জম্মু ও কাশ্মীর: বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা জঙ্গিবাদের আশঙ্কা তৈরি করছে

ভারত -শাসিত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বেসামরিক মানুষ হত্যার ঘটনা ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছে - বিশেষ করে এই অঞ্চলের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বিবিসি রিয়াজ মাশরুরের কাছে বলেছে, তারা এখন ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

ডায়াবেটিক রোগ বিশেষজ্ঞ ৪০ বছর বয়সী সিদ্ধার্থ বিন্দ্রু যখন কাশ্মীরের প্রধান নগরী শ্রীনগরে যখন একটি রেস্তোঁরায় যাচ্ছিলেন, তখন তিনি একটি টেলিফোন পান।

''বাবা মারা গেছে,''ফোনে তাকে জানানো হয়।

পাঁচই অক্টোবর তাদের পারিবারিক ওষুধের দোকানে লোক প্রবেশ করে তার পিতা মাখন লাল বিন্দ্রুকে গুলি করে হত্যা করে।

এই পরিবারটি ওই অঞ্চলের একটি বিখ্যাত ওষুধের দোকানের চেইন পরিচালনা করে, যেখানে অনেক জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বিক্রি করা হয়।

কাশ্মীরে যে ৮০০র বেশি হিন্দু পরিবার বসবাস করে, যাদের স্থানীয়ভাবে পণ্ডিত বলা হয়ে থাকে, বিন্দ্রু পরিবার তাদের একটি। নব্বইয়ের দশকে ওই এলাকায় সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর যখন হাজার হাজার হিন্দু পরিবার ভারতের অন্যান্য এলাকায় চলে যায়, তখনও তারা এখানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

ভারত থেকে স্বাধীনতা চাওয়া বিদ্রোহী সদস্যরা অনেক সময় এই সংখ্যালঘু হিন্দুদের টার্গেট করে হামলা করে। কারণ তাদের অভিযোগ, এরা নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা করছে।

যেদিন এমএল বিনদ্রো নিহত হন, সেদিন আরও দুইজন বেসামরিক বাসিন্দাকে হত্যা করা হয়। তাদের একজন বিহার থেকে আসা একজন হিন্দু ফুটপাতের বিক্রেতা, আরেকজন মুসলমান ক্যাব চালক। এর আগে দোসরা অক্টোবর কাশ্মীরের দুইজন মুসলমানকে একইভাবে হত্যা করা হয়েছে।

এরকম টার্গেটেড হত্যাকাণ্ডে সেখানে ব্যাপকভাবে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে কাশ্মীরের সংখ্যালঘু বাসিন্দাদের মধ্যে, যারা এর আগে দিল্লির বিরুদ্ধে দশকব্যাপী সহিংস লড়াইয়ের প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছেন। অনেক হিন্দু পরিবার এখন এই উত্তপ্ত এলাকা ছেড়ে যেতে শুরু করেছেন, যাকে নব্বই দশকের সেই পরিস্থিতির সঙ্গে অনেকটা তুলনা করা চলে।

এই এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে বলে সরকার যে দাবি করেছে, এসব ঘটনা সেই দাবিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

কাশ্মীরের ওপর ভারত ও পাকিস্তান- উভয় দেশই দাবি করে। যদিও উভয়ের হাতে আংশিক এলাকার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক সবসময়েই উত্তেজনাপূর্ণ। কিন্তু যখন ২০১৯ সালে এই এলাকার বিশেষ স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহার করে নেয়, তখন সেটি আরও তলানিতে চলে যায়।

ওই পদক্ষেপের কারণে কাশ্মীরে কয়েকমাস ধরে সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকে এবং পরিচালনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এর মাধ্যমে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের এই একমাত্র রাজ্যে জনসংখ্যা বিষয়ক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

গত সপ্তাহে এখানকার একটি স্কুলে হামলা করেছিল বন্দুকধারীরা।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা নিশ্চিত করেছেন যে, তারা সকল কর্মীকে হাজির করে পরিচয়পত্র দেখতে চায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রিন্সিপ্যাল এবং একজন শিক্ষককে আলাদা করে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

গত দুই দশকে এরকম আরো অনেক নিহত হওয়া কাশ্মীরি পণ্ডিত ও শিখরা ছিলেন। ২০০০ সালের মার্চ মাসে অজ্ঞাতনামা হামলাকারীরা একটি গ্রামে হামলা করে ৩৫ জন শিখকে হত্যা করে। ২০০৩ সালে পুলওয়ামা জেলায় একটি গ্রামে হামলা করে ২০ জনের বেশি কাশ্মীরি পণ্ডিতকে হত্যা করা হয়েছিল।

গত এক সপ্তাহেই কাশ্মীরে এরকম সাতটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা ঘটছে এমন সময় যখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ৭০ জন মন্ত্রী কাশ্মীর পরিদর্শন করে গেছেন। সংবিধান থেকে কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধার আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করায় কী সুবিধা হয়েছে - সেটা তুলে ধরাই ছিল এই মন্ত্রীদের কাজ।

ওই আর্টিকেলের কারণে এই রাজ্যটি বিশেষ কিছু সুবিধা পেতো। যার ফলে রাজ্যের নিজস্ব সংবিধান ছিল, আলাদা পতাকা এবং নিজস্ব আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ছিল।

স্থানীয় রাজনীতিবিদরা বলছেন, আসলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়, বরং অনেক খারাপ। অনেকে এটাকে নব্বই দশকের অস্থির সময়ের সঙ্গেও তুলনা করছেন।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি বলেছেন, ''কাশ্মীরে শান্তি থাকার যে মিথ্যা দাবি করা হচ্ছে, এসব হত্যাকাণ্ড তারই প্রতিবাদ।''

কাশ্মীরের পুলিশ প্রধান বিজয় কুমার বলেছেন, শুধুমাত্র এই বছরে কমপক্ষে ২৮ জন বেসামরিক নাগরিককে সন্দেহভাজন জঙ্গিরা হত্যা করেছে। ''এই ২৮ জনের মধ্যে পাঁচ জন হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ের, দুইজন অস্থানীয় শ্রমিক,'' তিনি বলেছেন।

যদিও নিহতদের বেশিরভাগ মুসলমান, কিন্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ধর্মীয় উত্তেজনা ও ভীতির বিষয়টিও বেরিয়ে এসেছে।

জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের মহাপরিচালক দিলবাগ সিং বলেছেন, ''এটা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার একটা চেষ্টা।''

পুলিশ জানিয়েছে, তারা হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে। স্থানীয় পুলিশের সূত্রে জানা যাচ্ছে, জামিনে থাকা শত শত সাবেক বিদ্রোহী এবং বিক্ষোভকারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছে।

তবে কাশ্মীরের পণ্ডিতরা বলছেন, তারা এখনো ভয়ের মধ্যে বসবাস করছেন। তাদের অনেকেই এই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন।

"শত শত পণ্ডিত পরিবাররা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছে," ৫০০-এর বেশি কাশ্মীরি পণ্ডিতদের একটি সংগঠনের প্রধান সঞ্চয় টিকো বিবিসিকে বলেছেন। "কর্তৃপক্ষ আমাকে আমার শ্রীনগরের বাসা থেকে এনে হোটেলে রেখেছে। এরকম ভয়ানক পরিবেশে আমরা কীভাবে বাঁচতে পারি?"

শ্রীনগরের বিন্দ্রু পরিবারগুলোসহ কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ঘর-বাড়িগুলো চারপাশ থেকে পাহারা দেয়া হচ্ছে।

কিন্তু নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলছেন, "কিছু পরিবার চলে গিয়েছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। যখন কিছু ঘটে, তখন সরকারি কর্মকর্তা এসে আশ্বাস দেন। কিন্তু তারা কি আমাদের স্কুল-অফিসগুলো নিরাপদ করতে পারবেন?"

তবে শুধু কাশ্মীরি পণ্ডিতরাই নন, পুরো উপত্যকা জুড়েই ভয় আর অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে।

''নব্বইয়ের দশকে যেভাবে পণ্ডিতরা গিয়েছিলেন, তা ছিল একটা দুঃখজনক ব্যাপার। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে। সেসব দিন মনে করতেও আমার ভয় লাগে। সেই রকম আর ঘটা উচিত নয়,'' বলছেন মোহাম্মদ আসলাম, যিনি ১৯৯১ সালে একটি ক্রসফায়ারের ঘটনায় তার চাচাতো ভাইকে হারিয়েছেন।

তবে কাশ্মীরের সব পণ্ডিত এই এলাকা ছেড়ে যেতে চান না। বিন্দ্রু পরিবার জানিয়েছে, তারা এখানেই থেকে যাবে।

মাখনলাল বিন্দ্রুর কন্যা সারদা বিনদ্রো বলছেন, ''আমরা কাশ্মীরের লোক, এখানেই আমাদের জন্ম, আমার পিতার রক্ত আমাদের ধমনিতে বইছে।''

সিদ্ধার্থ বিন্দ্রু এই বিষয়ে একমত। তিনি বলেছেন, তার পিতার শেষকৃত্যে যারা এসেছেন, তাদের ৯০ শতাংশই মুসলমান।

''আমি মনে করি না, এই জায়গা ছেড়ে যাওয়ার মতো কোন কারণ আমার আছে। এখানে আমি নিজের লোকজনের মধ্যেই আছি।''

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: