নরেন্দ্র মোদী: মুসলিম বিদ্বেষ ছড়াতেই কি দেশভাগের কথা মনে করাতে চান ভারতের প্রধানমন্ত্রী?

পূর্ব বঙ্গ থেকে ভারতে আসা এক উদ্বাস্তু পরিবার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দেশভাগের কারণে কয়েক লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছিলেন
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানিয়েছেন যে, দেশভাগের বিভীষিকাকে মনে করিয়ে দিতে ১৪ই অগাস্ট দিনটি 'পার্টিশান হররস্ রিমেমব্রান্স ডে' হিসাবে পালন করা হবে।

টুইটারে তিনি লিখেছেন, দেশ ভাগের যন্ত্রণার স্মৃতি কখনও ভোলার নয়। সহিংসতার কারণে বহু মানুষ ছিন্নমূল হয়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন।

সামাজিক বিভাজন, হানাহানির যে স্মৃতি দেশের মানুষের মনে গেঁথে গেছে, তা থেকে দেশকে মুক্ত করতেই এই বিশেষ দিবসের ঘোষণা বলে তিনি জানিয়েছেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

দাঙ্গা বিধ্বস্ত অমৃতসর শহর

ছবির উৎস, Keystone Features

ছবির ক্যাপশান, দাঙ্গা বিধ্বস্ত অমৃতসর শহর

দেশভাগের বিভীষিকা কেন মনে করিয়ে দিতে চাইছে বিজেপি?

রবিবার ভারতের ৭৫ তম স্বাধীনতা দিবস। তার ঠিক আগে ৭৫ বছরের পুরনো দেশভাগের বিভীষিকা কেন মনে করিয়ে দিতে চাইছে বিজেপি?

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উদ্বাস্তু সেলের নেতা মোহিত রায় বলছিলেন দীর্ঘদিন ধরে দেশভাগের যন্ত্রনার ইতিহাসে প্রলেপ লাগিয়ে রাখা হয়েছিল, এখন সময় এসেছে ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়ার।

"আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার আমরা একটা ভারত চেয়েছিলাম যেখানে সবাই এক সঙ্গে থাকবে, কিন্তু একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের অনমনীয় ভাব এবং যে ধরনের সহিংস ভূমিকা নিয়েছিল যার জন্য দুই সম্প্রদায়ের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটিকেই মনে করিয়ে দেওয়া।

"যে ধরনের অন্যায় অবিচার সামগ্রিকভাবে হিন্দু সম্প্রদায় শুধু নয়, হিন্দু সংস্কৃতির ওপরে আক্রমণ করা হয়েছে, সেই ইতিহাস অবশ্যই মনে করিয়ে দিতে হবে," বলছিলেন মোহিত রায়।

দেশভাগের সময়ে মুসলিম লীগ এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের অনমনীয় মনোভাব এবং সহিংস হয়ে ওঠার কথাই তিনি বোঝাতে চাইছিলেন সেই ইঙ্গিত মি. রায়ের কথায় স্পষ্ট।

আরও পড়তে পারেন

ভারতভাগের সময়ে যেসব এলাকায় দাঙ্গা হয়, সেখানে পৌঁছিয়েছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী

ছবির উৎস, Universal History Archive

ছবির ক্যাপশান, ভারতভাগের সময়ে যেসব এলাকায় দাঙ্গা হয়, সেখানে পৌঁছিয়েছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী

দেশভাগের সময়ে শুধুই কি হিন্দুরা আক্রান্ত হয়েছিলেন?

কিন্তু দেশভাগের সময়ে শুধু যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপরে হামলা হয়েছে তা নয়, ইতিহাস বলছে মুসলমানদের ওপরেও আক্রমণ হয়েছে।

দেশভাগের আগে ঢাকায় বসবাস করতেন এমন একটি পরিবারের সদস্য অঞ্জলি সরকার বিবিসিকে বলেছিলেন, তার চোখে দেখা একটি ঘটনার কথা।

"ঢাকা শহরে আমরা যেখানে থাকতাম, সেটা পুরোটাই হিন্দু পাড়া। একটি শুধু মুসলমান বাড়ি ছিল, তারাও খুবই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। একদিন দেখলাম আমারই এক মামা তার বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে কেরোসিন ঢেলে ওদের বাড়িটা জ্বালিয়ে দিল," স্মৃতি হাতড়ে জানিয়েছিলেন অঞ্জলি সরকার।

সম্পর্কিত খবর

দেশভাগের যন্ত্রণা যাদের সব থেকে বেশি ভোগ করতে হয়েছিল, যাদের পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে অন্য দেশে চলে আসতে হয়েছিল, সেই উদ্বাস্তুদের প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারে বারেই লক্ষ্য করেছি ফেলে আসা দেশের কথা হয়তো তারা ভাবেন, কিন্তু ওই বিভীষিকার কথা, দেশ ছেড়ে চলে এসে উদ্বাস্তু শিবিরে থাকার লড়াই এখন আর তারা মনে করতে চান না।

দেশভাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেন, জওহরলাল নেহরু আর মুহম্মদ আলি জিন্না

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দেশভাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেন, জওহরলাল নেহরু আর মুহম্মদ আলি জিন্না

স্মৃতি স্মরণ না কি মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো?

বাঙালি উদ্বাস্তুদের জয়েন্ট অ্যাকশান কমিটির সর্বভারতীয় সভাপতি সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস বলছিলেন, "উচ্চ বর্ণের হিন্দু নেতৃত্ব আর মুসলমান নেতৃত্ব যে একমত হতে পারেননি, যার ফলশ্রুতি দেশভাগ - এ তো সবারই জানা আছে। আবার উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান এখনও পুরোপুরি হয়নি এটা ঘটনা - বিশেষ করে বাঙালি উদ্বাস্তুদের। কিন্তু সেটাকে ধরে বসে থাকলে তো হবে না।

"নরেন্দ্র মোদী ওই ঘটনার স্মৃতি আবারও উসকিয়ে দিয়ে তার রাজনৈতিক স্বার্থে এটাকে ব্যবহার করার জন্য চেষ্টা করছেন। মুসলিম বিদ্বেষটাকেই ছড়ানোর জন্য তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন বলে আমার ধারনা," বলছিলেন মি. বিশ্বাস।

'কোন বিভীষিকা মনে করানোর কথা বলা হচ্ছে'?

দেশভাগ এবং উদ্বাস্তুদের নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করেন নাজেস আফরোজ।

তার প্রশ্ন,"কোন বিভীষিকা মনে করানোর কথা বলা হচ্ছে? শুধু কি পাকিস্তানের অংশে যা হয়েছিল, সেগুলো, নাকি ভারতেও যা হয়েছিল, সেগুলোও স্মরণ করা হবে?

"আমার গবেষণার কাজে যখন বাংলাদেশে গিয়েছিলাম, সেখানে খালেদ হোসেইন নামে এক আইনজীবীকে পাই, তাদের আদি বাড়ি ছিল বিহারের পাটনায়। ৪৭ সালে তার বাবার বয়স ছিল ১০-১১ বছর।

"তার বাবা আমাদের বলেছিলেন যে তাদের পরিবারের পুরুষদের হত্যা করা হয়েছিল এবং মহিলারা নিজেদের সম্মান রক্ষার্থে কুয়োয় ঝাঁপ দিয়েছিলেন। এরা দুই ভাই এক কাকার সঙ্গে কোনওমতে পালিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে পৌঁছন।

লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারত থেকে পাকিস্তান আর পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে গিয়েছিলেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারত থেকে পাকিস্তান আর পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে গিয়েছিলেন

"শুধু একদিকের বিভীষিকাই স্মরণ করা হবে না ভারতে যা যা ঘটেছিল, সেগুলোও স্মরণ করা হবে - এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠবে এবং প্রশ্নটা সরকারের সামনে রাখা দরকার," বলছিলেন নাজেস আফরোজ।

ঘটনাচক্রে দেশভাগের ঠিক আগে কলকাতায় যে দাঙ্গা হয়েছিল ১৯৪৬ সালের অগাস্টে, যা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস নামে ইতিহাসে পরিচিত, সেই ঘটনার কথাও সম্প্রতি সামনে এনেছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। আর এস এস যদিও উদ্যোগটা নিয়েছে, কিন্তু দাঙ্গার স্মৃতি ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় সামনে রাখা হচ্ছে রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘের মতো কিছু অরাজনৈতিক সংগঠনের সন্ন্যাসীদের

বিবিসি বাংলার আরও খবর