প্রান্তকে অনেক নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করে তাকে জলে ফেলে দেওয়া হয়েছে," বলছিলেন বনলতা দাশ।
"আমি আসি দেখি, আমার প্রান্ত'র শরীরে শুধু কোপাকুপির দাগ। তার মাথা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। আমার ছেলের সারা শরীরে শুধু রক্ত আর রক্ত।"
সম্পর্কিত খবর:

এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে আর না ঘটে, সেজন্য তার ছেলের মৃত্যুর সঠিক তদন্তও চাইলেন তিনি।
ইসকন মন্দিরেই কথা হচ্ছিল এর অধ্যক্ষ রসপ্রিয় দাশের সাথে।
বিবিসির সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানালেন, হামলার সময় তাদের মন্দিরে প্রায় ২০ জন নারীসহ মোট ৫০ জনের মতো ছিলেন। শুক্রবার হামলাকারীরা এক ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, বললেন তিনি।
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
মি. দাশ অভিযোগ করলেন, হামলার সময় পুলিশের কাছে দফায় দফায় ফোন করেও তারা কোন সাড়া পাননি।
"হামলাকারীরা ৫০ বা ৬০ জনের মতো ছিল। ভেতরে ঢুকে তারা পুরো মন্দিরটিতে এলোপাথাড়িভাবে ভাঙচুর চালাতে থাকে", বলছিলেন তিনি। "সে সময় পুলিশ আর নাইন-নাইন-নাইনে আমরা অনেকবার টেলিফোন করেছি, কেউ রিসিভ করেনি, কেউ কোন কথা বলেনি।"
রসপ্রিয় দাশ জানালেন, এসব হামলার চারদিন পর তারা এখনও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

বনলতা দাশ জানেন, ছেলেকে আর ফেরত পাবেন না তিনি। কিন্তু বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, তিনি চান তার সন্তান হত্যার বিচার।
পুলিশ আর প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ
চৌমুহনী শহরের বিভিন্ন পাড়ায় দুর্গা পূজা উদযাপন কমিটির নেতাদের সাথে কথা হচ্ছিল।
তারা জানালেন, সেখানে ছয়টি মন্দিরের সবক'টিতেই হামলা হয়েছে। আটটি অস্থায়ী পূজা মণ্ডপের মধ্যে পাঁচটিতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়।
এছাড়াও হামলা চালানো হয় হিন্দুদের বাড়িঘর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।
এসব হামলা কেন ঘটলো, কুমিল্লার সহিংসতার দু'দিন পরেও কেন চৌমুহনীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হলো না - এসব প্রশ্ন এখন ঘুরছে এখানকার হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের মুখে মুখে।
চৌমুহনীর পূজা উদযাপন কমিটির একজন নেতা তপন চন্দ্র মজুমদার সরাসরিভাবে স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতারই অভিযোগ তুললেন।
"১৯৪৭ সালের (সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার) পর চৌমুহনীতে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি," বলছিলেন তিনি। "১৯৯১ সালে বাবরি মসজিদের ঘটনা যখন ঘটছিল, তখনও চৌমুহনী অক্ষত ছিল।"
"কিন্তু এবার বিষয়টা একেবারেই পরিকল্পিত" ছিল বলে মনে করেন মি. মজুমদার।
আমার সাথে কথা বলার সময় স্থানীয় প্রশাসনের নির্লিপ্ততা আর উদাসীনতার অভিযোগ অনেকেই করেছেন। মি. মজুমদারও করলেন। বার বার করে প্রশাসনকে জানিয়েও কোন ফল হয়নি বলে আক্ষেপ করছিলেন তিনি।
"হামলার সময় তিন তিনটা ঘণ্টা আমরা কোন পুলিশ পাইনি। দু'একজন যারা এখানে ছিল, তারাও ছিল নিষ্ক্রিয়," বললেন তপন চন্দ্র মজুমদার।

ছবির উৎস, Getty Images
ক্ষুব্ধ চৌমুহনীর মুসলমানরাও
চৌমুহনীতে কাছাকাছি দূরত্বের মধ্যে রয়েছে কয়েকটি মন্দির আর মসজিদ।
কথা হলো শহরের সবচেয়ে বড় মসজিদের খতিব মোহাম্মদ সফিউল্লাহর সঙ্গে।
তিনি বলছিলেন, বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা জায়গায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হলেও তাদের এলাকায় এসবের প্রভাব পড়েনি। কিন্তু এবার কেন হলো, এই প্রশ্ন এখন তারও মনে।
"আমাদের এই বড় মসজিদসহ এখানে কাছাকাছি আরও তিনটি মসজিদ আছে। আমাদের মসজিদের কাছেই রয়েছে বড় একটা মন্দির রয়েছে। কিন্তু কখনো এখানে কোন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটেনি।"
খতিব মোহাম্মদ সফিউল্লাহ আরও বলেন, "এখন হঠাৎ এমন ঘটনা ঘটে গেল। এটা আমাদের জন্যও ব্যথার ব্যাপার। এধরনের কাজ ইসলাম অনুমোদন করে না।"
নোয়াখালী অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক শহরে গত চার দিন ধরেই হিন্দুদের নিরাপত্তা দানে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলা হয়েছে জেলার প্রশাসন এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
পুলিশের জনবলের স্বল্পতাকে যুক্তি হিসাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা হলেও মানুষ তা খুব একটা কানে তুলছে না বলেই মনে হচ্ছে।
পুলিশের তদন্ত
চৌমুহনীর সহিংসতায় পুলিশের তদন্ত দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি সাইফুল ইসলাম। তার সাথে কথা বলে মনে হলো যে এই ক'দিনে বহুবার তাকে পুলিশী ব্যর্থতা সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখোমুখী হতে হয়েছে।
বিবিসি বাংলার তরফ থেকেও এ ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "পুলিশের কোন অবহেলা ছিল কিনা, বা অন্য কারো গাফিলতি ছিল কিনা, এটা আমরা তদন্ত করে দেখবো। সার্বিকভাবেই এগুলো নিয়ে আমরা তদন্ত চালাবো।"
"আসলে কী ঘটেছিল, এসব ঘটনায় কে কে জড়িত এবং এর পেছনে কারা আছে, এর সবই তদন্ত করে দেখা হবে," জানালেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
চৌমুহনীর সহিংসতার পর ১৮টি মামলা হয়েছে এবং এতে পুলিশের একাধিক সংস্থা তদন্ত চালাচ্ছে।
কিন্তু তদন্ত যাই হোক, আর তার ফলাফল যাই হোক, চৌমুহনীতে দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি ও সহাবস্থানের যে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ছিল, তাতে যে বড় ধরনের আঘাত লেগেছে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
একই সাথে সরকারের প্রশাসন ও পুলিশ এবং শাসন পদ্ধতির ব্যাপারে হিন্দু সম্প্রদায়সহ চৌমুহনীবাসীর যে আস্থা ছিল, দৃশ্যত তাতেও চিড় ধরেছে বেশ খানিকটা।








