আফগানিস্তান: শরীয়া আইন কী? আফগান নারীদের জন্য এটি কী অর্থ বহন করে?

শরীয় আইন মূলত মুসলিমদের জন্য কোড অফ কন্ডাক্ট হিসেবে কাজ করে

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, শরীয় আইন মূলত মুসলিমদের জন্য কোড অফ কন্ডাক্ট হিসেবে কাজ করে

আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণে নিজেদের হাতে নেয়ার পর তালেবান বলেছে যে তারা শরীয়া বা ইসলামী আইনের ভিত্তিতে দেশটি শাসন করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনীর প্রায় দুই দশকের উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে রাজধানী কাবুল দখণ করার পর তালেবান নিজেদেরকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে।

শরীয়া নিয়ে তালেবান কী বলছে?

এরপর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তালেবান মুখপাত্র বলেছেন যে মিডিয়া ও নারী অধিকারের মতো বিষয়গুলো "ইসলামী আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে" সম্মান করা হবে, তবে বাস্তবে সেটি কীভাবে করা হবে, সে সম্পর্কে গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে বিস্তারিতভাবে বলা হয়নি।

নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী মালালা ইউসুফজাই - যিনি পাকিস্তানে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের পক্ষে প্রচারণার চালানোর কারণে ১৫ বছর বয়সে তালেবানের গুলিতে আহত হয়েছিলেন - সতর্ক করে বলেছেন যে শরীয়া আইনের তালেবানী ব্যাখ্যা দেশটির নারী ও কন্যা শিশুদের নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

"আফগানিস্তানে নারীসহ কিছু অধিকার কর্মীর সাথে কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। তারা তাদের উদ্বেগ জানিয়ে আমাকে বলেছেন যে তারা নিশ্চিত নন যে তাদের জীবন কেমন হতে যাচ্ছে," বিবিসিকে বলেন তিনি।

"তাদের অনেকেই ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে যা ঘটেছিল তা স্মরণ করেছেন, এবং তারা তাদের নিরাপত্তা, অধিকার, সুরক্ষা এবং স্কুলে যাওয়া নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন"।

তালেবান শরীয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ, বিশেষ করে খুনী ও ব্যভিচারীদের জন্য প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মতো শাস্তির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ইন্দোনেশিয়ার একজন শিক্ষার্থী কোরআন পড়ছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইন্দোনেশিয়ার একজন শিক্ষার্থী কোরআন পড়ছেন

শরীয়া বলতে কী বুঝায়?

শরীয়া হলো ইসলাম ধর্মের আইনী পদ্ধতি।

এটা এসেছে ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ কোরআন এবং সুন্নাহ ও হাদীস থেকে, যেগুলো এসেছে ইসলামের নবী কাজ এবং বক্তব্য থেকে।

যেসব বিষয়ে এখান থেকে সরাসরি কোন উত্তর পাওয়া যায় না, তেমন কোন বিষয় বা প্রশ্নে ধর্মীয় পন্ডিতরা নির্দেশনা হিসেবে বিধিবিধান দিতে পারেন।

শরীয়া হলো জীবনাচরণের সেই পদ্ধতি যা সব মুসলমানকে মেনে চলতে হয় - যার মধ্যে রয়েছে নামাজ, রোজা কিংবা যাকাতের মতো বিষয়গুলোও।

মুসলমানরা কিভাবে আল্লাহর ইচ্ছা তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পালন করবে, সেটি বুঝতে সহায়তা করে এই শরীয়া।

কাবুলে বোরকা পরিহিত কয়েকজন নারী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কাবুলে বোরকা পরিহিত কয়েকজন নারী

বাস্তব জীবনে চর্চার অর্থ কী

একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে বলতে পারে শরীয়া।

যেমন, কাজের শেষে একজন মুসলিমকে তার সহকর্মী যদি পাবে আমন্ত্রণ জানায়, তাহলে তিনি শরীয়া বিশেষজ্ঞের কাছে পরামর্শ চাইতে পারেন এটা নিশ্চিত করতে যে তিনি যাতে ধর্মীয় বিধিবিধানের মধ্যে থাকেন।

অন্য যেসব দৈনন্দিন বিষয়ে মুসলমানেরা পরামর্শের জন্য শরীয়ার দ্বারস্থ হতে পারেন, তার মধ্যে রয়েছে পরিবারিক আইন, অর্থ ও ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়।

শরীয়ায় কিছু কঠোর শাস্তি

শরীয়া আইনে অপরাধগুলোকে সাধারণত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি হলো 'হাদ্দ' অপরাধ - অর্থাৎ যেগুলো মারাত্মক অপরাধ এবং যেগুলোর জন্য রযেছে নির্দিষ্ট শাস্তি, আর অন্যটি হলো 'তাজির' - যেখানে শাস্তির বিষয়টি বিচারকের বিবেচনাবোধের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়।

'হাদ্দ' অপরাধের মধ্যে রয়েছে চুরি, যার শাস্তি হিসেবে হাত বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার বিধান আছে, এবং ব্যভিচার, যার জন্য কঠোর শাস্তি আরোপ করা যেতে পারে।

একজন নারীকে বেত্রাঘাত করা হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ায়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, একজন নারীকে বেত্রাঘাত করা হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ায়

তবে 'হাদ্দ' শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক রক্ষাকবচ রয়েছে এবং অভিযোগ ভালোভাবে প্রমাণের বিষয় আছে।

কিছু মুসলিম দেশ 'হাদ্দ' অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি প্রয়োগ করে থাকে, এবং জরিপে দেখো গেছে যে এ ধরনের কঠোর শাস্তির ব্যাপারে বিভিন্ন জনমত রয়েছে।

শরীয়া আইনে সিদ্ধান্ত কীভাবে নেয়া হয়?

অন্য যেকোন আইনী পদ্ধতিন মতো শরীয়াও জটিল এবং এর চর্চা পুরোপুরি নির্ভর করে বিশেষজ্ঞের যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের ওপর।

ইসলামী বিচারকরা নির্দেশনা ও বিধান দিয়ে থাকেন। যেসব নির্দেশনা আইনীভাবে আনুষ্ঠানিক হিসেবে গণ্য করা হয়, সেগুলোকে বলা হয় 'ফতোয়া'।

মালয়েশিয়ার প্রথম নারী শরীয় হাইকোর্ট বিচারক

ছবির উৎস, Joshua Paul for the BBC

ছবির ক্যাপশান, যেসব নারী শুরুতে মালয়েশিয়ার শরীয়া হাইকোর্টের বিচারক হয়েছেন, নেনি শুশাইদাহ তাদের একজন

শরীয়া আইনের পাঁচটি পৃথক ধারা রয়েছে।

সুন্নীদের জন্য রয়েছে চারটি ডকট্রিন বা মাযহাব - হানবালি, মালিকি, শাফিই ও হানাফি। অন্যদিকে শিয়া ডকট্রিন হলো একটি - শিয়া জাফারি।

শরীয়া আইনের উৎপত্তি যেখান থেকে, সেগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই পাঁচ মাযহাবের মধ্যে মতদ্বৈততা আছে।