আফগানিস্তান: তালেবান কি আবার অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে?

    • Author, জন সিম্পসন
    • Role, ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স এডিটর, বিবিসি

"আপনারা যে এসেছেন, সেজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।" আমি যখন আমার এক সহকর্মীকে সাথে নিয়ে ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর কাবুলে উল্লসিত জনতার ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন এক প্রবীণ আফগান আমাকে একথা বলেছিলেন।

তালেবান-বিরোধী আফগান জোট নর্দার্ন অ্যালায়েন্স তখন কাবুলের উপকন্ঠে এসে থেমেছে। তাদের পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা জোটের সমর্থন। আর তালেবান তখন পালানোর চেষ্টা করছে।

আফগানিস্তানে মাত্রই তখন সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে চরমপন্থী ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্রের পাঁচ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছে। তালেবানের অধীনে আফগানিস্তান যেন কৃষ্ণ গহ্বরে পরিণত হয়েছিল, যেখানে সব ধরণের চরমপন্থা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল।

এর মাত্র দুই মাস আগে ওসামা বিন লাদেন এবং তার আল কায়েদা গোষ্ঠীর পরিকল্পনায় এবং নির্দেশনায় নিউ ইয়র্ক এবং ওয়াশিংটনে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এটা তখন আমার মাথাতেই আসেনি যে, তালেবান আবার কোনদিন ফিরে আসতে পারে।

কেন তালেবান আবার আফগানিস্তানে ফিরে এল, এখন সবাই তার কারণ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া কিন্তু কঠিন কিছু নয়।

তালেবানের পর আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট হামিদ কারযাই এবং আশরাফ গানির নেতৃত্বে দুটি সরকার গঠিত হয়েছিল। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলেও এই সরকারগুলো কিন্তু কখনোই শক্তিশালী ছিল না। আর সেখানে দুর্নীতিই ছিল একমাত্র ব্যবস্থা, যা ভালোভাবে কাজ করছিল।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ২০২০ সালের নির্বাচনের আগে পররাষ্ট্রনীতিতে তার একটি সাফল্য দরকার বলে মনস্থির না করতেন, তাহলে হয়তো প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি এখনো কাবুলে তার প্রাসাদেই থাকতেন আর সেনাবাহিনীও তাদের দামী পশ্চিমা গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়াতো।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেবেছিলেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলা এক যুদ্ধের সমাপ্তি টানার মাধ্যমে পররাষ্ট্রনীতিতে সেই সাফল্য তিনি অর্জন করবেন।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দোহায় যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবানের আলোচনা যে উপসংহারে পৌঁছেছিল, আমার চেনা কয়েকজন আফগান রাজনীতিক এবং সাংবাদিক তাতে শিউরে উঠেছিলেন। তাদের আশংকা আরও দ্বিগুন বেড়েছিল যখন প্রেসিডেন্ট বাইডেন এটা পরিস্কার করে দিয়েছিলেন যে, তিনি এই চুক্তি থেকে সরে আসবেন না।

তখনই আমাকে অনেকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, দোহায় আলোচনায় অংশ নেয়া তালেবান নেতাদের যতই মধ্যপন্থী এবং শান্তিপ্রিয় বলে মনে হোক না কেন, মাঠ পর্যায়ের তালেবান যোদ্ধারা কখনোই এই চুক্তির সব শর্ত মেনে চলতে বাধ্য বলে ভাববে না।

শেষ পর্যন্ত সেটাই প্রমাণিত হলো।

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশ যখনই আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করলো, আফগানিস্তান জুড়ে তালেবান যোদ্ধাদের ক্ষমতা দখলের খেলারও শুরু তখন থেকে।

একের পর এক শহর থেকে যখন খবর আসতে শুরু করলো সেখানে কীভাবে বন্দীদের হত্যা করা হচ্ছে, তা মারাত্মক আতঙ্ক তৈরি করলো। শেষ পর্যন্ত কাবুলেরও পতন ঘটলো এবং সরকারি কর্মকর্তারা আর সৈন্যরা সেখান থেকে পালানোর জন্য বিমান বন্দরের দিকে ছুটলেন।

তালেবান হয়তো তাদের সেই প্রতিশ্রুতি মেনে চলবে যে, তারা কারও বিরুদ্ধে কোন প্রতিশোধ নেবে না। পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং সরকারি প্রশাসনযন্ত্রকে হয়তো তারা কাজ চালিয়ে যেতে বলবে।

তারা হয়তো এমনটাও ভাবতে পারে যে, পশ্চিমাদের আবারও আফগানিস্তানে হামলা করার জন্য উস্কানি দেয়ার কী দরকার।

কিন্তু এবারের তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের চেহারাটা আসলে কী হবে?

এর কিছুটা আঁচ পেতে হলে আমাদেরকে ১৯৯৬ সাল হতে পাঁচ বছরের তালেবান শাসনের দিকেই ফিরে তাকাতে হবে। তখন মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে দুর্ধর্ষ আফগান নেতা আহমেদ শাহ মাসুদ নিয়ন্ত্রিত মধ্যপন্থী সরকারকে তালেবান ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিয়েছিল।

তালেবান যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন আমি বেশ কিছু সময় আফগানিস্তানে কাটিয়েছি। আমি দেখেছি, তালেবান শাসন কিরকম মারাত্মক ভীতিকর ছিল।

সর্বত্র তখন সবচেয়ে কঠোর ধরণের শরিয়া শাসন জারি করা হয়েছিল। প্রকাশ্য মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা, পাথর এবং দোররা মেরে শাস্তি দেয়া- এগুলো ছিল নিত্য দিনের ঘটনা।

রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছিল তালেবানের নজরদারি। কারও পায়ের গোড়ালি দেখা গেলে, বা কেউ পশ্চিমা ধাঁচের পোষাক পরলেই, তার ওপর চলতো হামলা।

পুরুষের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি পেলেই কেবল মেয়েরা বাইরে বেরুতে পারতো। আর তাদের অবশ্যই আপাদমস্তক ঢাকা বোরকা পরতে হতো।

তখন তালেবানের স্বাস্থ্য মন্ত্রী ছিলেন মোল্লাহ বালুচ। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, আফগানিস্তানে দোষী সাব্যস্ত হওয়া চোরদের হাত এবং পা কেটে ফেলার জন্য শল্য চিকিৎসক পাঠাতে তিনি আন্তর্জাতিক রেডক্রসকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তখন কাজটা নাকি ব্যক্তিগতভাবে তাকেই করতে হয়েছিল। মনে হয়েছিল, যেন এই কাজটা তিনি উপভোগ করতেন।

আরও পড়ুন:

তখন টেলিভিশনের জন্য কাজ করা ছিল এক দুঃস্বপ্ন। কারণ ধর্মীয় কারণে আফগানিস্তানে কোন জীবন্ত কিছুর ছবি তোলা ছিল নিষিদ্ধ। বইয়ের দোকানে কোন ছবিযুক্ত বই থাকলে তা তছনছ করা হতো, দোষী বই বিক্রেতাকে দোররা মারা হতো।

যাদের সুযোগ ছিল, তারা শহর ছেড়ে পালিয়েছিল, বেশিরভাগ দোকানপাট ছিল বন্ধ।

তেল আমদানি করার সাধ্য তালেবানের ছিল না। কাজেই রাতের বেলায় সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো ছিল লোকে তাদের বাড়ির জানালায় যে মোমবাতি জ্বালাতো, সেগুলো। আর রাস্তায় বেওয়ারিশ কুকুরের ঘেউ ঘেউ ছিল সবচেয়ে বড় আওয়াজ।

তালেবানকে হটানোর পর যেসব সরকার আফগানিস্তানে ক্ষমতায় আসে, তাদের এবং পশ্চিমা দেশগুলোর হয়তো অনেক ব্যর্থতা ছিল। কিন্তু কাবুল তালেবানকে বিতাড়নের পর কাবুল এবং অন্যান্য শহরে বাণিজ্যিক প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে এসেছিল।

জীবনযাত্রার মান বেড়েছিল। রাস্তায় বেড়েছিল গাড়ির ভিড়। স্কুলগুলো প্রাণ ফিরে পেয়েছিল, বিশেষ করে মেয়েদের স্কুল। তালেবানের অধীনে মেয়েদের লেখাপড়া নিষিদ্ধ ছিল। তালেবান আমলে গান ছিল নিষিদ্ধ, কিন্তু সর্বত্র আবার শোনা যাচ্ছিল গান। নতুন নতুন ভবন তৈরি হচ্ছিল সর্বত্র।

শেষবার যখন আমি কাবুলে যাই, তখন শহরের উপকন্ঠের সেই জায়গাটা আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না, যেখান থেকে আমি এবং আমার বিবিসির সহকর্মী ২০০১ সালে শহরের দিকে হাঁটা শুরু করেছিলাম। পুরো জায়গাটা ভরে উঠেছে নতুন দালান-কোঠায়।

তালেবান যে আবার আফগানিস্তানের ক্ষমতা নিল, সেটাকে বেশিরভাগ আফগান তাদের জন্য এবং তাদের দেশের জন্য এক বিপর্যয় বলেই গণ্য করবে।

কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে: তালেবান কি আফগানিস্তানকে আবারও ২০ বছর আগের সেই অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে? নাকি তাদের নতুন উপলব্ধি হয়েছে?